হোম » সারাদেশ » চাটখিলে চিকিৎসক না হয়েও দাঁতের চিকিৎসা দিচ্ছেন মেহেদী হাসান! 

চাটখিলে চিকিৎসক না হয়েও দাঁতের চিকিৎসা দিচ্ছেন মেহেদী হাসান! 

মোহাম্মদ হানিফ নোয়াখালী  প্রতিনিধি: ডেন্টাল সার্জন ছাড়া অন্য কেউ দাঁতের চিকিৎসা করলে তা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ।বাংলাদেশ মেডিক্যাল ও ডেন্টাল কাউন্সিলের (বিএমডিসি) আইন অনুযায়ী শুধু এমবিবিএস ও বিডিএস ডিগ্রিধারীরাই চিকিৎসা করতে পারবেন। এরমধ্যে বিডিএস ডিগ্রিধারীরা কেবল দাঁতের চিকিৎসা করেন। কিন্তু বাস্তবতা একেবারেই ভিন্ন দেখা গেল।  নোয়াখালীর চাটখিল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের  বিডিএস ডিগ্রি  ছাড়া ডেন্টাল ক্লিনিক আকর্ষণীয় ব্যানার ও সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে ডেন্টাল ক্লিনিক খুলে বসেছেন  মো. মেহেদী হাসান নিশান ।বিগত একযুগ ধরে সরকারি হাসপাতালে বসেই দেখছেন রোগী, দিচ্ছেন অপচিকিৎসা। ডেন্টাল সার্জনের যন্ত্র-সহকারী হিসেবে দায়িত্ব থাকলেও তিনি স্বঘোষিত ডেন্টিষ্ট। খুলেছেন হাসপাতালের সামনে নিজস্ব চেম্বার। সরকারি হাসপাতালের রোগী নিয়ে যাচ্ছেন নিজস্ব চেম্বারে।
চাটখিল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মেডিকেল অফিসারের ৩৫ নাম্বার কক্ষে চেয়ার-টেবিল ও দাঁতের চিকিৎসার যন্ত্রপাতি নিয়ে বসেছেন তিনি। যে কেউ দেখলে তাকে ডেন্টাল সার্জন মনে করবেন।তিনি দাঁতের চিকিৎসা দিচ্ছেন। নিজস্ব প্যাড়ে নিজেকে ডাক্তার পরিচয় দিয়ে, রোগীদের থেকে নিচ্ছেন ফি। রোগীর প্রাথমিক পরামর্শ দিয়ে নিয়ে যান সরকারি হাসপাতাল রোডের ‘আয়েশা ডেন্টাল সার্জারি অ্যান্ড অর্থোডন্টিক্স’ নামক নিজস্ব চেম্বারে। সেখানে মোটা অঙ্কের টাকায়  চুক্তিতে রোগীদের দাঁতের সার্জারি, রুটক্যানেল,দাঁত তোলাসহ বিভিন্ন কাজ নিজেই করে থাকেন।  তার অপচিকিৎসায় অনেক রোগী নানা জটিল সমস্যার সম্মুখীন হয়েছেন বলে জানা গেছে।
খোঁজ নিয়ে  জানা যায় , চাটখিল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে একচ্ছত্র আধিপত্য রয়েছে নিশানের। তার বাবা মো. আরিফ দীর্ঘদিন থেকে এই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের অফিস সহকারী হিসেবে চাকরিরত ছিলেন। বর্তমানে তিনি দন্ত চিকিৎসা প্রযুক্তিবিদ ও তার ভাই রায়হান হাসপাতালের প্যাথলজি বিভাগে কর্মরত আছেন। দীর্ঘদিন থেকে একই হাসপাতালে থাকায় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. খোন্দকার মোশতাক আহম্মেদের সঙ্গে রয়েছে সখ্যতা। এ ছাড়া সিভিল সার্জন অফিসের অসাধু কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে ভুয়া দাঁতের ডাক্তারদের প্রতিনিধিত্ব করছেন তিনি। নীতিমালা অনুযায়ী, ডেন্টাল ক্লিনিক পরিচালনা করতে হলে বিডিএস চিকিৎসক ও প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত টেকনিশিয়ান নিয়োগ, প্রয়োজনীয় রি-এজেন্ট, সিভিল সার্জন কার্যালয় ও স্বাস্থ্য বিভাগের বৈধ অনুমতিপত্র এব ট্রেজারি চালান জমা আবশ্যক। অথচ এর একটি শর্তও পূরণ করেনি তার  প্রতিষ্ঠান।
