হোম » প্রধান সংবাদ » তালের পুষ্টিগুণ ও উপকারিতা

তালের পুষ্টিগুণ ও উপকারিতা

মোহাম্মদ মহসীন : জনপ্রিয় ফল তাল। প্রকৃতিতে প্রতি বছরের ন্যায় ভাদ্র মাস এলেই পাকা তালের মৌ- মৌ গন্ধ জানান দিত এক সময়। ভাদ্র মাসে পাঁকা তালের কথা লোকমুখে কোনো কোনো অঞ্চলে থাকলেও কালে ভদ্রে শ্রাবণ মাসেই তাল পাঁকে। কঁচি তালের শাঁস- পাঁকা তাল বিক্রেতা হোসেন মিয়ার নিকট জানা গেছে; ভাদ্র মাসে নয় শ্রাবণ মাসেই তাল পাঁকে। এর মৌ মৌ গন্ধে গাঁও গ্রামের চারদিকে মুখরিত হয়। এখানে- সেখানে কিছুটা টিকে তার প্রভাব আছে। পাঁকা তালের গন্ধটা সুভাষিত। এর গন্ধে মৌমাছি, গুয়ামাছিও ভনভন আওয়াজ করে বেড়ায়। তালের রস

থেকে নানা ধরনের পিঠা-পায়েসও তৈরি হয় বলে এর কোনো জুড়ি নেই। তালের পুষ্টিগুণ স্বাস্থ্যের জন্য অনেক উপকারী। তালের পুষ্টিগুণাগুণ অনেক; পাঁকা তালের প্রতি ১০০ গ্রামে জলীয় অংশ ৭৭.২ গ্রাম, খনিজ০.৭ গ্রাম, আঁশ ০.৫ গ্রাম, আমিষ ০.৭ গ্রাম, চর্বি ০.২ গ্রাম, শর্করা ২০.৭ গ্রাম, ক্যালসিয়াম ৯ মিলিগ্রাম ও খাদ্য শাক্তি ৮৭ কিলোক্যালরী রয়েছে। তালের রসে শ্বাসনালীর লালাগ্রন্থিকে বাসকের মত সক্রিয় বলে শ্লেষ্মানাশক হিসেবে প্রসিদ্ধ।

টাটকা তালের রস মূত্রববর্ধক, কোষ্ঠাঠিন্য, উদ্দীপক, প্রবাহ নিবারক ও সর্দি কাশির মহৌষধ। এক সময় সোনারগাঁয়ের বৈদ্যেরবাজার ইউনিয়নের সাতভাইয়্যা গ্রামের বাসিন্দা বীর মুক্তিযোদ্ধা ফজলুল হক ভাই এক সময় গাছিয়া ছিল। ছেলেবেলায় তার কাছ থেকে সাদা সুপেয় জলের মত তালের মিষ্টি রস খেয়েছি। এখনও স্মৃতি মনে পড়ে। গাছ যা আছে, গাছিয়া নেই। তালের উপকারিতাও কম নয়- তালের রস যদিও মিষ্টি, তবে সুপেয় পানির মত পাতলা বলে খেতে সমাদৃত। যা প্রচন্ড গরমে তৃষ্ণা নিবারণে কঁচি শাঁস ও এর সুমিষ্ট পানি খেতে পছন্দ করে অনেকে। পাঁকা তালের রস

দিয়ে নানা ধরনের পিঠা, গুড়, পাটালি, মিছরি তৈরি করা যায়। সোনারগাঁ উপজেলার ফটকের একটু পূর্বদিকে রঞ্জিত বর্মনের দোকানে পাঁকা তাল দিয়ে তৈরি করা জিলাপি, বড়া, বিক্রি করতে দেখা যায়। এসব খাবার খেলেও মুখের রুচি বাড়ে। আর গন্ধটাও চমৎকার মনকাড়ে। ঝর-ঝর বর্ষার বাদলা দিনে দুপুরে ও সন্ধ্যায় তালের পিঠা খেতে অনেক মজা। গাঁও গ্রামে একটি প্রবাদ আছে- তাল, তেল, কুল, বংশ করে নির্মূল। যদিও কুসংস্কার তারপরেও জনবসতি বেড়ে

যাওয়ার করণে দুর্যোগ মোকাবেলা করার মতো পরিবেশ বান্ধব গাছ যেমন- পুকুর পাড়, বাড়ির ভিতরের কিংবা বাহিরের অংশ বর্ধিত করার জন্য তাল দিনের পর দিন কাটা পরছে। তালগাছের উচ্চতা ৬০ থেকে ৭০ ফুট। গুঁড়ি গোলাকার, পাতা শক্ত দেখতে পাখার মতো, অনেক উঁচু শিরা আছে। শিরাগুলো পত্রদন্ডের গোড়া থেকে আগা পর্যন্ত বিস্তৃত। পত্রদন্ডের উভয় কিনারায় কালো রংয়ের করাতের মতো দাঁত আছে। আর পুরুষ গাছে ফল ধরেনা। স্ত্রী

গাছের গরমের আগে মোচার মতো ফুল আসে। একটি মোচায় ২০-২৫টি ফল ধরে। ফল গোলাকার। ফলের রঙ কালো বা গাঢ় হলুদ। প্রতি ফলে ২-৪টি বীজ থাকে। তাল গাছ ১০০ বছরের বেশি বাঁচে। এদের বৈজ্ঞানিক নাম ঃ বোরোসাস ফ্ল্যবিলিফরমিস, ইংরেজি নাম ঃ পাল্মা, আরেকটি তালি পাম এর বৈজ্ঞানিক নাম করিফা তালিয়েরা রক্সবর্গ। ১৯১৯ সালে ব্রিটিশ উদ্ভিদ বিজ্ঞানী উইলিয়াম রক্সবার্গ ভারতের পূর্বাঞ্চলে এই গাছটি খুঁজে পান। দ্বিজেন শর্মা বলেছেন, এই প্রজাতির গাছ বিলুপ্ত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ- উপচার্যের বাসার পেছনে একটি তালি পাম গাছ

আছে। এটি মনে হয় বিশ্বের শেষ তালি পাম গাছ। এটি ছাড়া দেশীয় তালগাছ বাংলাদেশের প্রায় সবত্রই বিক্ষিপ্তভাবে জম্মায়। এই ঐতিহ্যবাহী খাবার বাঙালিদের ঘরে ঘরে তৈরি করে নিজেরা খায় এবং কুটুম আপ্যায়নে তালের কোনো জুড়ি নেই। তাল ভূমি সংরক্ষণ ও ঝড় প্রতিহত করতে সহায়ক ভূমিকা রাখে। তালপাতার পাখা, ডোঙা, খেলনা ও ঘরের ছাউনিতে ব্যবহার করা হয়। সরকারীভাবে ঘূর্ণিঋড় ও বজ্রঝড় ঠেকানোর জন্য দেশব্যাপী ব্যাপক চাহিদা মাফিক লাগানো যেতে পারে।

-মোহাম্মদ মহসীন,

প্রকৃতি ও পরিবেশবিষয়ক লেখক

শেয়ার করুন আপনার পছন্দের সোশ্যাল মিডিয়ায়
error: Content is protected !!