হোম » শিরোনাম » “ছেতেম বেপারী” (২য় পর্ব)

“ছেতেম বেপারী” (২য় পর্ব)

শেখ হান্নান: ছেতেম চার পাঁচ বছর ধরে ধানের ব‍্যবসা করে। কোনো দিন ধানের মাপের হেরফের, টাকার হিসেবে কখনো গড়মিল হয়নি। আজ নৈমুদ্দিনের বাড়িতে ধান কিনতে এসে ধানের মাপ এবং টাকা দেয়ার বিষয়টি তার কাছে অস্বাভাবিক মনে হচ্ছে। ধানের মাপ কুড়িমন হলেও বস্তার হিসেবে আঠারো মন মনে হচ্ছে। ছেতেম ধান বোঝাই ভ‍্যানগাড়ী ঠেলছে আর মনের ভাবনায় ধানের হিসেবের মধ‍্যে গোলেনুরের মায়াবী চেহারা ভেসে উঠছে বার বার।

ধানের টাকাগুলো হাতে নিয়ে দেখলো দুই সহকারিসহ ধান বোঝাই ভ‍্যান ঠেলে নিয়ে যাচ্ছে ছেতেম। একটিবারও পিছুফিরে তাকালো না তার পছন্দের মানুষটি। তাকে খুব নিষ্ঠুর মনে হলো। ঘরে এসে টাকা গুণে দেখলো ধানের দাম একহাজার টাকা মন হলে কুড়ি মন কুড়ি হাজার টাকা। কিন্তু টাকা আছে বাইশ হাজার। মনে হলো ছেতেমের কি হিসেব জ্ঞান নেই। না কী গোলেনুরকে দেখার এই নাজরানা!

নৈমুদ্দিন খেতে বসেছে। মাসকলাই ডালের খিচুড়ি আর কষানো গরুর মাংস। খাচ্ছে। একথা, সেকথা কথা বলছে। নৈমুদ্দিনের বউ কৈতরী খাতুন গোলেনুরকে ভাইয়ের সাথেবসে খেতে বললো। গোলেনুর ছেতেম বেপারীর ধান বিক্রির বাইশ হাজার টাকা নৈমুদ্দিনের হাতে দিয়ে জিজ্ঞেস করলো-
-ধান হইলো কুড়িমন আর ট‍্যাকা
দিলো বাইশ হাজার! ধান কত
কইরা মন? নৈমুদ্দিন রহস‍্যঘেরা চাপা হাসিদিয়ে ভাবলো এইজন‍্যইতো লোকে বলে কত ধানে কত টাকা। গোলেনুরের দিকে বললো-
-ওব‍্যাটার বউ মইরা পাগল হইচে।
ব‍্যাড়ে ধান রাখছি আঠারো মন, ও
মাইপা ধান বানাইচে কুড়িমন। গোলেনুর ভাইয়ের কথার সুর বুঝতে পারলেও প্রশ্ন করলো-
-তাইলে বেপারীর ব‍্যবসায় লাল
বাতি জ্বোইলবো!
-তোর এগুলি বোঝার কথা না!
আমি বুঝচি ওর হিসাবের গড়মিল
হইচে ক‍্যা! ও অইলো জাতে
মাতাল তালে ঠিক। ওর মতো
শেয়ানা পাবলিক এইগ্রামে দ্বিতীয়
জন নাই। তবে আমাগারে সন্মান
করে। ফাউল কথা কয়না। কাউরে
ঠকায় না এইডা তার বড়গুণ।

স্বাভাব চরিত্র ভালো। ভাইয়ে কথার ম‍ধ‍্যে কয়েকটা কথা গোলে- নুরের হ্নদয়ে কাঁটার বিঁধলেও ছেতেম সম্পর্কে শেষের কথাটি বড়ই মধুর মনে হলো। প্রশান্তিতে স্বামীহারা বিধবা নারীর মন শীতল করে দিলো।
দিনাতিনেক পর নৈমুদ্দিনের পাশের বাড়িতে ধানে মাপ ধরেছে ছেতেম-
-আরে লাবিশ লা, লাবিশ এক,
লাবিশ দুই। নৈমুদ্দিন বাড়ি নেই। মাঠে জমি চাষ দিতে গেছে। ভাবি কৈতরী ঘরসংসারের কাজে ব‍্যস্ত। ধান মাপার এমন সুর। খুব পরিচিত মনে হলো গোলেনুরের। আরি লাবিশ লা, গারোট গা, বারোট বা। কর্ণকূহুরে এ মধুর ধ্বনি প্রবেশমাত্রই বিছানা থেকে মোচড় দিয়ে উঠে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে দেখতে লাগলো ছেতেম বেপারীর সুপুরূষিত ধান পরিমাপের কৌশল আর ধানেরগুণিতক গীত। ছেতেম খুব সর্তকতার সাথে ধান মাপলেও তার তৃষ্ণিত চক্ষুদ্বয় দাঁড়িপাল্লার ডাটের উপর দিয়ে নৈমুদ্দিনের ঘরের জানালার দিকে। ধান মাপতে মাপতে ছেতেমের চোখ থেমে গেলো জানালায়। সেই সুন্দর দুটি চোখ। কী মায়াবী! এমন চোখ সেই গোলেনুর ছাড়া এ গ্রামে আর কারো নেই। অনুরাগ আবেগে ছেতেম হারিয়ে গেলো, রুপসাগরে ডুবে গেলো তার ধান কেনার দুনিয়াদারি। গোলেনুর দেখছে ছেতেমকে আরো একাগ্রতা নিয়ে। মনে মনে ধারণা হলো আজকেও তার ধান মাপের ভুল হবে।