চাটখিল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আশপাশের সব ডেন্টাল চেম্বার চলে মেহেদী হাসানের  ইশারায়। নিজেকে পরিচয় দেন বাংলাদেশ ডেন্টাল পরিষদের নোয়াখালী জেলা শাখার সভাপতি হিসেবে। তাকে ম্যানেজে রাখলে উপজেলার ভুয়া ডেন্টিস্টদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করে না প্রশাসন। ভুয়া ডেন্টিস্ট চেম্বার ও ভুয়া ডায়াগনষ্টিক সিন্ডিকেট চলে তার ইশারায়।খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চাটখিলে  পৌর শহরসহ ইউনিয়ন পর্যায়ে প্রায় ৫০টি ডেন্টাল ক্লিনিক রয়েছে। এই প্রতিষ্ঠানগুলোর সরকারি অনুমোদন নেই। এগুলোতে পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য কোনো যন্ত্রপাতি বা ল্যাবরেটরি নেই। নেই বিডিএস চিকিৎসক ও দক্ষ টেকনিশিয়ান। তবে যারা আছেন, তারা দাঁত তোলা থেকে শুরু করে অস্ত্রোপচার সবই করছেন। এর মধ্যে অনেকেই তিন বা ছয় মাসের প্রশিক্ষণ নিয়ে নিজের নামের আগে ‘ডেন্টিস্ট’ শব্দটি যোগ করে চিকিৎসা দিচ্ছেন। অন্যরা ভুয়া পদ-পদবি ও অভিজ্ঞতার তথ্য ব্যবহার করে রোগীদের সঙ্গে প্রতারণা করে সেবার নামে ব্যবসা করে যাচ্ছেন।
অনুসন্ধানে জানা যায়, সরকারি হাসপাতাল রোডের খোকন ভিডিও গলির ভেতরে রয়েছে নিশানের ডেন্টাল চেম্বার, তার ভাই রায়হানের আশ-শিফা নামক ডায়াগনস্টিক সেন্টার, ফিজিও থেরাপি সেন্টার ও আয়েশা ফার্মেসি নামের ওষুধের দোকান। হাসপাতালে রোগীদের চিকিৎসার নামে নিজস্ব প্রতিষ্ঠানগুলোতে বাগিয়ে আনেন
তারা। রোগীদের চিকিৎসার নামে বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা দিয়ে রোগীদের থেকে হাতিয়ে নিচ্ছেন মোটা অঙ্কের টাকা। সরেজমিনে চাটখিল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গিয়ে দেখা যায়, ৩৩নং কক্ষে রোগীদের দন্ত চিকিৎসা দিচ্ছেন ডেন্টাল সার্জন ডা. পান্না বেগম। তবে তার রুমের সামনে কোনো নেইম প্লেট নেই। অন্যদিকে ৩৫ নম্বর কক্ষের সামনে বড় একটি নেইম প্লেট। যেখানে মেহেদী হাসান নিশানের নাম গোটাগোটা অক্ষরে লেখা রয়েছে। পদবি হিসেবে লেখা রয়েছে ‘দন্ত চিকিৎসা প্রযুক্তিবিদ।’ সেই রুমে রোগীদের ভিড়। চিকিৎসা দিচ্ছেন মেহেদী হাসান নিশান।
