হোম » জাতীয় » ‘কঙ্কালটা খুঁজে দেন, লাশ চাই না’

‘কঙ্কালটা খুঁজে দেন, লাশ চাই না’

নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ যেন শোকে স্তব্ধ। নিখোঁজদের পরিবারের সদস্যরা তাদের খোঁজতে কারখানায় ভিড় করেন। অনেকেই কারখানার সামনে মূর্ছা যান। নিহতের বাড়িতে চলছে স্বজনদের আহাজারি। তাদের আহাজারিতে আকাশ-বাতাস যেন ভারী হয়ে ওঠেছে। নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে গাজী টায়ারস কারখানায় আগুনের ঘটনায় নিখোঁজদের বাড়ি বাড়ি চলছে আহাজারি আর শোকের মাতম। নিখোঁজদের বাড়িতে আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশিদের ভিড়। স্তব্ধ হয়ে পড়েছে পুরো এলাকা।

নিখোঁজদের স্বজনরা বলছেন, ‘যদি আগুনে পুড়ে মারা গিয়ে থাকে তাহলে লাশ না পাই কঙ্কালটা খুঁজে দেন।’

গঙ্গানগর এলাকার ফরিদা বেগম বলেন, ‘আমার স্বামী ইমান আলী গত ৫ আগস্ট কর্ণগোপ গাজী ট্যাংকের কারখানায় বন্ধুগো লগে গিয়ে গাজী পাম্প ও গাজী পাইপ নিয়ে আসে। গত ২৫ তারিখও বন্ধুগো লগে গেছিল রূপসী কারখানাতে টায়ার আনতে। রাত সাড়ে ১০টার দিকে আমার স্বামী শেখ ফরিদ আমারে কল দিয়া কইছিল আমরা ভবনের ছয় তলা বিল্ডিংয়ের ভেতরে আটকা পড়ছি। এরপর তার সাথে আর কোনো কথা হয়নি। সে এখন নিখোঁজ রয়েছে।’

তারাবো এলাকার নিখোঁজ মিল্লাতের স্ত্রী সাদিয়া আক্তার কান্না জড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘আমার স্বামী প্রতিবেশীদের সাথে গাজী টায়ারস কারখানায় যায়। আমি তার কোনো খোঁজ পাইতাছি না। আমার এক ছেলে ও এক মেয়েকে অহন কে দেখবে। কিভাবে চলবে আমার সংসার।’

মাসাবো গ্রামের দুই ভাইয়ের মধ্যে সুজন ছিল বড়। বড় ছেলেকে হারিয়ে এখন শোকে কাতর তার মা-বাবা। মাসাবো গ্রামের নিখোঁজ সুজন ছাড়া আয়-রোজগার করার মতো তার পরিবারের আর কেউ নেই। তার দুই সন্তানের ভবিষ্যৎ এখন অনিশ্চিত। গঙ্গানগর গ্রামের জাকিরের ছেলে মুন্না, আমির হোসেনের ছেলে মাসুদ, আনোয়ারের ছেলে সুমন, মজিবুরের ছেলে রাকিব, আলীমুদ্দিনের ছেলে নাঈম, সেরুর ছেলে ইকবাল,। সবুজকে হারিয়ে তার মা মাসুদা এখন বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন। বার বার কান্না করে বলছে ‘লাশ না পাই ছেলের কঙ্কালটা খুঁজে দেন।’

মুড়াপাড়া দড়িকান্দী গ্রামের ১৪ জন নিখোঁজ হয়। তাদের মধ্যে অটো-রিকশাচালক মামুন মিয়া (৪০)। তার বড় মেয়ে মহনা আক্তার স্থানীয় কর্ডোভা উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির ছাত্রী এবং ছোট মেয়ে রাইসা আক্তার দড়িকান্দী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রী। তাদের পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী মামুন মিয়া। তিনি নিখোঁজ হওয়ার পর তাদের আয়-রোজগারের কেউ নেই। কেমনে চলবে তাদের সংসার। কে দায়িত্ব নিবে তাদের সন্তানদের। কান্না জড়িত কণ্ঠে এসব কথা বলছিলেন মামুন মিয়ার স্ত্রী রোকসানা আক্তার। একই গ্রামের বাবা ইসরাফিল ও তার ছেলে ফটিক মিয়া দু’জনেই জামদানী কারখানার কারিগর। তারা অন্যদের মতো বাবা-ছেলে নিখোঁজ রয়েছেন।

বরপা গ্রামের নিখোঁজ সোহাগের বাবা আব্দুর রহমান জানান, ‘তিনি পেশায় একজন রিকশাচালক। দুই ভাই বোনের মধ্যে সোহাগ ছোট। তার বয়স ২০ বছর। কুমিল্লা জেলার দাউদকান্দি থেকে তিনি বরপা এসে ভাড়ায় থাকেন। গত ২৪ আগষ্ট রোববার সন্ধ্যায় বন্ধুদের সাথে সোহাগ বাড়ি থেকে বের হন। এরপরে তার সাথে আর কথা হয়নি। এমন নিখোঁজের ঘটনায় রূপগঞ্জের বরপা গ্রামের মানুষ হতবাক ও বিস্মিত। এমন ঘটনা আগে কখনো এ অঞ্চলের মানুষ দেখেনি।’

