
আওয়াজ অনলাইন : আগামীকালই শপথ নিতে যাচ্ছে সরকারের নতুন মন্ত্রিসভা। রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন বঙ্গভবনে সন্ধ্যা ৭টায় নতুন মন্ত্রিপরিষদ সদস্যদের শপথবাক্য পাঠ করাবেন। এবার মন্ত্রিসভায় কে আসছেন আর বাদ পড়ছেন—এই আলোচনা জোরালো হয়েছে আওয়ামী লীগে। বেশ কিছু নতুন মুখ নিয়ে নানা আলোচনা করছেন বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা।
আওয়ামী লীগের দায়িত্বশীল একাধিক নেতা জানিয়েছেন, নতুন মন্ত্রিসভায় কারা আসছেন, সেটি নির্ধারণ করবেন প্রধানমন্ত্রী। এতে নির্বাচিত এমপিদের বাইরে অনির্বাচিত বা টেকনোক্র্যাটরাও স্থান পেতে পারেন। তবে মন্ত্রিসভায় মোট সদস্যের এক-দশমাংশের বেশি টেকনোক্র্যাট মন্ত্রী রাখার সুযোগ নেই।
আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী সূত্রগুলো বলছে, ৪৫ সদস্যের মন্ত্রিসভার মধ্যে অন্তত ১৫ জন বাদ পড়তে পারেন। বয়স, নানা বিতর্ক ও অদক্ষতার দায়ে এসব মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী বাদ যেতে পারেন। এর মধ্যে টানা তিন মেয়াদে মন্ত্রিসভায় আছেন, এমন নেতাও বাদ পড়তে পারেন। এর বাইরে মন্ত্রিসভার তিনজন সদস্য নির্বাচনে পরাজিত হয়েছেন এবং তিনজন দলের মনোনয়নই পাননি।
এবার যে তিনজন প্রতিমন্ত্রী পরাজিত হয়েছেন, তাঁরা হলেন ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী এনামুর রহমান, স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী স্বপন ভট্টাচার্য ও বিমান প্রতিমন্ত্রী মাহবুব আলী। এর আগে নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন থেকে বাদ পড়েন শ্রম প্রতিমন্ত্রী মন্নুজান সুফিয়ান, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী জাকির হোসেন এবং সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ।
আওয়ামী লীগের দায়িত্বশীল সূত্র বলছে, এবার মন্ত্রিসভায় একেবারে প্রথমবার সংসদ সদস্য হয়েছেন, এমন বেশ কজন থাকতে পারেন। এর মধ্যে থেকে জয়ী একাধিক সাবেক আমলার নাম আলোচনায় আছে। আলোচনায় রয়েছে তরুণ কয়েকজন সংসদ সদস্যের নাম ।
আওয়ামী লীগ সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেতে পারেন আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানক। তিনি ঢাকা-১৩ আসন থেকে নির্বাচিত হয়েছেন। কুমিল্লা-৮ আসন থেকে নির্বাচিত আবু জাফর মোহাম্মদ শামীম মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেতে পারেন। এছাড়া আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পেতে পারেন। ডা. প্রাণ গোপাল দত্ত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেতে পারেন।
এছাড়া, খুলনা থেকে একজন নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য শ্রম মন্ত্রণালয় প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পেতে যাচ্ছেন। আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া, তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক সেলিম মাহমুদ মোহাম্মদ, কার্যনির্বাহীর সদস্য মোহাম্মাদ আলী আরাফাত মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেতে পারেন।
দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচনে নৌকার প্রতীকে বিজয়ী হওয়া সাবেক তিন আমলা, ড. সাদিক, আবুল কালাম আজাদ, সাজ্জাদ হোসেনকে গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া নিয়ে আলোচনা চলছে। এছাড়া বিজ্ঞান প্রযুক্তিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেতে পারেন আবদুস সবুর। সিমিন হোসেন রিমি অথবা কৃষক লীগের সাধারণ সম্পাদক উম্মে কুলসুম স্মৃতি মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেতে পারেন। এছাড়া নির্বাচিত হওয়া সেলেব্রিটিদের মধ্যে যুব ও ক্রীড়া বা সাংস্কৃতিক বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে।
