
মুহাম্মদ নাজমুল হক: বৈশ্বিক ব্যবস্থায় ভ‚-রাজনীতির চরম স্বার্থপরতা ও কর্তৃত্বের কাছে মানুষ, মানবতা ও মূল্যবোধ কীভাবে পদদলিত হয় তার এক করুণ চিত্র বিশ্ববাসী পুনরায় দেখলো কয়েকদিন আগে। একদিকে করোনার মৃত্যু মিছিল আরেক দিকে ইসরায়েলি বাহিনীর নৃশংস বর্বরতা। ইসরায়েলের যুদ্ধ বিমান, ট্যাঙ্ক আর আর্টিলার কামানের মুহুর্মুহু গোলার আঘাতে একের পর এক ধসে পড়ছিল ফিলিস্তিনির গাজা অঞ্চলের বড় বড় ভবন। ধ্বংস হয় অসংখ্য বাড়িঘর আর নৃশংসভাবে হত্যা করা হয় শত শত নিরীহ শিশু আর অসহায় নিরস্ত্র মানুষকে। চারিদেকে সন্তানহারা, স্বজনহার মানুষের বুকফাটা আর্তনাদ, কান্না আর আহাজারি। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, আসহায় ফিলিস্তিনিদের এই করুণ আর্তনাদ বিশ্ববাসীর কাছে নতুন নয়। বহু বছর ধরে এ আর্তনাদ শুনে আসছে বিশ্ববাসী।
১৯৪৮ সালে ফিলিস্তিন ভ‚-খন্ডে বলপূর্বক প্রতিষ্ঠা করা হয় জায়নবাদী বা উগ্র ইহুদিবাদী রাষ্ট্র ইসরাইল। আর প্রতিষ্ঠালগ্নে লাখ লাখ ফিলিস্তিনিকে তাঁদের পিতৃপুরুষের আবাসভ‚মি থেকে উচ্ছেদ ও বিতাড়ন করা হয় হামলা, হত্যা, ধর্ষণ ও লুটতরাজ চালিয়ে। এতে লাখ লাখ ফিলিস্তিনি উদ্বাস্তু ও শরণার্থী হয়ে পড়ে। ইসরাইল-ফিলিস্তিনের এই সংকট চলছে যুগ যুগ ধরে। শেষ হয়নি আজও।
ইহুদিদের সহযোগিতায় সব সময় পাশে ছিল ব্রিটিশ সরকার। ব্রিটিশদের সহায়তায় ১৯৩০-এর দশকে প্রায় ৬ লাখ ইহুদি প্রবেশ করে ফিলিস্তিনে। মূলত ইহুদি উপনিবেশ গড়ে তোলার অভিপ্রায়ে সহায়তার হাত বাড়ায় তারা। তখন ব্রিটিশ সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল ফিলিস্তিনের মাটিতে ইহুদিদের জন্য একটি আলাদা রাষ্ট্র গঠনে সহায়তা করবে। সে অনুযায়ী ইহুদিরা দলে দলে ফিলিস্তিনে আসে এবং জমি ক্রয় করতে থাকে। শুরুতে ফিলিস্তিনিদের সাথে সু-সম্পর্ক বজায় রেখে বসবাস করতে থাকে। এর আগে ১৯১৭ সাল থেকে ১৯৪৮ সাল পর্যন্ত ফিলিস্তিনের ভ‚মির নিয়ন্ত্রণ ছিল ব্রিটেনের হাতে। ১৯১৭ সালের নভেম্বর মাসে তুরস্কের সেনাদের হাতে থাকা জেরুজালেম দখল করে নেয় ব্রিটেন। ১৯৪৭ সালে জাতিসংঘে এক ভোটাভুটিতে ফিলিস্তিনিকে দুই টুকরা করে পৃথক ইহুদি ও আরব রাষ্ট্র গঠন করার কথা বলা হয়। ইহুদি নেতারা সে প্রস্তাব সাথে সাথে মেনে নেন, কিন্তু আরব নেতারা তা প্রত্যাখ্যান করেন।
জাতিসংঘের সে পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হয়নি। সে সময় ইসরায়েলে যেসব ফিলিস্তিনি বসবাস করে আসছিল তাদের উপর নেমে আসে সীমাহীন দূর্ভোগ। নিজ ভ‚মিতেই তারা হয়ে পড়ে সংখ্যালঘু। ১৯৪৮-এ ইসরায়েল আগ্রাসন চালিয়ে ফিলিস্তিনিদের তাড়িয়ে প্রায় সাড়ে সাত লাখ প্যালেস্টাইনবাসীর বসতবাড়ি, জায়গা-জমি দখল করে নেয়। এই দখলদারিত্ব আর হামলা-নির্যাতন চলছে যুগের পর যুগ ধরে। গোটা বিশ্ববাসী এ হামলা-নির্যাতনের প্রতিবাদ করলেও পশ্চিমা শক্তিগুলো বরাবরই প্রচ্ছন্ন সমর্থন যুগিয়েছে ইহুদিদের। জাতিসংঘের ভ‚মিকাও ব্যর্থ হয়েছে বারবার। পশ্চিমা পরাশক্তির সমর্থন, জাতিসংঘের ব্যর্থতা আর ইসরায়েলের একতরফা আগ্রাসন ও অবৈধ দখলদারিত্বের কারণে শত বছর ধরে চলে আসা এ সংকট সমাধানের পথ ক্রমশ রুদ্ধ হয়ে যাচ্ছে।
