হোম » মতামত » ভারতে ইলিশ রপ্তানী – সরকারের কূটনীতি ও জনগনের প্রতিক্রিয়া

ভারতে ইলিশ রপ্তানী – সরকারের কূটনীতি ও জনগনের প্রতিক্রিয়া

মোঃ মনিরুল ইসলাম: নজিরবিহীন ছাত্র-জনতার বিক্ষোভ ও আন্দোলনের মুখে ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ড. মুহাম্মদ ইউনুসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ক্ষমতায় আসে। এরপর থেকেই ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের টানাপোড়েন শুরু হয়। এর মধ্যেই এবার পূজায় প্রতিবেশী দেশটিতে ইলিশ রপ্তানি বন্ধের ঘোষণা দিয়েছিলেন মৎস্য ও প্রাণীসম্পদ বিষয়ক উপদেষ্টা ফরিদা আখতার। প্রতিবেশী ভারতে ইলিশ রপ্তানি বন্ধের কথা দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই বলে আসছিলেন নতুন অন্তর্বর্তী সরকারের এই উপদেষ্টা। বাংলাদেশের মানুষের কাছে সহজলভ্য করে তুলতেই এমন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়ে ছিলেন তিনি। এর কয়েক দিন আগে এই উপদেষ্টা বিবিসিকে বলেন, ‘অনেক মাছ এখনো বাংলাদেশ থেকে ভারতে যাচ্ছে। এবার আমরা ইলিশকে সীমান্ত পার হতে দেব না।’ গত ১১ আগস্ট তিনি আবার বলেন- দেশের মানুষের চাহিদা মিটিয়ে তারপর ইলিশ মাছ বিদেশে রপ্তানি করা হবে। ইলিশ রপ্তানি বন্ধ করা হবে কি না, সাংবাদিকরা প্রশ্ন করলে ওইদিন তিনি বলেন, দেশের মানুষ যাতে ইলিশ মাছ পায় এবং দাম কমে সেই উদ্যোগ নেওয়া হবে। দেশের মানুষ ইলিশ পাবে না আর রপ্তানি হবে সেটা হতে পারে না। কিন্তু দেড় মাসের মাথায় সেই অবস্থান থেকে সরে এসে নরম হয়েছে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। আসন্ন দুর্গাপূজা উপলক্ষে ভারতে ইলিশ মাছ রপ্তানির অনুমোদন দিয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। গত ২১/০৯/২০২৪ তারিখ শনিবার বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের রপ্তানি-২ শাখার উপসচিব সুলতানা আক্তার স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে এই সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়। চিঠিতে বলা হয়, দুর্গাপূজা উপলক্ষে বিভিন্ন রপ্তানিকারকদের আবেদনের ভিত্তিতে নির্ধারিত শর্তাবলি পালন সাপেক্ষে ৩ হাজার টন ইলিশ মাছ রপ্তানির অনুমোদন দেওয়া হলো।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য মতে, কলকাতা ফিশ ইমপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন সম্প্রতি কলকাতায় বাংলাদেশ উপ-হাইকমিশনে দুর্গাপূজা উপলক্ষে ইলিশ চেয়ে আবেদন করেছে। পরে উপ-হাইকমিশন বিষয়টি বাণিজ্য ও পররাষ্ট্র্র মন্ত্রণালয়কে জানায়। রপ্তানীর সিদ্ধান্তের বিষয়ে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা