হোম » প্রধান সংবাদ » অস্তিত্বহীন জাতীয় পার্টি

অস্তিত্বহীন জাতীয় পার্টি

রিয়াজুল ইসলাম: বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বিগত সরকার তথা ফ্যাসিবাদ সরকারের আমলে ‘বিরোধী দল’ হিসেবে পরিচিত হলেও জাতীয় পার্টি বাস্তবে কতটা স্বাধীন বা জনগণের স্বার্থ রক্ষায় ভূমিকা রাখছে তা নিয়ে এখন বড় ধরনের প্রশ্ন উঠেছে। বারবার ভাঙনের মুখে পরেছে দলটি। রাজনৈতি অঙ্গনে ইতোমধ্যে তাদের অস্তিত্ব বিলীন হয়ে পরেছে। এমতাবস্থায় গত ৭ জুলাই দলীয় শৃঙ্খলা ভাঙ্গার অভিযোগ এনে পার্টির চেয়ারম্যান জিএম কাদের মহাসচিব মুজিবুল হক চুন্নু, সিনিয়র কো-চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ ও কো-চেয়ারম্যান এ.বি.এম. রুহুল আমিন হাওলাদারকে বহিষ্কার করে

বহিষ্কারের নাটক: লোক দেখানো শুদ্ধি অভিযান
জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জিএম কাদের সম্প্রতি দলের কিছু নেতা-কর্মীকে বহিষ্কারের ঘোষণা দিয়েছেন। তারা ‘শৃঙ্খলাভঙ্গ’, ‘স্বার্থান্বেষী কর্মকাণ্ড’ ও ‘দলবিরোধী তৎপরতায়’ লিপ্ত ছিলেন বলে দলটি দাবী করেন। এক কথায় শাক দিয়ে মাছ ঢাকতে চাইছেন তিনি।
২০০৮ সালের নির্বাচন থেকে শুরু করে ২০১৪ ও ২০১৮ সালের নির্বাচন পর্যন্ত জাতীয় পার্টি কার্যত আওয়ামী লীগের অংশীদার ছিল। তারা সংসদে ‘বিরোধী দল’ হয়েও মন্ত্রীসভায় ছিলেন, ফ্যাসীবাদ সরকারের কোনো বড় নীতির বিরুদ্ধে আন্দোলন বা প্রতিবাদে নামেনি। অথচ অবৈধ সরকারের প্রতিটি কাজে সমর্থন জানিয়েছিলেন জাতীয় পার্টি। গত ৫ই আগষ্টে সরকার পতনের পর তারা বিপাকে পরে যায়। জণগনের রোষাণলে পরেন। এর পর থেকে রাজধানীর বিজয়নগরে জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে হামলা, ভাঙচুর ও আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটে। এরপর ধারাবাহিকভাবে আ.লীগের দোসর আখ্যা দিয়ে দেশের বিভিন্ন বিভাগীয় ও জেলা কার্যালয় গুড়িয়ে দেয় আপামর জনতা।
জাতীয় পার্টি ভাঙ্গা-গড়ার ইতিহাস
এ পর্যন্ত জাতীয় পার্টিতে মোট ছয়বার ভাঙনের সৃষ্টি হয়েছে।
১. এরশাদের আওয়ামী লীগ সমর্থন জলন্ত; মঞ্জু দল ছেড়ে আলাদা “জাতীয় পার্টি (জেপি)” গঠন করার জেরে ১৯৯৬ সালের (সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রাক্কালে) আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর দল ভেঙ্গে জাতীয় পার্টি (জেপি) গঠন করেন।
২. ১৯৯৯–২০০১ এ নাজিউর রহমান মঞ্জু ও এম এ মতিন আলাদা “বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (বিজেপি)” গঠন করেন এই ভিন্ন গোষ্ঠী পরে আবার এম এ মতিনের নেতৃত্বে ভেঙে পৃথক “বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (এমএ মতিন)” গঠন হয়
৩. ১৯৯৭–১৯৯৮ এ পার্টির একাধিক শীর্ষ নেতার মধ্যে মতবিরোধের ফলে কাজী জাফর আহমেদ–মোহাম্মদ শাহ মোয়াজ্জেম ভিন্ন গোষ্ঠী গঠন করেন
৪. ২০০৩ এ বিজেপির ভেতরে বিভাজন ঘটে; মতিন ভিত্তিক অংশ “বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (মতিন)” নামে পুনর্গঠিত হয়
৫. ২০১৩ এর ২০ ডিসেম্বর কাজী জাফর আহমেদ প্রেসক্লাবে কাউন্সিলে জাতীয় পার্টির বর্তমান নেতৃত্বকে বহিষ্কার ঘোষণা করে নতুন গঠন করেন “জাতীয় পার্টি (কাজী জাফর)” গোষণা করেন।
৬. রাষ্ট্রনায়ক এরশাদের মৃত্যু (২০১৯–২০এর দিকে) ও তাঁর স্ত্রী বিদিশা ও ভাই জিএম কাদের–এর মধ্যে দ্বন্দ্ব প্রকট হয়। রওশন এরশাদ ও অনুসারীরা নিজেদের কাউন্সিল করে নতুন কমিটি ঘোষণা করেন—এর ফলে মূল দলের দুই শাখায় বিভক্তি দেখা দেয়। ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারি–২৮ জানুয়ারি ও একই বছরেরে মার্চ মাসে দলটি ভাঙনের সৃষ্টি হয়।
তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ, এই বহিষ্কার আসলে রাজনৈতিক নাটক। বাস্তবে এরা ছিলেন নিষ্ক্রিীয়, প্রান্তিক বা দলের অভ্যন্তরে প্রভাবহীন ব্যক্তিত্ব। মূল দুর্নীতিবাজ, সুবিধাবাদী, ক্ষমতানির্ভর নেতাদের বিপক্ষে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম-মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন,“জাতীয় পার্টি হলো আওয়ামী লীগেরই একটা রাজনৈতিক ‘এক্সটেনশন’। তারা সংসদে বিরোধী দলের নাম ব্যবহার করে সরকারকে সুবিধা দেয়। এখন জনগণের চাপ ও বিরোধী দলগুলোর গণআন্দোলনের ভয়ে তারা লোক দেখানোভাবে কিছু নেতাকে শাস্তি দিচ্ছে—এটা একটা রাজনৈতিক নাটক ছাড়া কিছু নয়।”

