
গোলাম রব্বানী দুলাল, আদমদীঘি (বগুড়া) প্রতিনিধি : দিন দিন শেষ হয়ে যাচ্ছে দেশের ইতিহাস ঐতিহ্য বিজড়িত নিদর্শন ও স্থাপনাগুলো। অজানা থেকে যাবে আগামী প্রজন্মের কাছে। তাই এসকল নিদর্শন ও স্থাপনা ধরে রাখার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
দেশের ইতিহাস ও ঐতিহ্য সম্পর্কে যেন জানতে পারে আগামী প্রজন্ম। এমনই দুটো অতিপ্রাচীন ও ক্ষুদ্র দুটো মসজিদ আছে বগুড়ার আদমদীঘির সান্তাহারে। দেশের যে সকল নিদর্শন ও স্থাপনা কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে তার মধ্যে অন্যতম পুরনো স্থাপত্য এবং ইতিহাস বহনকারী নিদর্শন এই দুটো মসজিদ। স্থানীয়ভাবে প্রচলিত আছে, উপজেলার সান্তাহার পৌর এলাকার তারাপুর ও মালশন গ্রামের এ দুটি স্থাপনা এশিয়া মহাদেশের সবচেয়ে ছোট মসজিদ।
সরেজমিনে দেখা যায়, মসজিদে সামান্য উঁচু একটি গম্বুজ রয়েছে। গম্বুজের ওপর আছে একটি মিনার। মিনারটি অনেক আগে ভেঙে পড়েছে। দেড় ফুট পুরুত্বের দেয়ালে ব্যবহৃত ইটগুলো আকারে খুব ছোট। এই মসজিদের দরজায় দুটি সুন্দর খিলান রয়েছে। দরজার খিলান, ভেতরের মিম্বর ও মেহরাব বলে দেয় যে স্থাপনাটি একটি মসজিদ। চুন-সুরকি দিয়ে তৈরি স্থাপনাটি এতটাই পুরনো যে, প্রথমে দেখে এটিকে মসজিদ হিসেবে মনে হবে না।
ধারণা করা হয়, ১৭৭০ থেকে ১৭৯০ সালের কোনো এক সময় মসজিদ দুটি নির্মিত হয়। জমিদারি প্রথার সময় আদমদীঘি উপজেলার এ অঞ্চলটি বিভিন্ন জমিদারের শাসনাধীন ছিল। তৎকালীন সময়ে নাটোরের রানী ভবানীর পরিচালিত ভারত উপমহাদেশের সর্ববৃহৎ জমিদারি বিসৃত্ব ছিল প্রায় ১২ হাজার ৯৯৯ বর্গমাইল, যার মধ্যে এই আদমদীঘি উপজেলার বিভিন্ন এলাকা অন্তর্ভুক্ত ছিল। তার বাবার বাড়ি ছিল আদমদীঘি উপজেলার ছাতিয়ান গ্রামে।

কথিত আছে, হিন্দু বসতিপূর্ণ ওই এলাকায় সেই সময় তারাপুর গ্রামে শুধু একজন মুসলিম নারী বসবাস করতেন। তিনি ধর্মকর্ম পরিচালনার জন্য একটি মসজিদ নির্মাণের জন্য স্থানীয় সমাজ প্রধানদের কাছে আবেদন করেন। কিন্তু হিন্দু সমাজপতি পরিচালিত সমাজ ব্যবস্থায় তার এ দাবি বারবার উপেক্ষিত হয়। পরে তিনি রাণী ভবানীর কাছে তার আবেদনের বিষয়টি তোলেন। রাণী ভবানী তখন তার বাবার বাড়ি ছাতিয়ান গ্রামে বেড়াতে এসেছিলেন। তিনি সম্মতি দিলেও তখনকার স্থানীয় হিন্দু সমাজ পতিরা তার কাছে এই কাজ বন্ধের আবেদন করেন। এ নিয়ে অনেক যুক্তিতর্কের পর ভবির্ষ্যতে যাতে মুসলমানের সংখ্যা বৃদ্ধি না পায়, সেই জন্য শুধু একজন মুসল্লি নামাজ পড়তে পারেন সেই উপযোগী একটি মসজিদ নির্মাণ করে দেন রাণী ভবানী।
ক্ষুদ্র এই মসজিদের প্রসস্ত ৯ ফুট, উচ্চতা মিনারসহ ১২ ফুট। মিনারটির ঘের ২৭ ফুট। মসজিদটির মিহরাব এতই ক্ষুদ্র যা ভেতরে না গেলে চোখে পড়ে না। মিহরাবের উচ্চতা সাড়ে তিন ফুট, প্রশস্ত দেড় ফুট যা একটি শিশুর নামাজ পড়ার জন্যও যথেষ্ট নয়। মসজিদটির দরজার উচ্চতা সাড়ে ছয় ফুট এবং প্রস্ত আড়াই ফুট। সর্বোচ্চ তিনজন মানুষ এ মসজিদে নামাজ পড়তে পারবেন।
