
মোঃ মনিরুল ইসলাম: ডাকসু নির্বাচনে ছাত্রশিবিরের ভ‚মিধবশ বিজয় বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। এ বিজয় নিয়ে চলছে চুরচেরা বিশ্লেষণ ও গবেষণা। যে বিশ্ববিদ্যালয়ে এই সংগঠনটির রাজনীতি যুগ যুগ ধরে ছিল অনেকটা নির্বাসিত ও নিষিদ্ধ, সেখানে সবাইকে পিছনে ফেলে প্রায় সম্পূর্ণ প্যানেলে বিজয়লাভ তাও আবার ব্যাপক ভোটের ব্যবধানে। এখন এই নির্বাচন নিয়ে চলছে নানামুখী আলোচনা ও সমালোচনা। ঠিক কি কি মুজেজার গুণে শিবিরের এই বিজয়, সেই বিষয়গুলো বিভিন্ন জন বিভিন্নভাবে তুলে ধরার চেষ্ঠা করেছেন। কেউ কেউ বলছেন আওয়ামী লীগ বা ছাত্রলীগের ওপর ভর করে ছাত্রশিবির এই নির্বাচনে জিতেছে, কেউ কেউ বলছেন প্রশাসনের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ মদদে শিবির জিতেছে ইত্যাদি ইত্যাদি। নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি গোলাম রব্বানী বলেছেন, ‘‘জামায়াতের বিজয় হয়নি, জামায়াতের হাত ধরে আওয়ামীলীগের বিজয় হয়েছে।”এছাড়াও গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের সাবেক মেয়র জাহাঙ্গীর লিখেছেন, ‘‘আলহামদুলিল্লাহ।” যেহেতু সারাদেশে আওয়ামী পরিবারগুলো কমবেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, একারণে তাদের ভোট শিবিরের বাক্সে পড়েছে বলে অনেকেই মন্তব্য করেছেন। সে বিষয়টি কোন কোন ক্ষেত্রে সত্য বা আংশিক সত্য হতে পারে। তাহলে প্রশ্ন হল জগন্নাথ হলের ছেলেরা কি আওয়ামী পরিবারের সদস্য না ? আসলে এখানে মূল পার্থক্য গড়ে দিয়েছে শিবিরের হল পর্যায়ে সাংগঠনিক অবস্থান ও একচ্ছত্র ক্ষমতার ব্যবহার। জগন্নাথ হলে শিবিরের সাংগঠনিক কার্যক্রম নেই বললেই চলে, তাই সেখানে তারা ভিপি পদে ১০ ভোট এবং জিএস পদে ৫ ভোট পেয়েছে। আবার অন্য হলগুলোতে হাজার হাজার ভোট পেয়েছে। এই ভোটগুলো ছাত্র-ছাত্রীরা শিবিরকে ভালোবেসে দিয়েছে একথা বলার সুযোগ নেই। আপনারা যারা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে থেকেছেন তারা কম বেশি সবাই জানেন হলে রুলিং পার্টি তথা যাদের শক্তিশালী ও অপ্রতিদ্ব›িদ্ব অবস্থান থাকে, তাদের পক্ষে সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীদের ভোট নেওয়া সহজ হয়। সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীরা তাদের হল জীবন ও বিশ্ববিদ্যালয় জীবন নির্বিঘ্নে করতে শিবিরকে ভোট দিতে একপ্রকার বাধ্য হয়েছে। ধরুন চার তলা একটি হলে ২০টি বøক রয়েছে, শিবিরের প্রতিটি হলে একটি করে মূল কমিটির পাশাপাশি ঐ ২০টি বøকেও সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকসহ কমিটি রয়েছে।