ফরিদা আখতার বলেন, ইলিশ রপ্তানির সিদ্ধান্ত বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের, ভারতের বিশেষ অনুরোধে বানিজ্য মন্ত্রণালয় এই অনুমতি দিয়েছে। আমরা না, আমাদের কমিটমেন্ট আগের মতোই আছে। এই উপদেষ্টা আরও বলেন, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় স্বাধীনভাবে এটা (রপ্তানির অনুমোদন) দিয়েছে। তারা একটা অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে এ অনুমোদন দিয়েছেন। দুর্গাপূজা উপলক্ষে ভারতের বিশেষ অনুরোধ ছিল, সে অনুযায়ী তারা করেছেন। রপ্তানি করলেই ইলিশের দাম বেড়ে যাবে না উল্লেখ করে মৎস্য উপদেষ্টা বলেন, দাম বেড়ে যাবে এটাও ঠিক না। দেশে অনেক ইলিশ আছে, গতবারও তারা কম ইলিশ নিয়েছে আর রপ্তানির খবরে দাম বাড়লে ব্যবস্থা নেব। এর একদিন পর অর্থ ও বানিজ্য উপদেষ্টা ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ বিষয়টি সুন্দরভাবে উপস্থাপন করে বলেন-দেশের বৃহৎত্তর স্বার্থে এবং সর্বোচ্চ মহলের সিদ্ধান্তে ইলিশ রপ্তানীর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রতিবছর পূজার সময় বিশেষ করে আওয়ামীলীগ সরকারের আমলে পূজা উৎসবে ভারতে ইলিশ রপ্তানি হতো। কিন্তু এবার দুর্গাপূজা ঘিরে পাতে ইলিশ না পাওয়ার শঙ্কায় পড়েছিল ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মানুষ। ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিখ্যাত ‘ইলিশ কূটনীতির’ প্রসঙ্গটি টেনে অন্তর্র্বর্তী সরকারের পদক্ষেপের বিষয়ে ফরিদা আখতার বলেছিলেন, ‘আগের সরকার দুর্গাপূজার সময় নিষেধাজ্ঞা তুলে নিত। তারা এটাকে উপহার বলত। এইবার আমি মনে করি না, আমাদের উপহার দেওয়ার দরকার আছে কারন ভারতে প্রচুর পরিমাণে রপ্তানির অনুমতি দিলে আমাদের লোকেরা মাছ খেতে পারবে না।’ হাসিনা সরকারের আমলে উৎসবের মৌসুমগুলোতে ভারতে বিপুল পরিমাণ মাছের চালান পাঠানো হত। সরাসরি পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছেও ইলিশ উপহার হিসেবে পাঠিয়েছেন তিনি। ২০১৭ সালে ভারতের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট প্রণব মুখার্জিকেও ৩০ কেজি ইলিশ উপহার দিয়েছিলেন শেখ হাসিনা।

বিবিসির তথ্যমতে, বাংলাদেশের মোট মাছ উৎপাদনের প্রায় ১২ শতাংশই ইলিশ। দেশের জিডিপিতে এটি প্রায় ১ শতাংশ অবদান রাখে। বাংলাদেশের জেলেরা বছরে ছয় লাখ টন ইলিশ ধরেন কারো মতে এই পরিমান ৭ লাখ টন আবার কারো মতে ৫ লাখ টন। আর এই মাছের বেশির ভাগটাই আসে সমুদ্র থেকে। বাংলাদেশ ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গজুড়ে বাঙালি সংস্কৃতি এবং রন্ধন প্রণালিতে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে ইলিশ মাছ। সূক্ষম