এবারের সংঘাতটা শুরু হয় আদালতের মাধ্যমে কয়েকটি ফিলিস্তিনি পরিবারকে উচ্ছেদের বিতর্কিত সিদ্ধান্ত নিয়ে। মে মাসের প্রথম সপ্তাহে, রমজানের শেষ দিকে ইসরায়েলের নি¤œ আদালত পূর্ব জেরুজালেমে বসবাসরত পাঁচটি ফিলিস্তিনি পরিবারকে উৎখাতের আদেশ জারি করে। এরপর পুলিশ জেরুজালেমে ফিলিস্তিনিদের ওপর কিছু বিধিনিষেধ আরোপ করলে পরিস্থিতি ঘোলাটে হয়ে ওঠে। এমতাবস্থায় আল-আকসা মসজিদে ইসরায়েলি পুলিশ অভিযান চালালে গাজা থেকে ইসরায়েলকে লক্ষ্য করে রকেট ছোড়ে হামাস। পরবর্তীতে গাজায় ইসরায়েল বিমান হামলা চালালে সংঘাত বিপজ্জনক রূপ নেয়। ইসরায়েলের চলমান এ হামলায় প্রায় ২০০ শিশু ও নারী পুুরুষ নিহত হয়েছে এবং এক লাখেরও বেশি ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুত হয়েছে। ১১ দিন ধরে চলা এ অসম যুদ্ধের আপাতত বিরতি ঘটেছে। কিন্তু অদূর ভবিষ্যতে আরও বড় সংঘাত ও ধ্বংসযজ্ঞ যে ঘটবে না, তার কোন নিশ্চয়তা নেই। কেননা আগের মতো এবারও ছিল ইসরায়েলের পক্ষ থেকে একতরফা যুদ্ধ। এভাবে শত বছর ধরে ফিলিস্তিনিরা চরমভাবে হতভাগ্য জীবন-যাপন করছে।
নিজেদের ভ‚-খন্ডে দখলদার ইহুদিদের দ্বারা নিপীড়ন-নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। জাতিসংঘসহ সব আর্ন্তজাতিক সম্প্রদায়কে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে অবৈধ দখলদারিত্ব চালিয়ে যাচ্ছে ইসরায়েল। সর্বহারা মানুষ প্রতিবাদ করলেই হত্যা-গুম ও ধর্ষণ-নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে। ইসরায়েলি বাহিনী একের পর এক নৃশংস হামলায় ফিলিস্তিনির অসংখ্য নিরীহ মানুষের রক্ত ঝরিয়েছে। ইসরায়েলি ইহুদিরা দানবের মূর্তি ধরে মানবতার সব চিহ্ন মুছে দিয়ে শুধু ফিলিস্তিনিদের ভ‚মি দখল করেনি, ওরা জীবন হননে মরিয়া। ওরা জাতিসংঘ মানে না। কোন মানবাধিকার সংস্থার রিপোর্ট আমলে নেয় না। আসলো চুক্তি, ক্যাম্প ডেভিড চুক্তির মতো কোন চুক্তিও মানে না। পশ্চিমা শক্তির সমর্থন আর পারমানবিক শক্তি থাকায় ওরা অস্ত্রের ভাষায় কথা বলে।
ফিলিস্তিনির অবিসংবাদিত নেতা ইয়াছির আরাফাত স্বাধীন প্যালেস্টাইনের জন্য আজীবন যুদ্ধ ও সংগ্রাম করে গেছেন। স্বপ্নের স্বাধীন ফিলিস্তিনি তিনি দেখে যেতে পারেননি। পরাশক্তির মদদ থাকায় মানুষ হত্যার মতো মানবাতাবিরোধী অপরাধ করার পরও ইসরায়েলকে থামানো যায়নি। বিশ্বনেতারা শান্তি রক্ষায় ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ন্যায়ানুগ কোন পদক্ষেপ নেননি। বিশ্ববাসী আরও দেখেছে মিয়ানমার কীভাবে শতাব্দী ধরে বসবাসরত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে বিতাড়ন করেছে। কীভাবে হত্যা-ধর্ষণ-নির্যাতন-নিপীড়ন চালানো হয়েছে। বিশ্বমানবতা ডুকরে কেঁদেছে।
লাখ লাখ রোহিঙ্গা প্রাণ বাঁচাতে বাংলাদেশে আশ্রায় নিয়েছে। তারও আজ অবধি কোন প্রতিকার হয়নি। মিয়ানমারও মানবতাবিরোধী অপরাধ করে জাতিসংঘসহ বিশ্বনেতাদের বৃদ্ধাঙ্গুলী দেখিয়েছে। বিশ্বমানবতা যদি বাববার এভাবে পরাজিত হয়, জাতিসংঘ যদি সর্বক্ষেত্রে তার যথাযথ ভ‚মিকা রাখতে ব্যর্থ হয়, তাহলে বিশ্বশান্তি ও বিশ্বমানবতা সুদূরপরাহত। আর বিশ্বশান্তি ও বিশ্বমানবতা রক্ষায় ব্যর্থ এমন রাষ্ট্রসংঘ বিশ্ববাসী আশা করে না।

আরও পড়ুন
মালায়েশিয়া সফর শেষে চীনের পথে প্রধানমন্ত্রী
৬ দিনের সফরে মালয়েশিয়া ও চীন যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী, রওনা হবেন রোববার
নিত্যপণ্যে কর কমানোর কথা বিরোধীদল বলছেনা, বিশেষ শ্রেণির স্বার্থই তাদের কাছে বড় – প্রধানমন্ত্রী