ব্লকের কমিটিগুলো ওই ব্লকের প্রতিটি রুমে কতজন ছাত্র আছে, কার বাড়ি কোন জেলায়, কে বিএনপি, কে আওয়ামী পরিবারের সদস্য, কে তাবলীগ জামাতের সদস্য এই ডাটাগুলো তারা গোপনে সংগ্রহ করে। ফলে কে তাদের ভোট দিচ্ছে আর কে দিচ্ছে না সেটা বøক ধরে ধরে বা রুম ধরে ধরে হিসেব করেছে এবং এক ধরনের ভীতি ও মব সৃষ্টি করে তাদের কাছ থেকে ভোট আদায় করে নিয়েছে। এই কাজটি জগন্নাথ হলে করা সম্ভব হয় নাই, তাই শিবিরের ভিপি জিএস যথাক্রমে ১০টি আর ৫টি ভোট পেয়েছে। শিবির যেহেতু আওয়ামীলীগ আমলে গুপ্তভাবে ছাত্রলীগের সঙ্গে হলে ছিল,সে কারণে ৫ ই আগস্ট এর পরতাদেরহল পর্যায়ে দখল ও অবস্থান নিতে সময় লাগেনি। কিন্তু ছাত্রদল সেই সুযোগ পায় নাই বা ছাত্রদলকে সেই সুযোগ দেওয়া হয় নাই। আপনাদের মনে আছে কি হাসিনা সরকারের পতনের পর ছাত্রদল যাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ঢুকতে না পারে, তার জন্য ছাত্র রাজনীতি বন্ধের ধুয়া তুলে মিছিল, মিটিং ও মব তৈরি করা হয়েছিল। ছাত্রশিবির ও তাদের দোসররা মিলে ছাত্রদলকে ছাত্রলীগের বিকল্প ট্যাগ লাগিয়ে এবং সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের নাম ব্যবহার করে এই ভীতিকর পরিবেশ সৃষ্টি করা হয়েছিল অত্যন্ত চাতুরতার সঙ্গে। তখনকার সমন্বয়করাও সেই সময়ে শিবিরের এই কৌশল না বুঝে ও বোকার মতো নিজেদের ক্ষমতা ধরে রাখতে এই পাতানো ফাঁদে পা দিয়েছিল। ফলে ছাত্রদল ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ঢুকতে পারেনি। এমনকি ছাত্রদলের এফ রহমান হলের সাহিত্য ও প্রকাশনা সম্পাদক শাহরিয়ার আলম সাম্য নামের এক ছাত্রনেতা কোন কারন ছাড়াই এই শান্ত ক্যাম্পাসে হত্যাকাÐের শিকার হন। এদিকে শিবিরের দেবদূত ভিসি তার ইচ্ছেমতো জামাত শিবির ও দলীয় লোকদেরকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি প্রশাসনিক স্তরে নিয়োগ দিতে থাকেন। একদিকে ছাত্রদল ক্যাম্পাস ছাড়া অন্যদিকে শিবিরকে পূর্ণমাত্রায় পুনর্বাসন করা এবং তড়িঘড়ি করে ডাকসু নির্বাচনের আয়োজন করা সবই ছিল নিয়াজ প্রশাসন ও ধূর্ত শিবিরের পরিকল্পিত একটি এজেন্ডা। ছাত্রদল তখন নির্বাচনে যাবে কি যাবে না সেই সংশয়ে পড়ে গিয়েছিল। আপনাদের জানা আছে নিশ্চয়ই, ছাত্রদল কিন্তু সবার পরে প্যানেল ঘোষনা করেছেএবং ছাত্রদল ১৮ টি হলের মধ্যে ১৪ টি হলে পূর্ণ প্যানেল দিতে পারলেও বাকিগুলোতে পূর্ণ প্যানেল দিতে পারেনি।
সবকিছু মিলিয়ে ছাত্রদলের পক্ষে এমন নাজুক পরিস্থিতিতে ভাল রেজাল্ট বের করে আনা সম্ভব হয় নাই। এক্ষেত্রে মূল বিএনপির ব্যাপক উদাসীনতা ও দুর্বলতা ছিল বলে অনেকেই দুঃখ প্রকাশ করছেন। ভিসি নিয়াজ আহাম্মেদ জামায়াত-শিবিরের লোক জেনেও বিএনপির হাইকমান্ড কেন নিরব ছিল সেটা হয়তো বিধাতা ছাড়া আর কেউ জানে না। তাদের দুর্বলতা কোথায় ? সবকিছুতেই এতো নমনীয়তা ও নীরবতা কেন ? সাধারণ জনগণ ও ভ‚ক্তভোগী কর্মীরা তা বিনয়ের সঙ্গে জনতে চান। বিএনপিপন্থি দলীয় ভিসির নিয়োগ আটকে দিয়ে ও এক ধরনের মব সৃষ্টি করে শিবির তাদের দলীয় ভিসি নিয়োগ দিয়েছে এটা জানার পরও বিএনপির হাইকমান্ড অবুঝ শিশুর মতো নীরব থেকেছে। ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ে ছাত্রদল তাদের অবস্থান নির্বিঘœ করতে ও ডাকসু নির্বাচনের নূন্যতম লেবেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরী করতে দিনের পর দিন নিয়াজ প্রশাসনের দ্বারে দ্বারে ঘুরেছে, নিয়াজ প্রশাসন তাদের সঙ্গে এতিমের মতো আচরন করেছে। এতোকিছু জানার পরও বিএনপি অভিভাবক হিসেবে কোন দায়িত্ব পালনের চেষ্ঠা করেনি।দিনশেষে সেটাই ছাত্রদলের পরাজয়ে বড় ঘাটতি হিসেবে দেখা দিয়েছে।অন্তত নূন্যতম নিরপেক্ষতা তৈরি করা, হলগুলোতে সহঅবস্থান নিশ্চিত করা ও ডাকসু নির্বাচনের সময়টাকে যৌক্তিক পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার বিষয়ে বিএনপি নিয়াজ প্রশাসন ও সরকারের উপর চাপ প্রয়োগ করতে পারতো। তাহলে নিয়াজ প্রশাসন নগ্নভাবে শিবিরকে একচেটিয়া প্রাধান্য দেওয়ার দাম্ভিকতা হয়তো দেখানোর সাহস পেতো না। এবার আসা যাক জুলাই যোদ্ধা হিসেবে পরিচিত ও তাদের প্যানেলগুলোর বিষয়ে। জুলাই আন্দোলনে যাদের ভূমিকা ছিল- সেই এনসিপি, গণঅধিকার পরিষদ ও অন্যান্যদের মধ্য থেকে অন্তত চারটি প্যানেল এই নির্বাচনে অংশ নিয়েছে। যদি এরা সম্মিলিতভাবে একটি প্যানেল দিতে পারতো তাহলে ক্যাম্পাস ও হল পর্যায়ে শিবিরের একচ্ছত্র আধিপত্য থাকতো না। তখন ছাত্রশিবির ও জুলাই যোদ্ধাদের মধ্যে ক্যাম্পাসের আধিপত্য সমান সমান থাকতো। সেক্ষেত্রে ফলাফল অন্যরকমও হতে পারতো এবং ছাত্রদল এই নির্বাচনে তাদের সঙ্গে ত্রিমুখী প্রতিদ্ব›িদ্বতা গড়ে তুলতে পারতো। এক্ষেত্রে ভোটের রেজাল্ট তিনটি প্যানেলের মধ্যে ভাগ হয়ে যেতে পারত এবং কোনভাবেই শিবির একচেটিয়া সুবিধা ও একক বিজয় লাভ করতে পারতো না বলে অনেকেই ধারণা পোষণ করেছেন।
এক্ষেত্রে নিয়াজ প্রশাসনও চাপের মধ্যে থাকতো। ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের জনপ্রিয় ভর্তি কোচিং ‘ফোকাস কোচিং সেন্টার’ প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীদের সংবর্ধনার নামে একত্রিত করে বিভিন্ন উপঢৌকন ও খাবার প্রদান করেছে এবং সেই অনুষ্ঠানে শিবিরের ভিপি, জিএস ও এজিএ প্রার্থীকে বক্তব্য প্রদান ও ভোট চাওয়ার সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। নিরপেক্ষতার আদলে গড়ে উঠা এই ধরনের কোচিং সেন্টারগুলো নগ্নভাবে শিবিরের পক্ষে কাজ করেছে। আবার ঢাকা শহরে শিবির পরিচালিত ও নিয়ন্ত্রিত শত শত মেস রয়েছে। এই সকল মেসে যারা অবস্থান করেন তাদেরকে এমনিতেই বাধ্যতামূলকভাবে জামায়াত-শিবিরের বিভিন্ন মিছিল মিটিংয়ে যেতে হয়, ফলে এই সকল ম্যাচে অবস্থানকারী ছাত্র-ছাত্রীরা শিবিরকে ভোট দিতে বাধ্য হয়েছেন। ডাকসু নির্বাচনে বাগছাসের ভিপি প্রার্থী ও জুলাই যোদ্ধা আব্দুল কাদের অভিযোগ করে বলেছেন ‘‘ভিসি, প্রক্টর ও সহকারি প্রক্টর সবাই জামাত-শিবিরের লোক। সহকারি প্রক্টর প্রফেসর রফিক শাহবাগ থানা জামাতের সেক্রেটারি।”