জাতীয় পার্টি গৃহপালিত দল
জাতীয় পার্টি একটি গৃহপালিত দল এটা তিনি নিজেই স্বীকার করে নিয়েছেন। শনিবার (২৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৪ইং) দুপুরে নিজের জন্মদিন উপলক্ষে রাজধানীর বনানীতে দলীয় কার্যালয়ে শুভেচ্ছা বিনিময় অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।
‘জাতীয় পার্টি নব্বইয়ের পরে আস্তে আস্তে দুর্বল হয়ে গেছে। ক্ষমতা থেকে সরে আসার পর পরজবীবী ছিলো। তবে এখন সেটাও সম্পূর্ণভাবে হারিয়ে ফেলেছি। এখন হয়েছি গৃহপালিত রাজনৈতিক দল। এটা বাস্তবতা। এটা করা হয়েছে, সরকারি দল থেকে। দলের ভেতরে সরকারের এজেন্ট ঢুকিয়ে এটা করা হয়েছে।’ নেতাকর্মীদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, ‘দলকে যদি বাঁচাতে হয়, তাহলে গৃহপালিত থেকে বেরিয়ে আসেন। দরকার হলে পরজীবী থাকব। পরজীবী থেকে আমরা স্বনির্ভর হবো।’

রাজনৈতিক উদ্দেশ্য: জনমানস বিভ্রান্ত করা
বিশ্লেষকরা বলছেন, বর্তমান সময়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে রাজনৈতিক হতাশা, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি, দুর্নীতি, বিচারহীনতা, ও কর্তৃত্ববাদী শাসন নিয়ে চরম অসন্তোষ বিরাজ করছে। সরকার বিরোধী মনোভাব বাড়ছে। এই প্রেক্ষাপটে জাতীয় পার্টি কিছু নেতাকে ‘বলির পাঁঠা’ বানিয়ে সাধারণ মানুষকে দেখাতে চাইছে তারা নাকি আত্মশুদ্ধির পথে।

