হোম » অন্যান্য বিভাগ » শহীদ সৈয়দ নজরুল থেকে সৈয়দ আশরাফ অতঃপর সৈয়দা লিপি এমপি 

শহীদ সৈয়দ নজরুল থেকে সৈয়দ আশরাফ অতঃপর সৈয়দা লিপি এমপি 

শাহজাহান সাজু (কিশোরগঞ্জ) প্রতিনিধ: শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম (১৯২৫-১৯৭৫) আইনজীবী, রাজনীতিক এবং মুজিবনগরে অস্থায়ী বাংলাদেশ সরকারের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি।
১৯২৫ সালে কিশোরগঞ্জ জেলার যমোদল দামপাড়ায় তাঁর জন্ম। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৪৭ সালে ইতিহাসে এম.এ এবং ১৯৫৩ সালে এল.এল.বি ডিগ্রী লাভ করেন। ছাত্রজীবন থেকেই তিনি রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন।
১৯৪৬-৪৭ সালে তিনি সলিমুল্লাহ মুসলিম হল ইউনিয়নের সহ-সভাপতি ছিলেন। পরবর্তী সময়ে তিনি মুসলিম ছাত্রলীগের সম্পাদক নির্বাচিত হন। সৈয়দ নজরুল ইসলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিকেট ও হকি টীমের ক্যাপ্টেন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র ইউনিয়নের (ডাকসু) ক্রীড়া সম্পাদক ছিলেন।
১৯৪৯ সালে পাকিস্তান সেন্ট্রাল সুপিরিয়র সার্ভিস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে তিনি সরকারের কর বিভাগে অফিসার পদে যোগ দেন। ১৯৫১ সালে সরকারি চাকুরিতে ইস্তফা দিয়ে তিনি ময়মনসিংহ আনন্দমোহন কলেজে ইতিহাসের অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন। পরে তিনি ময়মনসিংহে আইন পেশা শুরু করেন। ভাষা আন্দোলনকালে গঠিত সর্বদলীয় অ্যাকশন কমিটির সদস্য হিসেবে ভাষা আন্দোলনে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। সৈয়দ নজরুল ইসলাম আওয়ামী লীগের সদস্য হিসেবে তাঁর রাজনৈতিক জীবন শুরু করেন। ১৯৫৭ সালে তিনি ময়মনসিংহ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত হন।
১৯৬৪ সালে তিনি আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সিনিয়র সহ-সভাপতি নির্বাচিত হন। ১৯৬৬ সাল থেকে ছয়দফা আন্দোলনের তীব্রতা বাড়তে থাকলে আইয়ুব সরকার আওয়ামী লীগের সভাপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সহ বহুসংখ্যক নেতা-কর্মীকে গ্রেফতার করে।
সেই সঙ্কটময় সময়ে সৈয়দ নজরুল ইসলাম আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন (১৯৬৬-১৯৬৯)।১৯৬৯ সালে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ‘ডেমোক্রেটিক অ্যাকশন কমিটি’ নামে একটি সর্বদলীয় সংগ্রাম কমিটি গঠন করে এবং এর অন্যতম প্রধান নেতা হিসেবে তিনি আইয়ুব বিরোধী গণআন্দোলনে (১৯৬৯) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা নিরসনের লক্ষ্যে রাওয়ালপিন্ডিতে সরকারের সাথে বিরোধীদলগুলির গোলটেবিল বৈঠকে (১৯৬৯) তিনি আওয়ামী লীগের প্রতিনিধি দলের সদস্য ছিলেন। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে ময়মনসিংহ-১৭ নির্বাচনী এলাকা থেকে তিনি জাতীয় পরিষদের সদস্য এবং আওয়ামী লীগ সংসদীয় দলের উপনেতা নির্বাচিত হন।
১৯৭১-এর অসহযোগ আন্দোলনে তাঁর ভূমিকা ছিল প্রশংসনীয়। ঢাকায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার মধ্যে অনুষ্ঠিত বৈঠকে (১৯ মার্চ ১৯৭১) সৈয়দ নজরুল ইসলাম ছিলেন বঙ্গবন্ধুর অন্যতম সহযোগী। ২৫ মার্চ (১৯৭১) বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের গ্রেপ্তারের পর সৈয়দ নজরুল ইসলাম দলের ভারপ্রাপ্ত সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল মুজিবনগরে স্বাধীন বাংলাদেশ সরকার গঠিত হয়। নবগঠিত এই সরকারের রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানের কারাগারে বন্দি থাকায় তাঁর অনুপস্থিতিতে উপ-রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হিসেবে বাঙালির মহান মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দেন। স্বাধীনতার পর শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে গঠিত বাংলাদেশ সরকারের নতুন মন্ত্রিপরিষদে সৈয়দ নজরুল ইসলামকে শিল্প মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর দায়িত্ব দেয়া হয়।
১৯৭৫ সালের ২৪ জানুয়ারি পর্যন্ত তিনি এ দায়িত্ব পালন করেন। বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়ন কমিটির সদস্য হিসেবে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। যুদ্ধ বিধ্বস্ত শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলির পুনর্গঠনে তিনি নিরলস কাজ করেছেন। ১৯৭২ সালে তিনি আওয়ামী লীগ পার্লামেন্টারি পার্টির উপনেতা নির্বাচিত হন।