এই নির্বাচনের অন্যতম ভিপি প্রার্থী উমামা ফাতেমা উল্লেখ করেছেন-‘‘এটা সম্পূর্ন নির্লজ্জ কারচুপির নির্বাচন। ৫ আগাস্টের পরে জাতিকে লজ্জা উপহার দিল ঢাবি প্রশাসন। শিবির পালিত প্রশাসন।” কয়েকজন শিক্ষার্থী মিডিয়ার সামনে উল্লেখ করেছেন যে, হলে তাদের পছন্দের প্রার্থীকে তারা ভোট দিয়েছেন কিন্তু গননায় সেই প্রার্থী শুন্য ভোট পেয়েছেন তাহলে তাদের ভোট কোথায় গেলো ? আবার এই নির্বাচনে ৩ জন ভিপি প্রার্থী মাত্র ১ টি করে ভোট পেয়েছেন, তাহলে প্রশ্ন হলো ৪০ হাজার শিক্ষার্থীর মধ্যে তাদেরকে ভোট দেওয়ার মতো একজন করেও কি বন্ধ-বান্ধব বা শুভাকাংখী নেই ? একজন সাংবাদিক উল্লেখ করেছেন ডাকসু নির্বাচনে জামাত শিবির ১৫ কোটি টাকা ব্যয় করেছে এবং প্রতিটি হলে ৩৫ লক্ষ টাকা করে বাজেট দেওয়া হয়েছে।
এই নির্বাচনে সবচেয়ে বয়োজ্যেষ্ঠ ভিপি প্রার্থী তৈয়ব বলেছেন, ‘‘এই নির্বাচন তামাশার নির্বাচন হয়েছে তাই বয়কট করলাম’’। বাম সংগঠনের এক ছাত্রনেত্রী অভিযোগ করে বলেন, শিবিরের প্রতিটি কর্মী সমর্থকের ৫/৭ টি করে বট আইডি রয়েছে এবং এই সকল বট আইডি দিয়ে তারা গুপ্ত রাজনীতি, মিথ্যা অপপ্রচার ও সাইবার বুলিং এর মত কাজ করে যাচ্ছেন। শিবিরের বট বাহিনীর পিছনে নাকি সংগঠনটির কোটি কোটি টাকা ব্যয় হয় বলে জানা যাচ্ছে। এমনও ঘটনা ঘটেছে যে, শিবিরের এই বট বাহিনীর ভার্চুয়াল আক্রমনের শিকার হয়ে অনেক মেয়ে শিক্ষার্থী ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের লেখাপড়া শেষ না করেই বাড়ী ফিরে যেতে বাধ্য হয়েছেন।
একটি কথা উল্লেখ না করলেই নয়, জুলাই আন্দোলনে পিছনের সারিতে শিবিরের ভ‚মিকা থাকলেও শিবির সমর্থিত প্রার্থী সাদিক কায়িম ও এসএম ফরহাদের বা অন্য কারোর জুলাই আন্দোলনে সামনের সারিতে উল্লেখ করার মতো কোন ভূমিকার প্রমাণ, ছবি কিংবা ভিডিও কোন কিছুই শিবির কিন্তু দেখাতে পারে নাই। অনলাইন প্লাটফমগুর্লো যেখানে ছাত্রশিবিরের একচেটিয়া দখলে, সেখানে তারা নূন্যতম একটি ক্লিপও দালিলিক প্রমাণ হিসেবে ছাত্র-ছাত্রীদের সামনে তুলে ধরতে পারে নাই। অথচ জুলাই আন্দোলনের ফসল কৌশলী শিবির ঠিকই শতভাগ ঘরে তুলতে পেরেছে এ কথা বলতে আর কারো দ্বিধা নেই। শিবিরের ভিপি ও জিএস প্রার্থী যথাক্রমে সাদিক কায়িম ও এসএম ফরহাদের বিরুদ্ধে গুপ্ত ছাত্রলীগ করার জোড়ালো তথ্য প্রমাণ রয়েছে। তাদের জিএস প্রার্থী এসএম ফরহাদের বিরুদ্ধে কোন একটা কমিটিতে ছাত্রলীগের সাধারন সম্পাদক পদ গ্রহণের অভিযোগে একজন নারী জিএস প্রার্থী হাইকোর্টে মামলা পর্যন্ত করেছিল, যার ফলশ্রæতিতে নির্বাচন বন্ধ হওয়ার মতো নাটকীয়তাও তৈরী হয়েছিল। শুধু তাই নয় এই রিটকারী নারী প্রার্থীকে গণধর্ষনের হুমকি দিয়েছিল যে শিক্ষার্থী সেও আবার ছাত্রশিবিরের রাজনীতির সাথে যুক্ত।