স্বাদ এবং নানা ব্যবহারের জন্য এই মাছ সর্বদা সমাদৃত ও প্রশংসিত। বিগত বছরগুলোতে সরকার ভারতে দুর্গাপূজার সময় বছরে তিন থেকে পাঁচ হাজার টন ইলিশ রপ্তানির অনুমতি দিত। দুর্গাপূজা উপলক্ষে বেশ কয়েক বছর ধরেই বাংলাদেশ থেকে ভারতে রপ্তানি করা হয় ইলিশ মাছ। তবে এবার তা নিয়ে কিছুটা অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছিল। বাংলাদেশের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে ইলিশ মাছ রপ্তানি নিয়ে চলমান আলোচনার মধ্যেই আবারও সামনে আসলো অন্তর্র্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. আসিফ নজরুলের একটি ফেসবুক স্ট্যাটাস। বিগত আওয়ামী সরকারের সময়ে ২০১৯ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর স্ট্যাটাসটি দিয়েছিলেন তিনি। স্ট্যাটাসে অধ্যাপক ড. আসিফ নজরুল তখন লিখেছিলেন, ‘‘৫০০ মেট্র্রিক টন ইলিশ! বিপুল পরিমাণে ইলিশ ভারতে রপ্তানী করে তাদের কেন খুশী করা হচ্ছে ? সীমান্তে বাংলাদেশের মানুষ মেরে ফেলার জন্য ? অভিন্ন নদীর পানি থেকে আমাদের বঞ্চিত করার জন্য ? বাণিজ্য ভারসাম্য না রাখার জন্য ? কথায় কথায় বাংলাদেশ সম্পর্কে অবমাননাকর মন্তব্যের জন্য ?’’ তখন তার ওই স্ট্যাটাসটি বিভিন্ন মহলের প্রশংসা পেলেও এবার তিনি সরকারে থাকায় এবং ভারতে ইলিশ রপ্তানীর নতজানু সিদ্ধান্তের কারনে সমালোচনার ঝড় বইছে। তবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভারতে ইলিশ রপ্তানির বিপক্ষে যেমন জনমত রয়েছে তেমনি পক্ষেও অনেকের মতামত রয়েছে। বাংলাদেশের ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্য বা জিআই পণ্য হিসেবে ২০১৭ সাল থেকে স্বীকৃত ইলিশ। টানা পাঁচ বছর ধরে ভারতে ইলিশ রপ্তানি করে আসছে বাংলাদেশ। যদিও ২০১২ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত রপ্তানি বন্ধ ছিল। প্রায় প্রতিবছর দুর্গাপূজা উপলক্ষে পাঁচ হাজার টন ইলিশের চাহিদার কথা জানিয়ে থাকেন ভারতের ব্যবসায়ীরা।

হিন্দু বাঙালিদের সবথেকে বড় ধর্মীয় উৎসব দুর্গাপূজার সময় ভারতে ইলিশ মাছ পাঠানো- না পাঠানো নিয়ে বহু আলোচনা, সমালোচনা ও অনিচয়তার পর অবশেষে তিন হাজার টন ইলিশ রফতানির সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশের অন্তর্র্বর্তীকালীন সরকার। এটাকে পশ্চিম বাংলার মানুষ ও মৎস ব্যবসায়ীরা অত্যন্ত ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। ভারতের ফিস ইমপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সম্পাদক সৈয়দ আনোয়ার মাকসুদ বলেন, ‘‘এই সিদ্ধান্তটা আমাদের দুই দেশের সম্পর্ককে আরও গভীর করবে। বিশেষ করে দুই বাংলার সম্পর্ক আরও শক্ত হবে। আশা করি সামনের বছরও বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে আমরা এবারের মত ইলিশ পাব। একই সঙ্গে আমাদের পক্ষ থেকে বাণিজ্যকে এগিয়ে নেয়ার চেষ্টা করব।’’ দুর্গাপূজা উপলক্ষে ভারতে যে ইলিশ রফতানি হয় সেই মাছের চালান মূলত যায় পশ্চিমবঙ্গের বাজারগুলোতে। যদিও সরকারের তরফ থেকে বলা হয়েছিল, দেশের মানুষ যাতে দামী মাছ ইলিশ খেতে পারে তাই ভারতে ইলিশ রফতানি করা হবে না। তবে শেষ পর্যন্ত সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরকার দৃশ্যত সরে এসেছে। এখন প্রশ্ন হল, দুর্গাপূজার সঙ্গে সত্যিই কি ইলিশ মাছ আরও নির্দিষ্ট করে বললে পদ্মার ইলিশ খাওয়ার কোনও যোগ আছে কি ? বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দুর্গাপূজার যে ধর্মীয় আচার, সেখানে কোথাও ইলিশ মাছ বা পদ্মার ইলিশের প্রসঙ্গ নেই। এটি মূলত: প্রাচীনকাল থেকে চলে আসা একটি লোক কালচার, যা এখন বাঙালিদের একাংশের ‘হুজুগ’-এ পরিণত হয়েছে। দুর্গাপূজার সময়ে অর্থাৎ শরৎকালে ইলিশ মাছ খাওয়ার ‘হুজুগ’ সম্প্রতি শুরু হলেও গাঙ্গেয় বঙ্গদেশে ইলিশ মাছের কথা প্রাচীন সাহিত্যকর্ম এবং পুরাণে একাধিকবার উল্লেখিত হয়েছে বলে জানা যায়। ইলিশ মাছ নিয়ে লেখা বই ‘ইলিশ পুরাণ’-এ পশ্চিমবঙ্গের ইলিশ-গবেষক দিগেন বর্মন লিখেছেন, ‘‘পদ্মপুরাণে রান্নার নানারকম বিবরণ আছে, তারকা তার নন্দাই লখিন্দরের জন্য যে রান্না করেছিলেন তাতে মাছ আর শাক এর পাশাপাশি সরিষা ও ইলিশের কথা উল্লেখ আছে।’’ বর্মনের লেখা থেকে এটা স্পষ্ট হয় যে বাঙালির রান্নায় ইলিশ মাছের উপস্থিতি বহু যুগ ধরেই রয়েছে। যদিও দুর্গাপূজার সঙ্গে ইলিশ মাছের কোনও সম্পর্ক খুঁজে পাওয়া যায় না বলে জানিয়েছেন আরও একজন পুরাণ গবেষক শরদিন্দু উদ্দীপন। শরদিন্দু উদ্দীপন বলেন, ‘‘দুর্গাপূজায় ইলিশ মাছ ভোগ দেওয়ার যে প্রথা এখন দেখা যায়, তার কোনও পৌরাণিক ব্যাখ্যা নেই। এই প্রথা শুরু হয় অষ্টাদশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে, কলকাতায় যখন রাজা নব কৃষ্ণ দেব দুর্গাপূজা শুরু করলেন তখন থেকে।’’ তার আগ পর্যন্ত অবিভক্ত বঙ্গে ইলিশ মাছ ছিল লোক-উৎসবের অংশ।

দেশে ইলিশ উৎপাদন ৬ লক্ষ টন, রপ্তানী হয় গড়ে ৫ হাজার টন যা উৎপাদনের শতকরা ১-২%। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্যমতে, ২০১৯- ২০২৩ সাল পর্যন্ত ভারতে ইলিশ রপ্তানী হয়েছে ৩ হাজার ৮৯৯ মেট্রিকটন। তবে অনেকেরই ধারনা বাস্তবে আরও অনেক বেশী ইলিশ মাছ ভারতে যায় বিভিন্ন অবৈধ পন্থায়। এই চোরাচালান ও সাগর থেকে ইলিশ চুরি ঠেকাতে কার্যকর ব্যবস্থা কখনই নেওয়া হয় নাই। সোনাদিয়াসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন জলসীমা দিয়ে ইলিশ চুরি ঠেকানো সম্ভব হচেছ না। ডিম