
আব্দুর রউফ রুবেল, গাজীপুরঃ আজ থেকে ৩০ বছর আগে ঢাকা থেকে ফাইভ আপ ট্রেনে বাড়ি ফেরার পথে উপজেলার ইজ্জতপুর রেলওয়ে স্টেশনে ফাইভআপ ট্রেন থেকে নামতে গিয়ে কাটা পড়ে মনিরের দুটি পা। শত চেষ্টায়ও পঙ্গুত্ব থেকে রক্ষা পাননি তিনি। তবুও থেমে নেই জীবন।বরং পঙ্গুত্বকে বাধা মনে না করে ইজ্জতপুর রেলওয়ে ষ্টেশনে চা বিক্রি করছেন মনির। তবে অর্থাভাবে দোকান মালামাল শূন্য। আছে শুধু কয়েকটি চায়ের কেটলি এবং চায়ের কাপ তা দিয়েই জীবন সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন মনির। ইজ্জতপুর রেলওয়ে ষ্টেশনের মতোই তার দোকানও খালি, জীবন চলে যাচ্ছে খেয়ে না খেয়ে।
দরিদ্র মনিরের সংসার সুখ দুঃখ মিলিয়ে খুব ভালোভাবেই চলছিল। কিন্তু ১৯৯২ সালের একটি রাতের ঘটনায় হঠাৎ মনিরের জীবনে নেমে আসে এক আমাবস্যার কালো অন্ধকার। উলট-পালট হয়ে যায় মনিরের জীবন। থেমে যায় জীবনের গতিপথ। গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার রাজাবাড়ি ইউনিয়নের ইজ্জতপুর গ্রামের প্রয়াত আবুল মজিদের ছেলে মনির(৫৫)।১৯৯২ সালে ঢাকা থেকে বাড়ি ফেরার পথে শ্রীপুরের ইজ্জতপুর রেলওয়ে স্টেশনে ফাইভআপ ট্রেন থেকে নামতে গিয়ে দুইটি পা কাটা পড়ে মনিরের। দুই পা কেটে ফেলায় স্বাভাবিক কাজ করতে পারেননা মনির।
৬ জনের সংসারে মনিরের বয়স্ক মা, স্ত্রী, ছেলে ও ছেলের বউ এবং এক নাতিকে নিয়ে পঙ্গু হয়েও থেমে থাকেনি মনিরের জীবন যুদ্ধ । দুই পা হারিয়ে এখন তিনি চায়ের দোকানী। এখান থেকে উপার্জিত অর্থ দিয়েই চলে ৬ সদস্যের সংসার। এক সময় কৃষি কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করতেন মনির । এখন উপজেলার রাজবাড়ি ইউনিয়নের ইজ্জতপুর রেলওয়ে স্টেশনে চা বিক্রি করে জীবন-জীবিকা নির্বাহ করছেন। ।
সরেজমিনে গিয়ে কথা হয় তার সাথে।জীবন যুদ্ধে হার না মানা এক সৈনিক মনির জানান, তার জীবন যুদ্ধের গল্প।তিনি বলেন, আমার গ্রামের বাড়ি উপজেলার রাজবাড়ি ইউনিয়নের ইজ্জতপুর গ্রামে। ২০ বছর বয়সে ট্রেন থেকে নামতে গিয়ে দুটি পা কাটা পড়ে। আমার বাবা ছিলেন একজন অতি দরিদ্র কৃষক। অভাবের কারণেই নিজের জন্য উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে পারি নাই। তারপর থেকেই শুরু হয় আমার জীবনযুদ্ধ। আমার দুই মেয়ে ও এক ছেলে । বড় ছেলে আসাদুল (২০) মাঝে মাঝে আমার কাজে সহযোগিতা করে। চা বিক্রি করে প্রতিদিন গড়ে ৪০০-৫০০ টাকা আয় হয়। ইজ্জতপুর স্টেশন বন্ধ হওয়ায় এখন লোকজন তেমন আসে না এদিকে ।
কোনো কোনো দিন লোকজন না থাকলে চুলোয় আগুন জ্বলে না, চা বিক্রি ও হয়না। শেষ সম্বল বলতে আমার চায়ের দোকান ছাড়া আর কিছুই নেই।কোনো ধরনের সহায়তা পেয়েছেন কিনা জানতে চাইলে বলেন, সরকারিভাবে তিনমাস পরপর ৪ হাজার ২শ টাকা পাই। তবে আমি পরিশ্রম করে সংসার চালিয়ে নিচ্ছি, কিন্তু সমাজের বৃত্তবাদের সহযোগিতা পেলে আমি ভালো ভাবে সংসার চালাতে পারতাম। প্রতিবন্ধীত্ব আমাকে দাবিয়ে রাখতে পারেনি। কারও কাছে হাত না পেতে নিজের জীবিকার ব্যবস্থা করার চেষ্টা করি। সেই থেকে এগিয়ে চলার অদম্য শক্তি নিয়ে এখনও চায়ের দোকান চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করছি। দোকানে কুনো মালামাল নেই, যদি কেউ আমাকে দোকানের মালামাল কিনে দিতো তাহলে হয়তো শেষ বয়সে একটু সুখে কাটাতে পারতাম।
মনিরের চাচা বাদল মিয়া বলেন, মানবিক দিক বিবেচনায় এলাকার সম্পদশালীরা যদি এগিয়ে আসে তাহলে মনির শেষ বয়সে একটু সুখে থাকতে পারতো। আমাদের সমাজে এখনও অনেক মানুষ সুস্থ থেকেও সাহায্য-সহযোগিতা নিয়ে জীবন চালাচ্ছেন। কিন্তু প্রতিবন্ধী মনির তা করেননি। তিনি পঙ্গুত্বকে হার মানিয়ে চা বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করে চলছেন।
এ বিষয়ে রাজাবাড়ি ইউনিয়ন পরিষদের ১ নং ওয়ার্ড সদস্য নিহার মেম্বার জানান, আমরা ইউনিয়ন পরিষদের পক্ষ থেকে তাকে শারীরিক প্রতিবন্ধী ভাতার কার্ড করে দিয়েছি। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী একজনকে একটি কার্ডের আওতায় আনা যায়। আমরাও তাকে একটি কার্ডের আওতায় এনেছি।
এ বিষয়ে শ্রীপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) তরিকুল ইসলাম বলেন, আপনার মাধ্যমে প্রতিবন্ধী মনিরের বিষয়টি জানতে পারলাম। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে খুব দ্রুত সময়ের মধ্যে তাকে সহযোগিতা করা হবে এবং আমি আমার ব্যক্তিগতভাবেও তার পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করবো।

আরও পড়ুন
বগুড়া শাজাহানপুরে ধর্ষণ মামলার পলাতক কিশোর গ্রেপ্তার
সিরাজগঞ্জে কিশোর গ্যাংয়ের প্রধান বাবু মিয়া ও রিজভীকে গ্রেপ্তারের দাবিতে প্রতিবাদ সভা
সিরাজগঞ্জে বাসচাপায় স্বামী-স্ত্রীসহ নিহত ৩