
আওয়াজ অনলাইনঃ সম্প্রতি রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংক পিএলসি-তে নতুনভাবে অনুমোদিত প্রমোশন নীতিমালা ঘিরে ব্যাংক পাড়ায় তৈরি হয়েছে উত্তেজনা ও গভীর প্রশ্ন। কর্মীদের ক্যারিয়ার অগ্রগতির অন্যতম সূচক হওয়ায় এই পরিবর্তনটি শুধু অভ্যন্তরীণ নয়, বরং গোটা ব্যাংকিং খাতের নীতিগত স্বচ্ছতা ও সাম্য ধারণাকে প্রভাবিত করছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
কী পরিবর্তন এসেছে এই নীতিমালায় জানতে চাইলে এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ) ‘ব্যাংকের বোর্ড কর্তৃক গোপনে অনুমোদিত এই নীতিমালায় পূর্বের মূল্যায়ন কাঠামোর বহু গুরুত্বপূর্ণ উপাদান বাদ দেওয়া হয়েছে। যেমন: দুর্গম এলাকায় কাজের অভিজ্ঞতা, ম্যানেজারিয়াল দক্ষতা, সংশ্লিষ্ট পদে চাকরিকাল, এসব বাদ দিয়ে শুধুমাত্র “চাকরিতে যোগদানের তারিখ থেকে মোট সময়কাল”-কে মূল সূচক হিসেবে মূল্যায়ন করা হচ্ছে, যা বাংলাদেশে প্রচলিত ব্যাংকিং মূল্যায়ন চর্চার বিপরীত।
গ্রেড বৈষম্য ও মূল্যায়নের অসাম্য, এই কাঠামোতে ১০ম গ্রেডে ‘অফিসার’ হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদেরকে অনেক ক্ষেত্রেই ৯ম গ্রেডে ‘সিনিয়র অফিসার’ হিসেবে সরাসরি নিয়োগপ্রাপ্তদের চেয়ে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। অথচ গ্রেড ভেদে নিয়োগ প্রক্রিয়া, দায়িত্ব ও মূল্যায়নের দৃষ্টিভঙ্গি এক নয়।
তিনি বলেন, “একজন সিনিয়র অফিসার হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত যদি একজন জুনিয়র অফিসারের পরে প্রমোশন পান, তা হলে গ্রেডভিত্তিক কাঠামোর মানেই থাকে না,”— মন্তব্য করেছেন ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা।
কারা পাচ্ছেন এই সুবিধা জানতে চাইলে তিনি বলেন, অভ্যন্তরীণ সূত্রগুলো দাবি করছে, এই নীতিগত পরিবর্তনের মূল সুবিধাভোগী হচ্ছেন ২০০৮-২০১৩ সময়কালে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের প্রভাবে ও রাজনৈতিক সুপারিশে নিয়োগপ্রাপ্ত ১০ম গ্রেডের কর্মকর্তারা, যাদের নিয়োগ ঘিরে তখন থেকেই ছিল অনিয়ম ও বিতর্ক। নাম এসেছে একজন পৃষ্ঠপোষকের, যিনি বিগত সরকারের ঘনিষ্ঠ এবং ওই সময় ব্যাংকটির নীতিনির্ধারণী কাজে সম্পৃক্ত ছিলেন।
তিনি আরো বলেন, ব্যাংকটির কয়েক হাজার কর্মকর্তা মনে করছেন, এই ধরনের পক্ষপাতমূলক মূল্যায়ন নীতিমালা:
১. কর্মীদের মধ্যে বিভাজন তৈরি করবে ২. চাকরির প্রতি আস্থাহীনতা বাড়াবে ৩. দক্ষতা ও নৈতিকতাবোধকে চরমভাবে আঘাত করবে
বিশেষ করে, বর্তমানে যারা ৯ম গ্রেডে মেধাভিত্তিক নিয়োগ পেয়ে ব্যাংকের উন্নয়ন ও সংস্কারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন, তারা আকস্মিকভাবে প্রমোশন দৌড়ে পিছিয়ে পড়ায় হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়ছেন।
এ ব্যাপারে ব্যাংকিং বিশ্লেষক জহিরুল ইসলাম বলেন, “মূল্যায়ন নীতিমালা পরিবর্তন করতেই পারেন, কিন্তু তা হতে হবে স্বচ্ছতা, যৌক্তিকতা ও সাম্যের ভিত্তিতে। এক ব্যাচকে বাড়তি সুবিধা দিয়ে অন্যদের বঞ্চিত করা হলে সেটি প্রতিষ্ঠানিক অবিচার করা হবে বলে মনে করেন ।”
তিনি মনে করেন, বিষয়টি এখন বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাংলাদেশ ব্যাংকের নজরে আনা জরুরি, কারণ এ ধরনের সিদ্ধান্ত শুধু জনতা ব্যাংক নয়, সমগ্র রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকিং ব্যবস্থার মধ্যে অনৈতিক সংস্কৃতির ইঙ্গিত দেয়।
প্রয়োজনে এই নীতিমালার কার্যকারিতা স্থগিত রেখে পর্যালোচনা, জনমত গ্রহণ ও কমিশন গঠন করে স্বচ্ছতার ভিত্তিতে পুনর্গঠন করা উচিত।
ব্যাংকিং খাতের আস্থা ও স্থিতিশীলতা রক্ষায় মূল্যায়ন কাঠামোতে গোপন পক্ষপাত, বিতর্কিত সুবিধা প্রদান ও স্বচ্ছতার অভাব—এমন সিদ্ধান্তের অবিলম্বে নিরপেক্ষ পুনর্বিবেচনা জরুরি। নাহলে তা কেবল হাজারো কর্মকর্তার অধিকার হরণই নয়, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর বিশ্বাসযোগ্যতাও ধ্বংস করতে পারে।

আরও পড়ুন
বুধবার ‘ব্যাংক হলিডে’, লেনদেন বন্ধ
মালায়েশিয়া সফর শেষে চীনের পথে প্রধানমন্ত্রী
অফিসার্স ক্লাবে রূপালী ব্যাংকের এটিএম বুথ উদ্বোধন