
রিকশাটা একটু আগে শাহাবাগ পার করলো। অথচ আমরা নামলাম না। কেননা ও আজকে কালো শাড়ী পরে এসেছে। আর কালো শাড়ী মানেই রমনা। ও হলো যেই মেয়েটি রিকসায় আমার হাতটাকে জড়িয়ে ধরে, আমার কাধে মাথা রেখে বসে আছে এই মেয়েটা৷ এর নাম হিমাদ্রিতা আমি ডাকি হিমাদ্রী বলে।
যাইহোক ওর সাথে আমার সম্পর্ক টা কি সেটা আমার পক্ষে বলা সম্ভব না। বলা যায় আমিও হয়তো জানি না৷ হুটহাট করে মেয়েটা আমাকে ডাকে আর আমি বাধ্য ছেলের মতো চলে আসি এটাই বোধহয় ওর আর আমার সম্পর্ক। যাইহোক ওর সাথে দেখা হলো প্রায় মাস তিনেক পরে৷ আগে প্রায়ই দেখা হতো। তবে এখন খুব একটা ডাক পরে না আমার।
মেয়েটা আমাকে দুটো কারনে ডাকে মন ভালোতে আর মন খারাপে৷ জীবনের অন্য কোন প্রয়োজন বা অন্যকোন আয়োজনেই আমাকে দরকার নেই তার। তাও নিজেকে কিছুটা ভাগ্যবান মনেহয় কেননা মেয়েটা ওর মন ভালো এবং খারাপের সময় অন্তত আমার সঙ্গ চায়।
ওর মন ভালো থাকলে নীল শাড়ী পরে বের হয়ে শাহাবাগে ঘুরে বেড়ায়। আমার কাজ হয় তাকে রিকশা করে শাহাবাগে নিয়ে এসে গাদা ফুলের মালা কিনে তার খোপায় পরিয়ে দেয়া। আর হাতে কয়েকটা গোলাপের সাথে হলুদ জারবেরার একটা গুচ্ছ ধরিয়ে দেয়া। এর পরে তার যা ইচ্ছে হয় করে আমি শুধু একজন দর্শক হয়ে সেসব দেখি। নানান রকম কান্ডকারখানা করে -কোনদিন ফুসকা খায়, কোনদিন আইস্ক্রিম। কখনো শিশুপার্কে যায়, আর কখনো বা আজিজ সুপারে।
অন্যদিকে মন খারাপে ওর পরনে থাকে কালো শাড়ী আর আমাদের গন্তব্য হয় রমনা। আজকেও তাই। আমরা রমনায় যাচ্ছি। রমনায় গিয়ে আমরা কৃষ্ণচূড়া গাছের নিচে একটা বেঞ্চে বসবো। তারপর হিমাদ্রী ওর ব্যাগ থেকে একটা ডায়রী বের করে লেখা শুরু করবে। যদিও কি লেখে সেটা আমিও জানি না। আমার দেখা বারণ। তবে আমার ধারণা মেয়েটা তার দুঃখগুলো লিখে রাখে। এইরকম হাসিমাখা, মায়াবী একটা মেয়ের দুঃখ আছে সেটাই মেনে নিতে পারি না৷ আমার মনে হতো এই মেয়েটা শুধু মাত্র হাসবে বলেই জন্মেছে।