এদিকে শিবিরের ভিপি প্রার্থী সাদিক কায়িমের নৌকার মিছিলরত ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অবনীলায় ভেসে বেড়াচ্ছে। সাদিক কায়িম এর আগে নাকি ছাত্রলীগের হল ক্যান্ডিডেট ছিলেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। এদিকে শিবির প্যানেল থেকে নির্বাচিত স্বামী স্ত্রী হিসেবে বহুল পরিচিত দম্পতির রায়হান ছাত্রলীগের কমিতে ছিলেন বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। আবার শিবিরের এই জয়ের নায়ক ও পরিচালক হিসেবে পরিচিত ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের ভিসি প্রফেসর নিয়াজের বিরুদ্ধেও গুপ্ত আওয়ামীলীগ করার গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। আওয়ামীলীগ আমলে নিজ উদ্যোগে ১৫ আগস্ট এর শোক দিবস পালনের একক আয়োজন করে শেখ মুজিব ও ১৫ আগস্টে নিহতদের ¯œরণে তার দেওয়া বিয়োগাত্বক ও শোকাহত ভাসনের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকে এখনও ধন্য করে চলেছে।
গত ১০০ বছরের অধিক সময় ডাকসু ছিল প্রগতিশীল ও বামধারার রাজনীতি এবং বাংলাদেশের তথাকথিত বুদ্ধিজীবীদের দখলে, যারা কিনা বিএনপির মত একটি মধ্যপন্থী দলের উত্থানকে মেনে নিতে পারেন না, তাহলে তারা কি করে জামায়াত-শিবিরের এই বিজয় উপাখ্যান হজম করবেন সেটাই এখন গবেষণার বিষয়। অবশ্য এ বিষয়ে তাদের কোন সাড়া শব্দ পাওয়া যাচ্ছে না, তাহলে কি এটি হজম হয়ে গেছে নাকি বদহজমের পর্যায়ে আছে সেটাও রীতিমতো গবেষণার বিষয়। কারণ এখন পর্যন্ত তারা নিয়াজ প্রশাসন ও শিবিরের এই ধরনের হীন কুটকৌশল নিয়ে একটি মন্তব্যও করেননি। বাংলাদেশের চিরাচরিত সমাজে একটি কথা প্রচলিত আছে, অল্প শোকে কাতর আর অধিক শোকে পাথর। তাহলে কি তারা অধিক শোকে পাথর হয়ে গেছেন কিনা সেটাও ভাবনার বিষয়। ১৯৮৯ সালে ডাকসুতে যাতে তখনকার জনপ্রিয় ছাত্রসংগঠন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল নির্বাচনে জয়লাভ করতে না পারে তার জন্য তখনকার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমস্ত ছাত্র সংগঠন অবিশ^াস্যভাবে একত্রিত হয়ে ছাত্র ‘‘ঐক্য পরিষদ” এর ব্যানারে নির্বাচন করে ছাত্রদলকে পরাজিত করে। অথচ এদের মধ্যে হানাহানি ও বিভেদের কারনেই ১৯৭৩ সালে ডাকসু নির্বাচন সম্পন্ন হলেও তার ফলাফল ঘোষনা করা সম্ভব হয় নাই, যেটা ডাকসুর ইতিহাসে একটি কলংকময় অধ্যায় হয়ে আছে। স্বাধীনতার পরে ডাকসুতে ছাত্রদল ও ছাত্রলীগ সর্বসাকুল্যেমাত্র দুইবার নির্বাচিতহয়েছে। বাকি নির্বাচনগুলোতে সেই তথাকথিত মোড়লরাই জিতেছে বারবার। শিবিরের মতো অচ্ছুত একটি সংগঠনকে ও ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের গলার কাটা হিসেবে বিবেচিত ভিসি নিয়াজকে সেই অভিজাত শ্রেণী কিভাবে সহ্য করছেন বা আগামীতে করবেন আজকে সেটাও ভাবনার বিষয় হয়ে দাড়িয়েছে।