অধ্যাপক ড. নাসির উদ্দিন বলেন,“এটা একটি ক্লাসিক্যাল বিভ্রান্তিকর কৌশল। যখন জনগণের ভেতরে বিরুদ্ধমত জোরালো হয়, তখন ছদ্ম-বিরোধী শক্তি কিছু ‘সিম্বলিক অ্যাকশন’ নেয়—যেমন বহিষ্কার, দুঃখ প্রকাশ বা অনুশোচনা। বাস্তবে মূল ক্ষমতাধর দুর্নীতিবাজরা রয়ে যায় অক্ষত।”
তিনি আরও বলেন,“জাতীয় পার্টি এই মুহূর্তে সরকারের দোসর হিসেবে কাজ করছে, মূল বিরোধী শক্তিকে দুর্বল করতে এবং সংসদে সরকারের নীতিগুলোর জন্য কার্যত পক্ষে বক্তব্য দিতে। এদের বহিষ্কার কৌশল এক ধরনের রাজনৈতিক মেকআপ মাত্র।”

জাতীয় পার্টির অতীত ও বর্তমান ভূমিকায় সাদৃশ্য
১৯৮০-এর দশকে সামরিক শাসনের মাধ্যমে গঠিত জাতীয় পার্টি আজও স্বতন্ত্র রাজনৈতিক চিন্তাধারার বিকাশ ঘটাতে পারেনি। বরং প্রতিটি নির্বাচন ও ক্ষমতার পালাবদলে দলটি কোনো না কোনোভাবে ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে আপস করে টিকে থাকার কৌশল গ্রহণ করেছে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, “জাতীয় পার্টি আসলে গণতন্ত্রের নামে একটি পর্দার রাজনৈতিক নাটক তৈরি করে রাখে। সরকার চায় সংসদে যেন একটি ‘সাজানো বিরোধী দল’ থাকে, যারা ক্ষমতাসীনদের কঠোর সমালোচনা না করে নামমাত্র বিরোধিতা করে। সেই ভূমিকা পালনেই তারা এখনো সক্রিয়।”

জনগণের মধ্যে আস্থাহীনতা
সাম্প্রতিক জনমত জরিপে দেখা গেছে, তরুণ ভোটার, পেশাজীবী, শ্রমজীবী ও মধ্যবিত্ত শ্রেণীর জনগণ জাতীয় পার্টির ওপর ক্রমাগত আস্থা হারাচ্ছে। দলটি নিজস্ব কোনো আদর্শ, অবস্থান বা সংগ্রামী চরিত্র তুলে ধরতে পারছে না। তাদের নেতারা বারবার ক্ষমতাসীনদের সুবিধাভোগী হয়ে উঠেছেন বলে অভিযোগ।

ঢাকার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র নেতা বলেন, “জাতীয় পার্টিকে বিরোধী দল বলা হয়, কিন্তু তারা তো সরকারের প্রোগ্রামে দাঁড়িয়ে হাততালি দেয়। এই বহিষ্কারের নামে যে নাটক হচ্ছে, সেটা দেখে মানুষ এখন হাসে। এটা শুদ্ধি নয় এটা রাজনৈতিক মেকআপ।”
এ ব্যাপারে গত ১১ জুন বুধবার রংপুরের পীরগাছায় উপজেলা কার্যালয় উদ্বোধন শেষে জাতীয় নাগরিক পার্টির সদস্য সচিব আখতার হোসেন বলেন, জাতীয় পার্টি বিগত সময়ে আওয়ামী লীগের দালাল হিসেবে ভূমিকা পালন করেছে। আওয়ামী লীগ মানুষের ভোটাধিকার হরণ করে যে ফ্যাসিবাদ কায়েম করেছিল, যে স্বৈরতন্ত্র কায়েম করেছিল, তার প্রধানতম রাজনৈতিক সহযোগী ছিল জাতীয় পার্টি। বাংলাদেশে যে ভোট ডাকাতির নির্বাচনগুলো হয়েছে, একপাক্ষিক নির্বাচনগুলো হয়েছে তার প্রত্যেকটাকে বৈধতা দেওয়ার নাটক করেছিল জাতীয় পার্টি।