ছাড়ার মৌসুমে ইলিশ ধরার নিষেধাক্কা দিলে বাংলাদেশের জেলেরা মানলেও ভারতীয় জেলেরা তা মানছেনা। ইলিশের উৎপাদন বাড়ানোর জন্য নিরাপদ প্রজনন নিশ্চিন্তে বছরের বিভিন্ন সময়ে মাছ ধরা নিয়ে নিষেধাক্কা দিয়ে থাকে সরকার। বাংলাদেশে প্রতিবছর ১৯ মে মধ্যরাত থেকে ২৩ জুলাই পর্যন্ত ৬৫ দিন সমুদ্রে সব ধরনের মাছ ধরা নিষেধ থাকে। ভারতের অংশে ১ এপ্রিল থেকে ৩১ মে পর্যন্ত নিষেধাক্কা থাকে। এই নিষেধাক্কা মায়ানমারে চলে বাংলাদেশের সঙ্গে মিল রেখে কিন্তু ভারত অভিন্ন নিয়মে না গিয়ে চিরাচরিতভাবে এই সময়টায় বিপুল পরিমান মাছ ধরে নিয়ে যায়। বাংলাদেশের জেলেরা শত অভাব অনটনে থেকেও এসময় মাছ ধরা থেকে বিরত থাকে কিন্তু ভারতীয় জেলেদের তা মানার দরকার হয়না। এছাড়াও ভোলার ২টি এবং চাদপুর, বরিশাল ও শরীয়তপুরে ১টি করে ইলিশের মোট ৫টি অভয় অরন্য আছে। এসকল অভয় অরন্যে এপ্রিল ও মে মাসে মাছ ধরার নিষেধাক্কা থাকে। আর পটুয়াখালীর গুরুত্বপূর্ন অভয় অরন্যে নভেম্বর থেকে জানুয়ারী পর্যন্ত ইলিশ আহরন সম্পূর্ন নিষিদ্ধ থাকে। পাশাপাশি প্রতিবছর নভেম্বর-জুন পর্যন্ত মোট ৮ মাস জাটকা ধরার নিষেধাক্কা চলে। আর এই নিষেধাক্কা ভারতে একবারই থাকে তাও আবার ১ মাসের জন্যে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বাংলাদেশের লক্ষ লক্ষ জেলে এবং ইলিশের কাঙ্খিত প্রজনন ও আহরন ব্যাহত হচ্ছে উল্লেখযোগ্য হারে। বাংলাদেশে নিষেধাক্কা চলে আর ভারতীয় জেলেরা হরিলুটের মতো বাংলাদেশের সীমান্তে ঢুকে অবাধে মাছ ধরে নিয়ে যায়। বেসরকারী প্রতিষ্ঠান ‘সেভ আওয়ার সি’ এর তথ্যমতে প্রতিবছর বঙ্গপোসাগর থেকে ৮০ লক্ষ টন ইলিশ ধরা পড়লেও বাংলাদেশের জেলেরা ধরতে পারছে মাত্র ৭ লক্ষ টন। বাংলাদেশের জেলেদের দীর্ঘদিনের দাবী বাংলাদেশ, ভারত ও মায়ানমারের জলসীমায় একই সঙ্গে এবং একই সময়ে নিষেধাক্কা দিলে ইলিশের প্রজনন বৃদ্ধিপাবে পাশাপাশি মাঝ সমূদ্রে ভারতের ইলিশ পাচার ও সিন্ডিকেট ধরতে পারলে দেশের বাজারে ইলিশের কোন অভাব থাকবেনা।
ভারতে ইলিশ রপ্তানীর সিদ্ধান্ত বর্তমান ইউনুস সরকারের একটি নতজানু পররাষ্ট্র নীতি নাকি কৌশলগত কূটনৈতিক শিষ্টাচার সেটি নিয়ে আলোচনা করা যেতে পারে। আপাত দৃষ্টিতে নতজানু মনে হলেও এটি অদূর ভবিষ্যতে সুফল বয়ে আনতে পারে বলে অনেকের ধারনা। ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ এটি জাতির বৃহৎত্তর স্বার্থে অনেক ভেবে চিনতে করা হয়েছে বলে যে বক্তব্য দিয়েছেন সেটি যতেষ্ট গুরুত্ব পাচ্ছে কূটনৈতিক মহলে। হাসিনার পতনের পর পশিচমবাংলাসহ গোটা ভারত বাংলাদেশের সঙ্গে যে বৈরী মনোভাব নিয়ে আছে তাতে এই ইলিশ রপÍানীর মাধ্যমে জল ঢেলে দেওয়া হয়েছে বলে অনেকের ধারনা। এতে করে দুই দেশের মধ্যে