অন্যদিকে, মৈকুলী গ্রামের রাজুর বাড়িতে চলছে শোকের মাতম। প্রিয়জনকে হারিয়ে দিশেহারা তার পরিবারের সদস্যরা। ৪৫ বছর বয়সের রাজু ছিলেন তাদের পরিবারের একমাত্র আয়ের উৎস। তার নিখোঁজের ঘটনায় অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে তার স্ত্রী সন্তানদের ভবিষ্যৎ। ছাতিয়ান গ্রামের ১৩ জন নিখোঁজ রয়েছে। নিখোঁজ ব্যক্তিরা হলেন, হক মিয়ার ছেলে সুমন, চাঁন মিয়ার ছেলে ফজলুল হক, আব্দুল ওহাবের ছেলে আব্দুর রশিদ, বরকতউল্লার ছেলে শফিকুল ইসলাম, তমিউদ্দিনের ছেলে রুবেল, আব্দুল গণির ছেলে স্বপন, আব্দুল মোতালিবের ছেলে অহিদ, মোন্তাজউদ্দিনর ছেলে নজরুল ইসলাম, আবু সাঈদের ছেলে কামাল হোসেন, আলী আহম্মেদের ছেলে হাসান, আলম হোসেনের ছেলে জহির উদ্দিন, সাহেব আলীর ছেলে নজরুল মিয়া, সিরাজ মিয়ার ছেলে ফরহাদ মিয়া। তাদের সকলের বয়স ২০ থেকে ৩৫ বছর।

জানা গেছে, গত রোববার তারা সকলেই কয়েকটি অটোরিকশা ভাড়া করে গাজী টায়ারস কারখানায় যান। কিন্তু পরে তারা কেউ ফিরে আসেনি। সরেজমিনে তাদের বাড়িতে দেখা যায়, এক হৃদয় বিদারক দৃশ্য। নিখোঁজ রশিদের স্ত্রী ছালেমা খাতুন বুক চাপরে কাঁদছেন। তার স্বামী রশিদকে হারিয়ে বাকরুদ্ধ তার পরিবার। এমন ঘটনায় গ্রামের মানুষ নির্বাক। নিখোঁজ শফিকুল ইসলামের বাবা বরকতউল্লা বলেন, ‘চোখের সামনে সন্তান হারানোর খবর পাওয়া বড়ই হতভাগ্য কপাল আমার। আসলেই এই দুর্ঘটনা দু:খজনক।’ এদিকে, গাজী টায়ারস কারখানায় আগুনের ঘটনায় নারায়ণগঞ্জ বিজ্ঞ অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিষ্ট্রেট হামিদুর রহমানকে প্রধান করে আট সদস্য বিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।

তদন্ত কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন, নারায়ণগঞ্জ জেলা সহকারী পুলিশ সুপার হাবিবুর রহমান হাবিব, নারায়ণগঞ্জ জেলা গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো: আহসান হাবিব, নারায়ণগঞ্জ জেলা কল-কারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদফতরের উপ-মহাপরিদর্শক রাজিব চন্দ্র ঘোষ, নারায়ণগঞ্জ জেলা তিতাস গ্যাস কোম্পানি লিমিটেডের উপ-মহাব্যবস্থাপক প্রকৌশলী মো: মফিজুল ইসলাম, নারায়ণগঞ্জ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির-১-এর এজিএম সদর দফতর প্রকৌশলী জাফর সাদিক খাঁন, নারায়ণগঞ্জ জেলা ফায়ার সার্ভিস ও সিভিলি ডিফেন্সের উপ-সহকারী পরিচালক ও রূপগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো: আহসান মাহমুদ রাসেল।

ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা জানিয়েছেন, ‘ক্ষতিগ্রস্ত ছয় তলা ভবনটি খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। যেকোনো সময় ধসে পড়তে পারে বলেও শঙ্কা করছেন তারা। ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের সহকারী পরিচালক আনোয়ারুল হক জানান, ‘ভবনটি নাজুক অবস্থায় থাকায় এখন পর্যন্ত ভেতরে ঢুকে উদ্ধার অভিযান শুরু করা যায়নি।

তিনি বলেন, মঙ্গলবার ভোর ৫টার দিকে আগুন নেভাতে সক্ষম হয়েছেন তারা। তবে, ভেতরের উত্তাপ থেকে আবারো আগুন ধরার শঙ্কা রয়েছে। ভবনটা বেঁকে গিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় আছে। কয়েকটা জায়গায় সুড়কির মতো হয়ে গেছে। ভেতরে ঢুকে কাজ করা যাচ্ছে না। নিচ তলার সিঁড়ি পর্যন্ত ঢোকা গেছে।’ রূপগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আহসান মাহমুদ রাসেল জানান, ‘রূপগঞ্জ থানা পুলিশকে তালিকা তৈরির দায়িত্ব দেয়া হয়েছে।’ তালিকা তৈরি করে তদন্ত কমিটির কাছে হস্তান্তর করা হবে বলে জানান এ কর্মকর্তা।

-আওয়াজ ডেস্ক-

শেয়ার করুন আপনার পছন্দের সোশ্যাল মিডিয়ায়
error: Content is protected !!