জাতীয় পার্টির সাম্প্রতিক বহিষ্কার কার্যক্রমকে কেন্দ্র করে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে উঠছে এটা কোনো নীতিগত বা নৈতিক শুদ্ধি অভিযান নয়, বরং একটি রাজনৈতিক পরিকল্পনার অংশ। ক্ষমতাসীনদের স্বার্থ রক্ষায় ‘ছদ্ম বিরোধী দল’ হিসেবে ভূমিকা রাখা জাতীয় পার্টির এই নাটকীয় বহিষ্কারের উদ্দেশ্য—জনগণকে বিভ্রান্ত করা, আসল সংকট থেকে মনোযোগ সরিয়ে নেওয়া এবং নিজেদের ‘স্বচ্ছ’ বলে প্রমাণের কৃত্রিম প্রচেষ্টা।

দলটিকে জণগনের এত অপবাদ, লাঞ্চনার পরেও তারা নিজেদেরকে একটি শক্তিশালী দল হিসেবে আখ্যা দিয়ে বর্তমানে অর্ন্তবর্তীকালীন সরকারের মাননীয় প্রধান উপদেষ্টা নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবীদ ড. মোহাম্মদ ইউনূসকে সহযোগিতা না করে উল্টো তার সমালোচনা করে আসছেন।
নির্বাচনে যাওয়ার ঘোষণা জাপার
৫ই আগষ্ট সরকার পতনের পর দলটির নেতারা একঘরে হয়ে পরেন। এমতাবস্থায় অর্ন্তবর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস সব দলকে ডেকে বৈঠক করার ঘোষণা দেন। তখনই জাতীয় পার্টিকে ইস্যু করে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে রাজনৈতিক মাঠ। সরকার পতন আন্দলনে নেতৃত্ব দেয়া সার্জিস-হাসনাত (বর্তমান এনসিপি) ও জামায়াতসহ আরো কয়েকটি দলের বিরোধিতায় জাতীয় পার্টিকে ঐ বৈঠকে সব দলকে আমন্ত্রণ করলেও আ.লীগের দোসর জাতীয় পার্টিকে আমন্ত্রণ জানায়নি ড. মোহাম্মদ ইউনূস। এরপর বিভিন্ন সময় সরকারের সমালোচনা করে যাচ্ছেন জাতীয় পার্টির নেতাকর্মীরা। এমতাবস্থায় তারা আগামী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যাবে বলে ঘোষণা দিয়েছেন।
২০২৪ইং এর মঙ্গলবার (১৭ ডিসেম্বর) দুপুরে দলের চেয়ারম্যানের কার্যালয়ে বিজয় দিবসের আলোচনা সভায় জিএম কাদের বলেন, আগামী জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে জাতীয় পার্টি। তবে তার আগে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত, ভুয়া মামলা প্রত্যাহার, সভা-সমাবেশের অধিকারসহ নির্বাচনী পরিবেশ নিশ্চিত চান তারা।
অন্যদিকে জাপার নবনিযুক্ত মহাসচিব শামীম পাটোয়ারী বুধবার (৯ জুলাই) জাতীয় এক দৈনিকে সাক্ষাৎকারে বলেন, দেশে চলমান ‘মব সন্ত্রাস’ না থাকলে, আর সব দলের জন্য লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত হলে জাতীয় পার্টি (জাপা) আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেওয়ার কথা চিন্তা করবে। কিন্তু জাতীয় পার্টিকে আ.লীগের দোসর অভিহিত করে নির্বাচনে অংশ নিতে দিবেনা বলে অনঢ় জামায়াত-এনসিপি।

শেয়ার করুন আপনার পছন্দের সোশ্যাল মিডিয়ায়
error: Content is protected !!