
বাবা-মার ইচ্ছে তাদের ছেলে কিংবা মেয়ে একদিন মস্ত মানুষ হবে, মস্ত বড় ডাক্তার কিংবা ইঞ্জিনিয়ার হয়ে মানুষের সেবা করবে। আমাদের এ সমাজ কবে বুঝতে শিখবে শুধু একজন ডাক্তার কিংবা ইঞ্জিনিয়ারই মানুষের সেবা করে না, বরং সকল শ্রেণী-পেশার মানুষ একে অপরকে সেবা দেয়া এবং নেয়ার মাধ্যমেই আমরা সমাজে বাস করছি।
এমন কি কেউ আছেন যে কিনা একজন মুচি, কুলি, কৃষক, কিংবা রিক্সাচালক এদের সেবা না নিয়ে চলতে পারেন? ধরুন আজকে সব ড্রাইভাররা গাড়ী না চালানোর কিংবা ময়লা পরিস্কার করার কোন লোকই যদি ময়লা না নেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে কি আমরা পারবো সার্ভাইব করতে? এ জীবনে চলার পথ অনেক বিভীষিকাময়, আর মরুভূমির মতো মরিচীকাময় এপথ পাড়ি দিয়ে সামনে এগোতে এদের প্রত্যেকের সেবা আপনাকে নিতেই হবে।
হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ আপনার জুতো ছিঁড়ে গেলো, আপনাকে মুচির কাছে যেতেই হবে যদিনা আপনি খালি পায়ে বাড়ি যেতে চান। আপনি খুব বড়লোক, প্রাইভেট গাড়ি ছাড়া আপনি চলেনই না, রাস্তায় হঠাৎ গাড়ি নষ্ট হলো কিংবা তেল শেষ হলো, আপনাকে সেই লোকাল বাস, ভাড়ার গাড়ি, কিংবা অটো-রিক্সা চেপেই গন্তব্যে পৌঁছাতে হবে। আইন পেশাকে যতোই ঘৃণা করেন না কেনো, আইনী জটিলতায় পড়লে আপনাকে সেই আইনের লোকেদেরই দারস্থ হতে হবে।
শুধু ডাক্তারই কেনো আপনার কিংবা আপনার আপন জনের জীবন বাঁচালো! একবেলা খেয়ে দু’বেলা না খেয়ে পরিবারের কিংবা সন্তানের মুখে খাবার জোগাবার জন্য নির্ঘুম চোখে রাত-দুপুরে রাস্তায় নামা যে ব্যক্তি আপনাকে তড়িঘড়ি করে হাসপাতালের দোর পর্যন্ত নিয়ে এলো সে কেনো নয়? এভাবেই প্রতিনিয়ত প্রত্যেক পেশাই মানুষকে কোন না কোন ভাবে সেবা দিয়ে যাচ্ছে। তাই প্রতিটা বৈধ পেশাকেই শ্রদ্ধা করতে এবং সম্মান দিতে শিখুন। নিজের পেশা কিংবা ইচ্ছাকে সন্তানের উপর চাপিয়ে না দিয়ে বরং তার সুপ্ত প্রতিভা আবিষ্কার কিংবা সে কোন বিষয়ে পারদর্শী তা জানার চেষ্টা করুন।
বর্তমান সকল পেশা সম্পর্কে সন্তানকে অবগত করুন, পছন্দের বিষয় পছন্দ করতে তাকে স্বাধীনতা দিন। আপনার মতো করে তাকে ভাবিত করবেন না বরং তার মতো করে জগতটাকে ভাবতে দিন। যে রাস্তা দিয়ে সে হাঁটতে শিখছে তার কাঁটাগুলো উপরাতে তাকে সাহায্য করুন, একদিন সে সামিট পয়েন্টে পৌঁছে আপনার মুখ উজ্জ্বল করবে। সন্তানের পছন্দের বিষয়ে তাকে এগোতে দেয়া, তার স্বপ্ন পূরণ এবং তাকে সেই লক্ষ্যে পৌঁছাতে সাহায্য করাই একজন আদর্শ বাবা-মার দায়িত্ব হওয়া উচিত। আমাদের উচিত প্রত্যেকের আগ্রহকে স্বাধীনতা দেয়া এবং ইচ্ছাকে প্রাধান্য দেয়া।
সন্তানের যে সুখের জন্যেই প্রতিটা বাবা-মা এমনটা সিদ্ধান্ত নেন, সেই প্রকৃত সুখ আদৌ কোটি টাকার বাড়ি কিংবা দামি কোন গাড়িতে নয় বরং সাদামাটা ডাল-ভাতে নিহিত। ডাক্তার, ইন্ঞ্জিনিয়ার সন্তানের প্রতি নয় বরং সেই সন্তান যদি উতপ্তরোদে ঘামন্ত এবং ক্লান্ত শরীরে লোডেড মালামাল নিয়ে উঁচুতে উঠতে থাকা কোন ভ্যান ধাক্কা দিয়ে চালককে সহায়তা করে তার কারণেই বাবা-মার গর্বিত হওয়া উচিত। সেইতো প্রকৃত মানুষ, যে কি-না অপরের দুঃখে দুখী হয়। সন্তানের শুধুমাত্র প্রকৃত মনুষ্যত্ববোধটি জাগ্রত করুন, তাকে সৎ রাখার জন্য আপনাকে সারাক্ষণ ডাক্তার কিংবা ইন্ঞ্জিনিয়ার বানানোর চিন্তায় চিন্তিত থাকতে হবে না, একজন দিন মজুর হয়েও সে সততার পুরষ্কার পেতে পারে বা অন্য কোন পেশার মাধ্যমেও।
কি গ্যারান্টি ডাক্তার, ইন্ঞ্জিনিয়ার হলেই সে ন্যায়পরায়ণ একজন মানুষ হবে? আসুন আমরা সকলে নিজেদের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করে আমাদের সমাজকে এমনভাবে সাজাই যেভাবে বসন্ত তার নিজস্ব স্বাধীনতায় প্রকৃতিকে সাজায়, যেখানে থাকবে না কোন অপ্রয়োজনীয় বাঁধা, অসম্মান, অশ্রদ্ধা, বৈষম্য কিংবা কোন সীমাবদ্ধতা, থাকবে শুধু একটি স্বপ্নের এগিয়ে যাওয়ার গল্প!
লেখা :
বিনয় পাল
শিক্ষার্থী, আইন অনুষদ
ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটি।

আরও পড়ুন
অপ্রত্যাশিত দেখা!
উইশলিস্টে রাখতে পারেন তুহিন সুলতানা মুক্তি’র ” ভালোবাসতে পারো আমায় “
অটল সাহসের গান