নিজেকে সংযত করে কৈতরী ভাবিকে ডাকলো-
-ভাবি ছেতেম ভাই ওই বাড়ি ধান
কিনতেছে। ছেতেমকে এ বাড়িতে আনার জন‍্য নিজে ছেতেম বেপারীকে ডাকলো-
-ছেতেম ভাই আমাগারে বাড়িতে
একটু আসেন। ছেতেম গোলেনুরের এমন আহবান উপেক্ষা করবে কি করে? এ আহবান যেন ছেতেমের শত বছরের প্রতিক্ষার। তার মনে হতে লাগলো, আজকে বাড়ি থেকে বের হবার সময় মেয়েটার কপালে একটা চুমো দিয়ে, আদর করে ঘুমপাড়িয়ে এসেছে। এজন‍্য মনে হয় সুপ্রসন্ন এ প্রহর, আর বাড়তি পাওনা গোলেনুরের সুপ্রসন্ন হাসি।

ধান পরিমাপ বন্ধ করে ঘর্মাক্ত শরীরে নৈমুদ্দিনের শোবার ঘরে ছেতেম। সোফায় না বসে খাটের উপর বিছানায় বসে গামছা দিয়ে ঘাম মুছছে বার বার । গোলেনুরের হাতে স্বচ্ছ কাঁচের গ্লাসে ঠান্ডা পানি আর পিরিচে কিছু কিছমিছ। ছেতেমকে ভালো করে দেখে হাসিখুশি ভাবে বিনয় করে বললো-
-পানি!
-পানির সাথে এগুলির কী দরকার
ছিল। কৈতরী ঘরে ঢুকেই বললো-
-এই ভাবে ধান কিনলে ব‍্যবসা
ছাঙ্গে উঠবো! আমার বাড়িতে ধান
কিনতে আইসা এমন ভুল! ক‍্যান?
কী দেখলেন, কীসের জন‍্য গড়পর? গোলেনুরের মুখে সুদন্তিহাসি, চোখের পাতায় স্বপ্নভারা দৃষ্টিতে বারবার দৃষ্টি চোরের মতো তাকিয়ে ছেতেমকে দেখতে দেখতে লজ্জাবনত হয়ে বললো-
-নৈমুদ্দিন ভাই কৈছে ব‍্যাড়ে ধান
আছিলো আঠারো মন। ভালোই
তো! এই নেন দুই মনের দুই হাজার
টাকা ফেরত। বেপারীর ব‍্যবসা লাঠে
উঠবো। লজ্জিত হচ্ছে ছেতেম। মিষ্টি হাসি দিয়ে গোলেনুর আবার বললো-
-ধান কুড়মন কুড়ি হাজার ট‍্যাকা।
আমারে ট‍্যাকা দিছেন বাইশ
হাজার। এই নেন দুইহাজার
ফেরত। ছেতেম হতভম্ভ। ভাষা হারিয়ে নীল হয়ে গেলো তার চেহারা। অনন্ন‍্যোপায় হয়ে বললো-
-আমারে আর শরম দিয়েন না।
কেনো যে এমন গড়পর হইচে আমি
কিছুটা ঠাহর কইরতাছি।

কৈতরীর কথাগুলো কঠিন হলেও ভালো লেগেছে ছেতেমের। কারণ কথায় মাখানো ছিলো ভালোবাসার অমৃত। গোলেনুরের দিকে সহানুভূতির মিষ্টি হাসি দিয়ে তার স্বামী নৈমুদ্দিনের সাথে গোলেনুর সম্পর্কে কথা বলার সম্ভাষণ জানালো। লজ্জায় আরক্ত গোলেনুর। ছেতেম সম্মতি সূচক অভিব‍্যক্তি আর পৌরুষদীপ্ত হাসি দিয়ে প্রশান্ত মনে ধান মাপতে চলে গেলো। কৈতরীর দৃষ্টি আত্নীয়তার সন্ধানে আর গোলেনুর তাকিয়ে রইলো ঘরবাঁধার স্বপ্নের মানুষটির দিকে।

শেখ হান্নান-(২য় পর্ব)
নাট‍্যকার লেখক
২৬ অগাষ্ট ২০২১ খ্রিঃ আজিমপুর,
ঢাকা-১২০৫.

শেয়ার করুন আপনার পছন্দের সোশ্যাল মিডিয়ায়
error: Content is protected !!