বর্তমান সরকারের শরিকদের মধ্যে কাউকে মন্ত্রীত্ব না দেওয়া হলেও নতুন মন্ত্রী সভায় তাদেরকে দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে। আওয়ামী লীগের শরিকদের মধ্যে দুইজন বিজয়ী হলেও তাদের মধ্যে একজনকে একটি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়ার গুঞ্জন বেশ জোড়ালো। তবে এবার মন্ত্রণালয়ের আকার ছোট না হলেও বেশ কিছু মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা মন্ত্রীর দায়িত্ব পরিবর্তন হতে পারে।
যেসব মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পরিবর্তন হতে পারে সেগুলো হলো: স্বাস্থ্য, শিল্প, বাণিজ্য, ত্রাণ ও দুযোর্গ, স্থানীয় সরকার, প্রথমিক ও গণশিক্ষা, মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক, ভূমি, গণপূর্ত, অর্থ, পরিকল্পনা, তথ্য ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়।
এছাড়া শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত বর্তমান মন্ত্রীর পরিবর্তন হওয়ার গুঞ্জন থাকলেও উপমন্ত্রী তার জায়গায় থাকবেন। পানি সম্পদ প্রতিমন্ত্রী সততার পুরস্কার হিসেবে তাকে পূর্ণমন্ত্রী দেওয়া হতে পারে। এছাড়া এনামুল হক শামীমকে প্রমোশন দেওয়া হতে পারে। বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেতে পারেন। নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের আসতে পারেন আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য আব্দুর রহমান এমনটাই জানা গেছে দলীয় সূত্রে।
এছাড়া, টেকনোক্রেট কোটায় মন্ত্রী হওয়ার অলোচনায় আছেন জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) সভাপতি হাসানুল হক ইনু, ড. মশিউর রহমান ও আহমদ কায়কাউস।
সংবিধানের ৫৬ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, মন্ত্রিসভায় একজন প্রধানমন্ত্রী থাকবেন, যিনি সংসদ সদস্য, সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের আস্থাভাজন বলে রাষ্ট্রপতির কাছে প্রতীয়মান হবেন, রাষ্ট্রপতি তাকে প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ দেবেন। প্রধানমন্ত্রী যেভাবে নির্ধারণ করবেন, সেভাবে অন্যান্য মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রী থাকবেন। সরকারপ্রধানের সুপারিশেই মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রীকে রাষ্ট্রপতি নিয়োগ দেন।
চলতি সরকার গঠন হয়েছিল ২০১৯ সালের ৬ জানুয়ারি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ মন্ত্রিসভার আকার হয় ৪৭ জনের। এর মধ্যে ৩১ জনই ছিলেন তখন নতুন মুখ। পাশাপাশি আগের মন্ত্রিসভায় ছিলেন এমন অনেকেও স্থান পেয়েছিলেন। ২০১৪ সালের ১২ জানুয়ারি শেখ হাসিনাকে প্রধানমন্ত্রী করে আগের মন্ত্রিসভা গঠন করা হয়। তখন অধিকাংশ পুরনো মন্ত্রী বাদ দিয়ে অপেক্ষাকৃত নতুন ও আগের সরকারের সময় বাদ পড়া দলের জ্যেষ্ঠ নেতাদের নিয়ে সরকার গঠন করা হয়। সেই মন্ত্রিসভায় প্রধানমন্ত্রী ছাড়া ২৯ মন্ত্রী, ১৭ প্রতিমন্ত্রী ও দুজন উপমন্ত্রী ছিলেন। পরে মন্ত্রিসভার আকার আরো বাড়ানো হয়। আওয়ামী লীগ সরকারের প্রথম মেয়াদে ২০০৯ সালের ৬ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন শেখ হাসিনা, গঠন করেন ৩২ সদস্যের মন্ত্রিসভা। এর ১৮ দিন পর যুক্ত হন আরো ছয়জন। এরও দুই বছর ১০ মাস পর আরো দুজনকে মন্ত্রী করা হয়।
এবারের মন্ত্রিসভা প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘মন্ত্রিপরিষদ গঠন করার ব্যাপারে এখতিয়ার হচ্ছে লিডার অব দ্য হাউজের। উনি কীভাবে তার সরকার গঠন করবেন, মন্ত্রিপরিষদ সাজাবেন, সরকার পরিচালনার টিম তিনি কীভাবে সাজাবেন সেটা কিন্তু তার এখতিয়ার। এ সম্পর্কে আমি কোনো মন্তব্য করব না।’
গত রবিবার সারা দেশে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এতে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ এবারও নিরঙ্কুশ জয়লাভ করে। আওয়ামী লীগ ২২২টি আসন এবং স্বতন্ত্র ৬২টি আসন, জাতীয় পার্টি ১১টি আসন, শরিকজোট ২টি আসন, বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি ১টি আসন।

আরও পড়ুন
তোফায়েল আহমেদ আর নেই
জনগণকে আইনি সুরক্ষা দেওয়া পুলিশের প্রধান দায়িত্ব : আইজিপি আলী হোসেন ফকির
আগামী দুই বছরের মধ্যেই বিমানবন্দরটি চালু করার পরিকল্পনা রয়েছে