হোম » সারাদেশ » রঙ-তুলিতে সেজেছে দেবী দুর্গা, সিরাজগঞ্জে ৫১১ টি মন্ডপে দূর্গা পূজা

রঙ-তুলিতে সেজেছে দেবী দুর্গা, সিরাজগঞ্জে ৫১১ টি মন্ডপে দূর্গা পূজা

হুমায়ুন কবির সুমন, সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি:
সনাতন ধর্মাম্বীদের সব চেয়ে বড় উৎসব দুর্গা পুজা। এবছর সিরাজগঞ্জে ৫১১টি মণ্ডপে দূর্গা পূজা অনুষ্ঠিত হবে। এ উপলক্ষে ইতিমধ্যেই প্রতিমা তৈরিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন কারিগরেরা। খড়, কাঠ, সুতা আর মাটি দিয়ে নিপুণ হাতে তৈরি করেছেন প্রতিমা। ইতোমধ্যে সিরাজগঞ্জে বেশির ভাগ প্রতিমা তৈরির অবকাঠামোর কাজ শেষ। এখন দেবী দূর্গার অনিন্দ্য সুন্দর রূপ দিতে দিনরাত রং-তুলির কাজ করে যাচ্ছেন শিল্পীরা।

জেলার কামারখন্দ উপজেলার পালপাড়ায় চলছে প্রতিমা তৈরির ধুম। প্রায় ৭০-৭৫ বছর ধরে এখানকার কারিগররা প্রতিমা তৈরি করছেন। এবছর প্রতিটি প্রতিমা ১২ হাজার থেকে দেড় লাখ টাকা বিক্রি হচ্ছে বলে জানান কারিগরেরা। সিরাজগঞ্জ ছাড়াও আশপাশের পাবনা, বগুড়া, নাটোর, টাঙ্গাইলসহ বিভিন্ন জেলা থেকে এসে ক্রেতারা এখান থেকে প্রতিমা কিনে নিয়ে যায় বলে জানা যায়।

পঞ্জিকা মতে আগামী (২৮ সেপ্টেম্বর) মহাষষ্ঠী পূজার মধ্য দিয়ে শুরু হবে এবং (২ অক্টোবর) বিজয়া দশমীতে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হবে পাঁচদিনব্যাপী এই উৎসবের। দেবীর এবার আগমন (হাতি) যার ফল আশা (শুভ) ও গমন দোলায়।

বর্তমানে প্রতিমার কাঠামো তৈরির কাজ শেষ পর্যায়ে। পালপাড়ায় ১৫টি বাড়িতে চলছে প্রতিমা তৈরির কাজ। এবার প্রায় ১৫০টি মণ্ডপের জন্য প্রতিমা তৈরি হচ্ছে। স্থানীয়দের পাশাপাশি বগুড়া, পাবনা ও রংপুর থেকেও কারিগর এসেছেন। তাদের দৈনিক ৮০০ থেকে ১২০০ টাকা মজুরি দেওয়া হচ্ছে, সাথে খাবার ও থাকার ব্যবস্থাও করা হয়েছে।

সরেজমিনে শুক্রবার (২৬ সেপ্টেম্বর) সকালে গিয়ে দেখা যায়, ভদ্রঘাটের পালপাড়ায় প্রতিমা তৈরিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন শিল্পীরা। তাদের যেন দম ফেলার সময় নেই। পুরুষদের পাশাপাশি প্রতিমা তৈরির কাজে সহায়তা করছে গৃহবধু, নারী বাদ পড়েনি শিশুরাও। কেউ কেউ খড়, কাঠ, সুতা দিয়ে প্রতিমার কাঠামো তৈরি করছেন কেউবা নিপুণ হাতে ফুটিয়ে তুলছেন দুর্গা, লক্ষ্মী, সরস্বতী অনিন্দ্য সুন্দর রূপ। প্রতিমার কাঠামো তৈরি শেষে এখন চলছে রং তুলির কাজ। রং তুলিতে সাজানো হচ্ছে প্রতিমার অপরূপ সৌন্দর্য। তবে দেবী দুর্গাকে নানা রঙে রাঙালেও প্রতিমা তৈরির উপকরণ ও রঙের দাম বেড়ে যাওয়ায় ন্যায্য পারিশ্রমিক থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন প্রতিমা কারিগররা।

প্রতিমা কারিগর শ্রীকান্ত পাল জানান, তার নিজস্ব বাড়িতে এবার ১৫টি প্রতিমা তৈরি হচ্ছে। প্রতিটি প্রতিমা ৪০ হাজার  থেকে দেড় লাখ টাকায় বিক্রি হবে। তিনি আরও জানান, গত কয়েক বছরের চেয়ে এবার চাহিদা অনেক বেশি।