মসজিদের এই জায়গার বর্তমান মালিক ষাটোর্ধ্ব জয়েনুল উদ্দিন প্রামানিক বলেন, আমার বাবা দাদা ও বলতে পারেন নাই এই মসজিদ কত পুরোনো তবে ধারণা করা হয় এই মসজিদটি ৩০০বছরের পুরোনো। আমি ব্যক্তিগত ভাবে মসজিদটি সামান্য সংস্কার করেছি। সরকারি ভাবে মসজিদটি সংরক্ষনের কথা বলেন তিনি।
তারাপুরের এই মসজিদের মতো আরেকটি মসজিদ রয়েছে পাশের মালশন গ্রামে। এর দৈর্ঘ্য, প্রস্থ ও উচ্চতা তারাপুর গ্রামের মসজিদের চেয়ে একটু বড়। তবে নির্মাণশৈলী একই ধরনের। এই মসজিদটি সম্পর্কেও পরিষ্কার কোনো ইতিহাস কেউ বলতে পারেন না। এখানে একসঙ্গে পাঁচজনের নামাজ আদায় করার মতো জায়গা রয়েছে।
পুরনো ও জীর্ণ মসজিদ দুটি অনেকটা পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। কালের সাক্ষী হিসেবে দাঁড়িয়ে থাকলেও সেখানে আর মুয়াজ্জিনের আজান ধ্বনিত হয় না। মসজিদ দুটিতে সর্বশেষ নামাজ পড়াও হয়েছে প্রায় দেড়শত বছর আগে।
পৌর শহরের মালশন এলাকার এই মসজিদের জায়গার বর্তমান মালিক ৭০ বছরের আমজাদ হোসেন বলেন, আমি দাদার কাছে শুনেছি এই মসজিদটি প্রায় ৩০০বছরের বেশি পুরোনো। মসজিদের অবস্থা খুব জরাজীর্ণ।
মসজিদ দুটি কত আগে তৈরি হয়েছিল, কে তৈরি করেছিলেন, কেন এত ছোট ছিল, এসব বিষয়ের সঠিক ইতিহাস আড়ালে থাকলেও ঐতিহাসিক নিদর্শন হিসেবে এ দুটি অনেক গুরুত্ব বহন করে। কিন্তু প্রতœতত্ত¡ অধিদপ্তর বিভাগ এদিকে কোনো নজর দেয়নি কখনো। ভ্রমণপিপাসু ও ইতিহাস অনুসন্ধিৎসু শত শত দর্শনার্থী প্রতিদিন মসজিদ দুটি দেখতে ওই দুই গ্রামে যান। প্রতœতত্ত¡ বিভাগ মসজিদ দুটির তদারক না করলে যে কোনো সময় নষ্ট হতে পারে প্রাচীন এই স্থাপত্য।
সান্তাহার পৌরসভার প্যানেল মেয়র জার্জিস আলম রতন বলেন, পৌরসভা থেকে সংস্কার বা সংরক্ষনের কোনো উদ্দোগ নেওয়া যায় কিনা সেইটা দেখবো। আর এইসব স্থাপনা সংরক্ষন করা দরকার তা না হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে ইতিহাস অজানা হয়ে থাকবে।
এ বিষয়ে বগুড়া আঞ্চলিক প্রতœতত্ত¡ অধিদপ্তরের পরিচালক ড. মোছাঃ নাহিদ সুলতানা বলেন, দুটো মসজিদের বিষয়ে আমি জানি না, তবে তারাপুরের একটি মসজিদ আমি নিজে সরজমিনে গিয়েছিলাম খুবই ছোট একটি মসজিদ ছিল। একটা মসজিদের যে বৈশিষ্ট্যগুলো থাকার দরকার সেই বৈশিষ্ট্যগুলো সেখানে ছিল না। ছোট ঔ ঘরকে মানুষ কেন মসজিদ বলছে তা আমার জানিনা। এটার পক্ষে কোনো কাগজ বা লিখিত কোনো তথ্য পাই নাই। এখানে যে ইট ব্যবহার করা হয়েছে তা অনেক পরের ইট এবং জোড়াতালি দেওয়া একটি ঘর। আর মালশনের মসজিদটি বিষয়ে জানতাম না যার কারণে পরিদর্শন করা হয় নাই । আমাদের লোক সরজমিনে গিয়ে মসজিদটি পরিদর্শন করবে।

আরও পড়ুন
বগুড়া মহাস্থান মাজারের ১৫ দানবাক্সে মিলল সাড়ে ৩৪ লাখ টাকা, গণনায় লেগেছে প্রায় দুই দিন
ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় গাঁজাসহ মাদক কারবারি গ্রেফতার
নওগাঁয় সরকারি কর্মকর্তা পরিচয়ে প্রতারণা করায় যুবক আটক