কিন্তু সৃষ্টিকর্তা সকল কিছুর প্লান তার মতই সাজিয়েছে। তবে একটা আশ্চর্যজনক ঘটনা হলো আমরা যতদিন রমনায় এসেছি তার বেশিবারেই বৃষ্টি হয়েছে বা আকাশ মেঘলা ছিলো। আমার বিশ্বাস এই নিষ্পাপ মেয়ের দুঃখ বা মন খারাপ প্রকৃতিরও মন খারাপ করে দেয়। আজকেও আকাশ বেশ মেঘলা, বৃষ্টিও হতে পারে। যাইহোক রমনায় আমার কিছু কাজ থাকে তা হলো ঝালমুড়িওয়ালা আর বাদামওয়ালা খুজে বের করা। সেখান থেকে ঝালমুড়ি এবং বাদাম নিয়ে এসে হিমাদ্রীকে খাইয়ে দেয়া। আমি এইকাজটা বেশ আগ্রহ নিয়েই করে থাকি কিন্তু কেন সেটা বলা বাহুল্য।
হিমাদ্রী বেঞ্চিতে বসে ডায়েরি লিখছে আমি আসেপাশে তাকিয়ে দেখলাম কোন বাদামওয়ালা আছে কিনা। বেশ দূরে একজনকে দেখে আমি বাদাম আনতে গেলাম। বাদাম নিয়ে ফিরবো এমন সময়েই নামলো বৃষ্টি । হিমাদ্রী ভিজে যাবে তাই আমি দৌড়ে যাচ্ছি হঠাৎ আমার চোখ পরলো হিমাদ্রীর উপর, পা দুটো স্থির হয়ে গেলো ।
দেখলাম ও ডায়রিটা বন্ধ করে ব্যাগে রেখে ইচ্ছে করেই ভিজছে। আকাশ সমেত কেশগুচ্ছ জলে একাকার হয়ে যাচ্ছে। গাল বেয়ে পানি ঝরছে। হঠাৎ আকাশের দিকে তাকিয়ে চুলে ঝাকুনি দিলো। এতে ভেজা চুলগুলো কতটুকু নড়লো আমি জানি না তবে আমার হৃদপিন্ডটা নড়ে উঠেছে সেটা খুব করে টের পেলাম। আমি জানি এই দৃশ্য পৃথিবীর সেরা দৃশ্যগুলোর মধ্যে অন্যতম। তবে এই দৃশ্যের দর্শক বাড়াতে চাই না তাই বলা হয়ে ওঠে না।
হিমাদ্রীর কাছে যেতে যেতে বৃষ্টি অনেকটাই কমে গেল। আমরা হেটে টি এস সি তে গিয়ে একটা টং দোকানের ছাউনিতে দাড়ালাম। হিমাদ্রী হাত বাড়ালো আমি বরবরের মতই পকেট থেকে রুমালটা হাতে দিলাম। চুল মুছে রুমালটা ফেরত দিলো আমি চুল সমেত ভেজা রুমালখানা সযত্নে পাঞ্জাবির পকেটে রাখলাম। এইটা চার নম্বর রুমাল হিসেবে আলমারিতে যায়গা পাবে। এর ব্যবহারের সময়সীমা কিছুক্ষন আগেই শেষ হলো।
আমাদের আজকের কর্মসূচি প্রায় শেষ। চা খেয়ে বেড়িয়ে পরলাম আমরা। ওকে বাসায় পৌছে দিলেই আমার কাজ শেষ। রিকশা ধানমন্ডি দিকে এগোচ্ছে আর আমি আমার কাধে মাথা রেখে কাচুমাচু হয়ে বসে থাকা মেয়েটির মুখের দিকে তাকিয়ে আছি। পুরো চেহারাখানিই মায়ায় বাধানো। সেই মায়ায় আটকা পরেছে আমার চোখদুটো। জানিনা আবার কবে দেখতে পাবো এই চাহনি। তাই যতটুকু সম্ভব হৃদয়ে এঁকে যাচ্ছি তার রূপরেখা।
#আতিকুর রহমান

আরও পড়ুন
ঠাকুরগাঁওয়ে প্রতারক চক্রের দুই সদস্য ভাই-বোন গ্রেপ্তার, উদ্ধার স্বর্ণসদৃশ সামগ্রী
জামালপুরে যথাযোগ্য মর্যাদায় ‘জুলাই শহীদ দিবস’ পালিত
একটি ড্রেন বন্ধ, জলাবদ্ধতায় বিপর্যস্ত জামালপুর সদরের ৫ গ্রাম