সঞ্জীব পাল বলেন, এখানে তৈরি প্রতিটি প্রতিমা ১২ হাজার থেকে দেড় লাখ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তার বাড়িতে ৫ জন মহিলা ও পুরুষ শ্রমিক কাজ করছে। পুরুষ শ্রমিকদের মজুরি ১২ শত টাকা ও মহিলা শ্রমিকদের মজুরি ৬ শত টাকা। তিনি আরও জানান, ভদ্রঘাট পালপাড়ায় প্রায় ১২টি বাড়িতে প্রতিমা তৈরি করা হচ্ছে। শতাধিক নারী-পুরুষ শ্রমিক কাজ করছে। জেলার চাহিদা মিটিয়ে এই প্রতিমাগুলো পাবনা, বগুড়া, নাটোর, টাঙ্গাইলসহ উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জেলায় যাবে। তিনি আরও জানান, একটি প্রতিমা তৈরি করতে প্রায় ১০ দিন সময় লাগে।

গুপিনাথ পাল বলেন, বাপ-দাদার ঐতিহ্য ধরে রাখতে প্রায় ৪০ বছর যাবৎ এই পেশায় জড়িত রয়েছি। প্রতিমা তৈরির উপকরণ ও রঙের দাম বেড়ে যাওয়ায় ন্যায্য পারিশ্রমিক থেকে আমরা বঞ্চিত হচ্ছি। তিনি আরও বলেন, প্রতিমা তৈরির উপকরণের দাম ও চাহিদা বাড়লেও বাড়েনি দাম। তবে চলতি বছর প্রতিমার চাহিদা গত বছরের তুলনায় বেশি। গতবারের মুল্যতেই বিক্রি হচ্ছে প্রতিমা। প্রতিটি প্রতিমা ১৫ হাজার থেকে প্রায় ৮০ হাজার টাকা বিক্রি হচ্ছে এক সেট।

রণজিত পাল ও সুভাষ পাল বলেন, প্রতিমা তৈরির উপকরণ মাটি, খড় ও সুতলি-রঙের দাম বেড়ে যাওয়ায় আগের মতো প্রতিমা তৈরি করে আর্থিকভাবে লাভবান হওয়া সম্ভব হচ্ছে না। এবার পূজা মণ্ডপের সংখ্যাও কমে যাওয়ায় প্রতিমা বিক্রিও কমে গেছে।

সিরাজগঞ্জ জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি সন্তোষ কুমার কানু বলেন, আসন্ন শারদীয় দুর্গা পূজা উপলক্ষে সব ধরণের প্রস্তুতি শেষ হয়েছে। এবার শারদীয় দূর্গাপুজা আগামী ২৮ সেপ্টেম্বর মহাষষ্ঠী পূজার মধ্য দিয়ে শুরু হবে এবং ২ অক্টোবর বিজয়া দশমীতে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হবে পাঁচদিনব্যাপী এই উৎসবের। তিনি আরো বলেন, দেবী মার আগমন হাতিতে, যার ফল (শুভ) ও গমন দোলায়। তিনি আরও বলেন, ইতি মধ্যে জেলা প্রশাসনের দিক থেকে আমাদের সার্বিক সহযোগিতা করা হচ্ছে। এবার জেলায় ৫১১ টি পূজা মন্ডবে আনন্দ উৎসবে পালিত হবে শারদীয় দুর্গা পূজা।

সিরাজগঞ্জ জেলা পুলিশ সুপার ফারুক আহমেদ বলেন, পূজায় যেকোনো অপ্রীতিকর ঘটনা এড়ানোর জন্য সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নেয়া হয়েছে। প্রতিটি পূজামণ্ডপে সার্বক্ষণিক পুলিশ সদস্য মোতায়েন থাকবে। এছাড়াও আনছারসহ মোবাইল টিম সার্বক্ষণিক পূজামণ্ডপগুলো নজরদারিতে রাখবে। পাশাপাশি সবকটি পূজা মণ্ডপ গোয়েন্দা নজরদারিতে থাকবে। আমরা ঘোষণা দিয়েছি ৩৫০ মিটার রাস্তা সহসাই করে দেব।

সিরাজগঞ্জ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির প্রেসিডেন্ট সাইদুর রহমান বাচ্চু বলেন, ভদ্রঘাটের প্রতিমা শুধু সিরাজগঞ্জে নয়, বগুড়া, টাঙ্গাইল, পাবনা নাটোরসহ বিভিন্ন জেলায় যায়। কিন্তু প্রতিমা বের করার মতো ভালো রাস্তা নেই। ডিসি সাহেবকে বলেছি, সেখানে ভালো একটি রাস্তা করার জন্য। তিনি তাৎক্ষণিক ইউএনও সাহেবকে নির্দেশ দিয়েছেন। সেখানে নিরাপত্তারও একটি বিষয় আছে। সে জন্য আমরা চেম্বার অব কমার্সের পক্ষ থেকে সিসি ক্যামেরা স্থাপনের আশ্বাস দিয়েছি।

শেয়ার করুন আপনার পছন্দের সোশ্যাল মিডিয়ায়
error: Content is protected !!