১৯৭৩ সালে সাধারণ নির্বাচনে ময়মনসিংহ-২৮ নির্বাচনী এলাকা থেকে তিনি জাতীয় সংসদের সদস্য নির্বাচিত হন এবং মন্ত্রিসভার সদস্য হিসেবে শিল্প মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব লাভ করেন। তিনি দ্বিতীয় বারের মতো জাতীয় সংসদে দলের উপনেতা নির্বাচিত হন। তিনি শিল্পমন্ত্রী থাকাকালীন শিল্পকারখানা জাতীয়করণ করা হয়।
১৯৭৫ সালে সৈয়দ নজরুল ইসলাম উপ-রাষ্ট্রপতি হন। ওই বছর বাংলাদেশ কৃষকশ্রমিক আওয়ামী লীগ (বাকশাল) গঠিত হলে তিনি এর সহ-সভাপতি নির্বাচিত হন।১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সেনাবাহিনীর কতিপয় সদস্য কর্তৃক সপরিবারে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নিহত হন। এরপর দেশে সামরিক আইন জারি করা হয় এবং খোন্দকার মোশতাক আহমদ রাষ্ট্রপতি হয়ে পুরনো সহকর্মীদের কয়েকজনকে তাঁর মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত করেন।
কিন্তু সৈয়দ নজরুল ইসলামসহ চার নেতা  তাজউদ্দিন আহমদ,  এম. মনসুর আলী এবং  এ.এইচ. এম কামারুজ্জামান উক্ত মন্ত্রিসভায় যোগদানে অস্বীকৃতি জানালে ২৩ আগস্ট গ্রেফতার হয়ে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি হন। ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর মধ্যরাতে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে সৈয়দ নজরুল ইসলামসহ চার নেতাকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়।
তাঁকে বনানী গোরস্থানে সমাহিত করা হয়।সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের জন্ম (১ জানুয়ারি ১৯৫২)-(মৃত্যু ৩ জানুয়ারি ২০১৯) ছিলেন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের শুদ্ধতম একজন রাজনীতিবিদ ও মন্ত্রী। তিনি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের দুইবারের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন।তিনি কিশোরগঞ্জ-৩ আসন থেকে সপ্তম ও অষ্টম, কিশোরগঞ্জ-১ আসন থেকে নবম, দশম ও একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়নে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।
তিনি ২০১৫ সাল থেকে মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ছিলেন। এর পূর্বে তিনি স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ছিলেন।সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম বলেছিলেন “রাজনীতি করলে দুর্নীতি ছাড়েন, দুর্নীতি করলে রাজনীতি ছাড়েন” “আওয়ামীলীগ একটি অনুভূতির নাম, একজন কর্মী ব্যাথা পেলে সে ব্যাথা আমিও পাই” “ছাত্রলীগ জাতির ভবিষ্যৎ তৈরীর কারিগর” ছাত্রলীগে যেমন বীর সেনানির জন্ম হয়, তেমনি মোস্তাকেরও জন্ম হয়”।
বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ও তার সহযোগী সংগঠন সৈয়দ আশরাফুল ইসলামকেকোনদিন ভুলবে না।শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম এর অসমাপ্ত স্বপ্ন পূরণের নিভৃতচারি সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের মৃত্যুর পর।
তার ছোট বোন ডা. সৈয়দা জাকিয়া নূর লিপি কিশোরগঞ্জ-১ (সদর-হোসেনপুর) আসনের সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে পিতা সৈয়দ নজরুল ও ভাই সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের অসমাপ্ত কাজের স্বপ্ন পূরণে নিরলস প্রচেষ্টা চালিয়ে আজ তিনি একজন সফল জনপ্রতিনিধি।
কিশোরগঞ্জ হোসেনপুরের সর্বসাধারণ দল মত নির্বিশেষে শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলামের কন্যা ও সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম এর বোন ডাক্তার সৈয়দা জাকিয়া নূর লিপি এমপিকে আসন্ন দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পুনরায় এমপি হিসাবে পেয়ে সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের অসমাপ্ত কাজগুলি ও নিজের চলমান উন্নয়নমূলক কাজগুলি সমাপ্ত সমাপ্ত করতে পারবে বলে নির্বাচনী এলাকার মানুষের একান্ত বিশ্বাস। কিশোরগঞ্জ হোসেনপুর বাসীর আওয়ামী রাজনীতির ভরসা স্থল শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলামের পরিবার।
শেয়ার করুন আপনার পছন্দের সোশ্যাল মিডিয়ায়
error: Content is protected !!