সেই কক্ষ থেকে সেবা নিয়ে বেরিয়ে আসা কয়েকজনের সঙ্গে কথা হয় প্রতিবেদকের। তারা জানান, ডা. নিশান স্যারের কাছ থেকে ১০০ টাকা ফি দিয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন। তিনি ওষুধ লিখে দিয়েছেন। পরবর্তী সময় দাঁতের ক্যাপ বসাতে হাসপাতাল রোডের খোকন ভিডিও গলির চেম্বারে যেতে বলেছেন। আরেক রোগী বলেন, ডাক্তার স্যার বিকালে চেম্বারে যেতে বলেছেন। সেখানে দাঁত ওয়াশ করে পুডিং করাতে হবে। এখন দাঁতে ব্যথার ওষুধ লিখে দিয়েছেন।
চাটখিল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ডেন্টাল সার্জন ডা. পান্না বেগম জানান, মেহেদী হাসান নিশানকে তার সহযোগী হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। নিশানের পদ দন্ত চিকিৎসা প্রযুক্তিবিদ। তিনি সহকারী হিসেবে দাঁতের চিকিৎসার ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি রক্ষণাবেক্ষণ ও হাইজিন নিশ্চিত করবেন।  মেহেদী হাসান নিশান কীভাবে রোগীদের চিকিৎসা দিচ্ছেন এমন প্রশ্নের জবাবে ডা. পান্না বলেন, ‘দন্ত চিকিৎসা প্রযুক্তিবিদের কাজ চিকিৎসা দেওয়া নয়। আলাদা কক্ষে নিশান কীভাবে চিকিৎসা দিচ্ছেন সেটা তার জানা নেই।’
এ বিষয়ে কথা হলে মেহেদী হাসান নিশান জানান, এই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স তার চতুর্থ পোষ্টিং। ২০১৩ সাল থেকে এই হাসপাতালে দন্ত চিকিৎসা প্রযুক্তিবিদ হিসেবে কর্মরত আছেন। গত ৮ বছর থেকে হাসপাতালে ডেন্টাল সার্জন ছিল না। সেই সময় থেকে তিনি রোগীদের চিকিৎসা দিয়ে আসছেন।
বিডিএস না হয়ে তিনি কীভাবে চিকিৎসা দিচ্ছেন এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, ঢাকা ডেন্টাল কলেজ থেকে তিনি ৪ বছরের ডিপ্লোমা করেছেন। ডেন্টাল সার্জনরা যা করতে পারবেন একই কাজ তারাও করতে পারবেন। এ বিষয়ে তাদের আদালতের আদেশ রয়েছে। এ ছাড়া তিনি যে আয়েশা ডেন্টাল সার্জারি অ্যান্ড অর্থোডন্টিক্স নামক ডেন্টাল ক্লিনিকের মালিক সে বিষয়টিও নিশ্চিত করেন।
ডেন্টাল ডিপ্লোমা করা দন্ত চিকিৎসা প্রযুক্তিবিদ দাঁতের চিকিৎসা দিতে পারবে কি না, এ বিষয়ে নোয়াখালী মেডিকেল কলেজের ডেন্টাল বিভাগের সহকারী অধ্যাপক জানান, বিডিএস ডিগ্রি না থাকলে কেউ দাঁতের চিকিৎসা দিতে পারবে না। যারা বিএসসি ইন ডেন্টাল করেছেন তারা ডেন্টাল সার্জনের সহকারী হিসেবে কাজ করতে পারবেন। তবে বিএসসি ডিগ্রি দিয়ে কেউ নিজস্ব চেম্বার বা ক্লিনিক চালাতে পারবেন না।
চাটখিল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের দন্ত চিকিৎসা প্রযুক্তিবিদ মো. মেহেদী হাসান নিশানের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে নোয়াখালী জেলা সিভিল সার্জন বলেন, কেউ বিডিএস ডিগ্রি এবং বিএডিসি সনদ ছাড়া ডেন্টাল ক্লিনিক চালাতে পারবে না। সরকারি কর্মচারী নিশানের বিষয়ে তদন্ত করে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
শেয়ার করুন আপনার পছন্দের সোশ্যাল মিডিয়ায়
error: Content is protected !!