
রবিউল হাসান লায়ন , জামালপুর
সব সহপাঠীর হাতে প্রবেশপত্র (অ্যাডমিট কার্ড), সবার চোখে পরীক্ষা দেওয়ার আনন্দ। শুধু নেই রিক্তার হাতে। সবার আগে ফরম পূরণের টাকা জমা দিয়েও শেষ মুহূর্তে জানতে পারলেন—তার ফরম পূরণই করা হয়নি! স্নাতক চূড়ান্ত পরীক্ষার প্রথম দিনেই পরীক্ষা দিতে না পেরে কলেজ প্রাঙ্গণেই কান্নায় ভেঙে পড়লেন হতভাগ্য শিক্ষার্থী রিক্তা আক্তার ও তার শারীরিক প্রতিবন্ধী বাবা।
রবিবার (১৯ জুলাই) জামালপুর সদরের তুলশীপুর ডিগ্রি কলেজে ঘটেছে এই চরম অমানবিক ও হৃদয়বিদারক ঘটনা। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে স্নাতক তৃতীয় বর্ষের চূড়ান্ত পরীক্ষা শুরু হলেও, কলেজ কর্তৃপক্ষের চরম গাফিলতিতে একটি বছর হারিয়ে গেল এই স্বপ্নজয়ী তরুণীর জীবন থেকে।
টাকা দিয়েও স্বপ্নভঙ্গ: কী ঘটেছিল সেই দুর্ভাগা সকালে?
ভুক্তভোগী রিক্তা আক্তার তুলশীপুর ডিগ্রি কলেজের মানবিক বিভাগের ইসলামের ইতিহাস বিষয়ের ছাত্রী। রবিবার তার ‘ইসলামের ইতিহাস ৫ম পত্র’ পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার কথা ছিল।
পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, কলেজ কর্তৃপক্ষ ফরম পূরণের জন্য সাড়ে ৫ হাজার টাকা নির্ধারণ করেছিল। কিন্তু রিক্তার পরিবারে নুন আনতে পান্তা ফুরায়। বাবা ও এক বোন দুজনেই শারীরিক প্রতিবন্ধী। ভাঙা সংসার আর অভাবের সংসারে রিক্তার পড়াশোনার খরচ চালানোই ছিল যুদ্ধ। প্রতিবন্ধী বাবা হেলাল উদ্দিন অনেক কষ্টে মেয়ের স্বপ্ন পূরণের জন্য ৩ হাজার টাকা জোগাড় করে দেন।
নির্ধারিত সময়ের শুরুতেই রিক্তা সেই ৩ হাজার টাকা কলেজে জমা দিয়ে বাকি টাকা পরে দেওয়ার অনুরোধ জানান। কলেজ কর্তৃপক্ষও মানবিক দিক বিবেচনা করে সেই টাকায় ফরম পূরণের আশ্বাস দিয়েছিল।
ভুল আশ্বাস ও নির্মম বাস্তবতা:
পরীক্ষার আগের দিন পর্যন্ত রিক্তাকে বলা হয়েছিল, পরীক্ষার দিন সকালে কলেজ থেকে প্রবেশপত্র সংগ্রহ করতে। সেই বিশ্বাস বুকে নিয়ে রবিবার সকালে কলেজে আসেন রিক্তা। কিন্তু পরীক্ষা শুরুর ঠিক আগ মুহূর্তে তাকে জানিয়ে দেওয়া হয়—তার ফরম পূরণই করা হয়নি, তাই কোনো প্রবেশপত্র আসেনি!
বাবা-মেয়ের কান্নায় ভারী বাতাস
পরীক্ষা দিতে না পারার খবর শুনে কলেজের বারান্দায় উপুড় হয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন রিক্তা। মেয়ের এই অবস্থা দেখে চোখের জল ধরে রাখতে পারেননি তার প্রতিবন্ধী বাবাও।
অশ্রুসিক্ত চোখে রিক্তা আক্তার বলেন, “আমার বাবাও প্রতিবন্ধী, এক বোনও প্রতিবন্ধী। বাবা অনেক কষ্ট করে আমাকে ৩ হাজার টাকা দিয়েছিল। আমি সবার আগে কলেজে টাকা জমা দিয়েছিলাম। কিন্তু আজ আমি পরীক্ষা দিতে পারছি না। আমার জীবনটা কেন এভাবে নষ্ট করা হলো? আমি এখন কী করব?”
মেয়ের স্বপ্ন এভাবে ভেঙে যেতে দেখে নির্বাক বাবা হেলাল উদ্দিন বলেন, “আমি গরিব মানুষ, প্রতিবন্ধী। অনেক কষ্টে টাকা জোগাড় করে দিয়েছিলাম যাতে মেয়েটা পরীক্ষা দিতে পারে। কিন্তু কলেজের ভুলের জন্য আমার মেয়েটার একটা বছর নষ্ট হয়ে গেল। আমি এর বিচার চাই।”
দায় এড়ালেন অধ্যক্ষ, তদন্তের আশ্বাস প্রশাসনের
এমন সংবেদনশীল ও অমানবিক বিষয়ে তুলশীপুর ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ জাহাঙ্গীর আলম লিচুর সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় দায় এড়ানোর চেষ্টা করেন। তিনি বলেন, “তার ফরম পূরণ করা হয়নি, তাই প্রবেশপত্র আসেনি। এই মুহূর্তে আর আমাদের কিছু করার নেই। তাকে আগামী বছর পরীক্ষায় অংশ নিতে হবে।”
টাকা নেওয়ার পরও কেন ফরম পূরণ হলো না—এই প্রশ্নের কোনো সদুত্তর কলেজ প্রশাসনের কাছ থেকে পাওয়া যায়নি।
তবে বিষয়টি প্রশাসনের নজরে এলে তীব্র ক্ষোভ ও চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। এ বিষয়ে জানতে চাইলে শিক্ষা ও আইসিটি বিভাগের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক আফসানা তাসলিম জানান, “বিষয়টি অত্যন্ত দুঃখজনক। আমরা দ্রুত এই ঘটনার খোঁজখবর নিয়ে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করব।”
সবার আগে টাকা জমা দিয়েও কলেজ কর্তৃপক্ষের চরম উদাসীনতায় একজন প্রতিবন্ধী বাবার মেয়ের স্বপ্ন এভাবে মাঝপথে থমকে যাওয়ায় ফুঁসে উঠেছে স্থানীয় এলাকাবাসী ও সাধারণ শিক্ষার্থীরা। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও এই ঘটনা নিয়ে তীব্র নিন্দার ঝড় বইছে। ভুক্তভোগী পরিবারটি এখন প্রশাসনের কঠোর হস্তক্ষেপ ও ন্যায়বিচারের আশায় প্রহর গুনছে।

আরও পড়ুন
বগুড়া সদরের ১নং ফাঁপোর ইউনিয়নে চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী কামাল হোসেনের মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত
সরিষাবাড়ীতে পানিতে ডুবে শিশুর মৃত্যু
ঘুষ বাণিজ্যসহ বিস্তর অনিয়মের অভিযোগ প্রতিষ্ঠান প্রধাণ হুরার বিরুদ্ধে, মানছেনা মন্ত্রনালয়ের নির্দেশনাও