হোম » সারাদেশ » বিজয় দিবস : ইতিহাস, অবদান ও রাষ্ট্রগঠনের শিক্ষা | শাহজাহান সিরাজ সবুজ |

বিজয় দিবস : ইতিহাস, অবদান ও রাষ্ট্রগঠনের শিক্ষা | শাহজাহান সিরাজ সবুজ |

১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি তাৎপর্যপূর্ণ দিন। ১৯৭১ সালের এই দিনে নয় মাসব্যাপী মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে তৎকালীন পাকিস্তানি শাসনের অবসান ঘটে এবং বাংলাদেশ একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। এই বিজয় ছিল দীর্ঘ রাজনৈতিক আন্দোলন, গণঅভ্যুত্থান এবং সশস্ত্র প্রতিরোধের সম্মিলিত ফল।
স্বাধীনতা আন্দোলনের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট গড়ে ওঠে ভাষা আন্দোলন, ছয় দফা কর্মসূচি ও ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনের ধারাবাহিকতায়। এ সময় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পূর্ব বাংলার জনগণের স্বাধিকার আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন। তাঁর নেতৃত্ব আন্দোলনকে সংগঠিত করে এবং মুক্তিযুদ্ধের জন্য গণভিত্তি তৈরি করে।
মুক্তিযুদ্ধের সামরিক কাঠামো গড়ে ওঠে মুক্তিবাহিনীর মাধ্যমে। এর সর্বাধিনায়ক ছিলেন বঙ্গবীর জেনারেল এম এ জি ওসমানী। তাঁর নেতৃত্বে যুদ্ধ পরিচালনার সুবিধার্থে দেশকে ১১টি সেক্টরে ভাগ করা হয়। এই কাঠামোর ফলে যুদ্ধ একটি সমন্বিত ও কার্যকর রূপ লাভ করে।
১১টি সেক্টরের প্রতিটিতে দায়িত্বপ্রাপ্ত সেক্টর কমান্ডাররা স্থানীয় বাস্তবতা ও সামরিক কৌশল অনুযায়ী যুদ্ধ পরিচালনা করেন। তাঁরা হলেন— মেজর জিয়াউর রহমান (সেক্টর ১), মেজর খালেদ মোশাররফ (সেক্টর ২), মেজর কে এম শফিউল্লাহ (সেক্টর ৩), মেজর চিত্তরঞ্জন দত্ত (সেক্টর ৪), মেজর মীর শওকত আলী (সেক্টর ৫), উইং কমান্ডার এম খালেদ বাশার (সেক্টর ৬), মেজর নাজমুল হক (সেক্টর ৭), মেজর আবু ওসমান চৌধুরী (সেক্টর ৮), মেজর এম এ জলিল (সেক্টর ৯), নৌ কমান্ডো বাহিনী—সেক্টর ১০ (মেজর এম এ জলিলের তত্ত্বাবধানে) এবং মেজর আবু তাহের (সেক্টর ১১)। এই সেক্টরভিত্তিক নেতৃত্ব যুদ্ধের বিস্তার ও সাফল্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে কেন্দ্রীয় কাঠামোর বাইরে কিছু স্বতন্ত্র প্রতিরোধ বাহিনীও সক্রিয় ছিল। এর মধ্যে বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীর নেতৃত্বাধীন কাদেরিয়া বাহিনী উল্লেখযোগ্য। এসব বাহিনী বিভিন্ন অঞ্চলে প্রতিরোধ জোরদার করে এবং যুদ্ধের গতিপথে প্রভাব ফেলে।
রাজনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত গঠনে মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতা, সাংস্কৃতিক কর্মী ও বুদ্ধিজীবীরা ভূমিকা রাখেন। তাঁদের কর্মকাণ্ড মুক্তিযুদ্ধকে নৈতিক ও আদর্শিক শক্তি জোগায়।
তবে মুক্তিযুদ্ধের বিজয় কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর একক অর্জন নয়। সাধারণ মানুষ, মুক্তিযোদ্ধা, নারী, শরণার্থী ও শহীদদের সম্মিলিত ত্যাগের মাধ্যমেই স্বাধীনতা অর্জিত হয়। এই যুদ্ধ বাংলাদেশের রাষ্ট্রগঠনের ভিত্তি স্থাপন করে এবং জাতীয় পরিচয়ের রূপ নির্ধারণ করে।
বিজয় দিবস অতীত স্মরণের পাশাপাশি ভবিষ্যতের জন্য আত্মপর্যালোচনার সুযোগ এনে দেয়। মুক্তিযুদ্ধের অভিজ্ঞতা থেকে গণতন্ত্র, মানবাধিকার, জাতীয় ঐক্য ও দায়বদ্ধ রাষ্ট্রব্যবস্থার গুরুত্ব অনুধাবন করা জরুরি। একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গড়ার মধ্যেই বিজয় দিবসের প্রকৃত তাৎপর্য নিহিত।
শেয়ার করুন আপনার পছন্দের সোশ্যাল মিডিয়ায়
error: Content is protected !!