এবার আসা যাক, এই নির্বাচনে জয়লাভ করে শিবিরের কতটুকো লাভ বা ক্ষতি হয়েছে সে বিষয়ে। এই বিজয়ে শিবিরের অবিশ^াস্যউত্থান ঘটেছে, প্রকাশ্য রাজনীতি করার অধিকার ফিরে পাওয়ার পাশাপাশি অতীতের কলংক ঘুচানো ও ইতিবাচক গ্রহণযোগ্যতা তৈরী করতে তারা সক্ষম হয়েছে বৈকি।নির্বাচনের আগে পরে তারা ক্যাম্পাস ও হলগুলোতে জনকল্যাণমূলক অনেক কাজ করে সুনাম ও গর্ব অর্জন করেছেন, সেটি যেমন সত্য আবার অতীতের মতো নিত্য নতুন কলংকও কিন্তু তাদের কপালে জুটেছে। তাদের বিরুদ্ধে বর্তমানে সবচেয়ে বড় কলংকের নাম গুপ্ত ছাত্রলীগ, গুপ্ত রাজনীতি ও গুপ্ত বটবাহিনীর তকমা, যা কিনা অতীতের রগ কাটা বদনামকেও হার মানিয়ে দিয়েছে। হ্যা আপনি হয়তো গায়ের জোরে বা গুজব বলে অভিযোগগুলো অস্বীকার করবেন কিন্তু কমিটিতে লিখিত নাম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরালকৃত এবং মিছিলরত নৌকার শ্লোগানকে কিকরে মুছে ফেরবেন সেটি এখন বড় প্রশ্ন। আবার নির্বাচনে জয়লাভ করতে গিয়ে শিবির অনেক গোপন বিষয় জনসন্মুখে এনেছেন, যেগুলো গোপন থাকলেই তাদের জন্য বেশী ভাল হতো। এখন সেগুলো তাদের জন্য ভবিষ্যতে বিপদ ডেকে আনবে- যেমনতাদের হাজার হাজার কোটি টাকার কোচিং ব্যবসা, ম্যাচ ব্যবসা, মেডিকেল ব্যবসা, অপ্রকাশ্য ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও ডোনারশিপগুলোদলীয় কাজে ব্যবহার করে এই প্রতিষ্ঠানগুলোকে চরমভাবে বিতর্কিত করা হয়েছে। ফলে ভবিষ্যতে যারা রাষ্ট্র ক্ষমতায় আসবে তারা এগুলো বন্ধ করতে বাধ্য হবে, এতে কোন সন্দেহ নাই। তখন তাদের এই কোটি কোটি টাকার ব্যবসার কি হবে ? এতে করে লাভের চেয়ে ক্ষতির পাল্লা ভারী হবে নয় কি ? তখন তাদের আবারও গুপ্ত সংগঠন হওয়া ছাড়া উপায় থাকবে না বলে অনেকের ধারনা। এদিকে এতদিন ছাত্রশিবির বিএনপির দুর্বলতাগুলো নিয়ে প্রোপাগান্ডা চালাতো, এইবার জামায়াত শিবিরের দুর্বলতা ও কলঙ্কিত অধ্যায়গুলো ইতোমধ্যে মানুষ অনলাইনে তুলে ধরতে শুরু করেছে। এমনিতেই তাদের বদনামের শেষ নেই তার ওপর নতুন ও পুরাতন কলঙ্কগুলো জনসম্মুখে আসা শুরু হয়েছে। এতে করে ভবিষ্যতে এই সংগঠনটি বড় রকমের বেকায়দায় পড়বে এ কথা বলা যায়। অন্য দিকে বিএনপি ও তার অঙ্গ সংগঠনগুলো ডাকসু নির্বাচনের এই ধাক্কা খেয়ে নতুনরুপে জাগ্রত হতে শুরু করেছে। অতীতের ভেদাভেদ ভ‚লে একত্রিত হয়ে সামনের দিনগুলোতে বড় বিপদ মোকাবেলা করার প্রস্তুতি নেওয়ার সুযোগ কিন্তু বিএনপিকে ডাকসু নির্বাচন ও ছাত্রশিবির এনে দিয়েছে।
সমাপ্ত।
ব্যাংকার, লেখক ও কলামিস্ট

আরও পড়ুন
জয়পুরহাটে পুলিশ–ম্যাজিস্ট্রেসি কনফারেন্স অনুষ্ঠিত
অপ্রত্যাশিত দেখা!
উইশলিস্টে রাখতে পারেন তুহিন সুলতানা মুক্তি’র ” ভালোবাসতে পারো আমায় “