বিরাজমান বৈরীভাব কমবে বৈকি। তাছাড়া বৈদেশিক নীতির একটি অন্যতম মানদন্ড হল প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে সময় বুঝে কঠোর হওয়া আবার সময় বুঝে নমনীয় হওয়া। ভারতের সাথে আমাদের ভু-রাজনীতি, অর্থনীতি, সীমান্তনীতিসহ বৈদেশিক আমদানী-রপ্তানী অনেক কিছুই একতরফাভাবে নির্ভরশীল। বাংলাদেশের বাজার নিয়ন্ত্রনে ভারতীয় পন্যের বিকল্প বাজার আমরা আজও খুজে পাইনি। চিকিৎসাসহ বিভিন্ন প্রয়োজনে ভারতে যাওয়ার ভিসা বর্তমান সরকার এখন পর্যন্ত ভারতের কাছ থেকে পুরোদমে চালু করতে পারে নাই। যেহেতু পূজা উপলক্ষে ভারতে ইলিশ রপ্তানী করাটা রেওয়াজে পরিনত হয়েছে এবং সেখানকার বাঙালীরা তীর্থের কাকের মত সারাবছর অপেক্ষা করে থাকেন পূজার সময় পদ্মার ইলিশ পাওয়ার আশায়, কাজেই সেটিকে হঠাৎ করে বন্ধ করা সমীচিন হবেনা। তাছাড়া এই রপ্তানীর কারনে স্থানীয় বাজারে ইলিশের দামের যে খুব বেশী প্রভাব পড়বে তাও নয়। উৎপাদিত ইলিশের ১% ভারতে রপ্তানী হয় যা কিনা ভরামৌসুমে বড়জোড় একটি ঘাটে একদিনের আহরিত ইলিশের পরিমানের সমান। কাগজে কলমে ৩ হাজার টন ইলিশ রপ্তানীর কথা বলা হলেও দূর্গাপূজার খুব বেশীদিন বাকী নেই, এত অল্প সময়ের মধ্যে উক্ত পরিমান ইলিশ রপ্তানী করা সম্ভব নয়। অতীতের কোন বছরই নির্ধারিত পরিমান ইলিশ রপ্তানী করা সম্ভব হয়নি এবারও হবেনা। তাই এই ইলিশ রপ্তানী নিয়ে খুব বেশী বিচলিত হওয়ার কোন কারন আছে বলে আমি ব্যক্তিগত ভাবে মনে করিনা। তাছাড়া বৈধভাবে ইলিশ রপ্তানী করার একটি সুবিধা হল এর মাধ্যমে চোরাচালান ও পাচার রোধ করা। সাম্প্রতিক কালে সুনামগঞ্জ সীমান্তে ৪৬ কেজি ইলিশ মাছ ভারতে পাচার কালে জব্দ হয়েছে। একইভাবে রাজশাহীর বাঘায় ২ মণ ইলিশ এবং কুমিল্লা সীমান্তে ৮৫০ কেজি ইলিশ ভারতে পাচারকালে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে জব্দ হয়েছে। ভারতে ইলিশ রপ্তানীর মাধ্যমে দেশের কূটনীতি ও অর্থনীতি দুটোই লাভবান হবে বলে আমার বিশ্বাস। আমাদের ভুলে গেলে চলবেনা, জুলাই মাসের ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সাথে একাত্বতা ঘোষনা করে কলকাতার বহু মানুষ কিন্তু সাবেক হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে রাজপথে অবস্থান নিয়ে নির্বিচারে মানুষ হত্যার প্রতিবাদ জানিয়ে ছিল। সেই কৃতজ্ঞতার কথা ¯œরণ করে হলেও আমাদের এই ক্ষুদ্র স্বার্থকে ত্যাগ করা যেতেই পারে। ইলিশ হোক দুদেশের বন্ধু ও ভাতৃত্বের প্রতিক, ঘুচে যাক সকল দ্ব›দ্ব ও স্বার্থের শৃঙখল।

ছবি , সংগৃহীত

লেখক,

মোঃ মনিরুল ইসলাম
সিনিয়র ব্যাংকার, জনতা ব্যাংক পিএলসি.
রাজশাহী।

শেয়ার করুন আপনার পছন্দের সোশ্যাল মিডিয়ায়
error: Content is protected !!