হোম » রাজধানী » “নারী শ্রমিকরা বিভিন্নভাবে বৈষম্য ও হয়রানির শিকার”-এডভোকেট সাবিকুন্নাহার মুন্নী এমপি।

“নারী শ্রমিকরা বিভিন্নভাবে বৈষম্য ও হয়রানির শিকার”-এডভোকেট সাবিকুন্নাহার মুন্নী এমপি।

মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান
“নারী শ্রমিকরা বিভিন্নভাবে বৈষম্য ও হয়রানির শিকার বলে মন্তব্য করেন এডভোকেট সাবিকুন্নাহার মুন্নী এমপি। শনিবার (১৮ জুলাই) তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হল, জাতীয় প্রেসক্লাব, ঢাকা এ “নারী শ্রমিকের অধিকার ও সামাজিক সুরক্ষা: বাস্তবতা ও করণীয়” শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এডভোকেট সাবিকুন্নাহার মুন্নী এমপি বলেছেন,বলতে দ্বিধা নেই যে বাংলাদেশের নারী শ্রমিকরা কর্মক্ষেত্রে বিভিন্নভাবে বৈষম্য ও হয়রানির শিকার হয়। দেশের জনসংখ্যার অর্ধেক নারীদের প্রতিনিধিত্বকারী এই শ্রমজীবি নারীদের নিরাপত্তা, সমান মজুরি ও সুযোগ নিশ্চিত করা রাষ্ট্রেরই দায়িত্ব। এ দায়িত্ব অস্বীকার বা অবজ্ঞা করার উপায় নেই।

বাংলাদেশ প্রগতিশীল গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশনের উদ্যোগে আয়োজিত গোলটেবিল বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন সংগঠনের কেন্দ্রীয় সভাপতি রোজিনা আক্তার, সঞ্চালনা করেন সাধারণ সম্পাদক কামরুন নাহার এবং মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সংগঠনের সিনিয়র সহ-সভাপতি সাহিদা সরকার।

মূল প্রবন্ধে সাহিদা সরকার নারী শ্রমশক্তির বর্তমান চালচিত্র ও পরিসংখ্যান,বর্তমান বাস্তবতা, আইনী ও প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতা , বর্তমান বাস্তবতায় করণীয় , নারী শ্রমিকের নিরাপত্তা ও সচেতনতা এবং আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার কনভেনশনের উপর বিস্তারিত আলোকপাত করেন ।

মূল প্রবন্ধের উপর আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন বাংলাদেশ জাতীয় শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি শামীম আরা, সাবেক মহিলা কমিশনার(রামপুরা, ঢাকা) আমেনা বেগম, বাংলাদেশ লেবার কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক নাজমা আক্তার ,লেবার কোর্ট বার এসোসিয়েশনের ভাইস-প্রেসিডেন্ট এডভোকেট শারমীন সুলতানা , ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশ্বধর্ম ও সংস্কৃতি বিভাগের শিক্ষক ডঃ মেহের লুৎফা, সম্মিলিত নারী প্রয়াসের সভাপতি ডঃ শামীমা তাসনীম,শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের টিসিসি ডিরেক্টর কোহিনুর মাহমুদ প্রমুখ।

সেমিনারে বক্তারা বলেন , সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক সংকটের কারণে নারী শ্রমিকের সংখ্যা হ্রাস পেয়েছে । বিবিএসের জরিপ অনুযায়ী নারী শ্রমিকের সংখ্যা আগে ২.৫ কোটি থাকলেও বর্তমানে কমে ২ কোটি ৩৭ লাখ । তাঁরা বলেন , বাংলাদেশে কর্মজীবি নারীদের একটা বিশাল অংশ অনানুষ্ঠানিক খাতে(Informal Sector) কাজ করেন। এর মধ্যে শতকরা ০.৭৩ ভাগ নারীর আনুষ্ঠানিক কর্মচুক্তি বা লিখিত নিয়োগপত্র আছে,বাকীরা মৌখিক চুক্তিতে বা দৈনিক মজুরি ভিত্তিতে কাজ করেন।

মজুরির বৈষম্য প্রসঙ্গে তাঁরা বলেন , রাষ্ট্রীয় আইন বা নীতিমালায় নারী-পুরুষের সমান মজুরির কথা উল্লেখ থাকলেও কৃষি , নির্মাণ খাত ও চাতাল শিল্পে নারী শ্রমিকদের ২০-৩০% মজুরি কম দেয়া হয় ।

গৃহ শ্রমিকের প্রসঙ্গে তাঁরা বলেন , শহরাঞ্চলে লাখ লাখ নারী ও কন্যা শিশু গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করে । তাদের নির্দিষ্ট কর্মঘন্টা নেই, সাপ্তাহিক ছুটি নেই , নেই পর্যাপ্ত খাবার । গৃহ শ্রমিকদের শতকরা ৬৩ ভাগ নির্যাতনের শিকার হয়। গৃহকর্তা বা গৃহকর্তীর ভয়,লোকলজ্জা ও আইনী সহায়তার অভাবে মাত্র ৭ শতাংশ থানায় অভিযোগ করে।

মাতৃত্বকালীন অধিকার ও সুরক্ষা প্রসঙ্গে তাঁরা বলেন , গার্মেন্টস শিল্পের বড় বড় কারখানাগুলোতে মার্তৃত্বকালীন ছুটি মিললেও মাঝারি ও ক্ষুদ্র প্রতিষ্ঠানে গর্ভবতী নারী শ্রমিকরা চরম বৈষম্যের শিকার হন । ছাঁটাইয়ের ভয়ে অনেক নারী গর্ভধারণের কথা গোপন রাখে। অধিকাংশ কারখানায় নারী শ্রমিকদের জন্য উন্নত বা স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশনের ব্যবস্থাও নেই,নেই শিশুদের জন্য ডে কেয়ার সেন্টার।

নারী শ্রমিকের নিরাপত্তা প্রসঙ্গে তাঁরা বলেন , মহামান্য উচ্চ আদালতের সুস্পষ্ট নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও অধিকাংশ কারখানায় এন্টি হ্যারেসমেন্ট কমিটি নেই, থাকলেও প্রতিহিংসা বা প্রতিশোধের ভয়ে শ্রমিকরা অভিযোগ করেন না।

আইনী সংস্কার ও অনানুষ্ঠানিক খাত প্রসঙ্গে তাঁরা বলেন , বাংলাদেশের শ্রম আইনকে যুগোপযোগী করে কৃষি ,গৃহশ্রম ও অন্যান্য অনানুষ্ঠানিক খাতের নারী শ্রমিকদের পূর্ণাঙ্গ শ্রমের আওতায় আনতে হবে । তাদের জন্য সার্বজনীন স্বাস্থ্য বীমা ও পেনশন প্রথা চালু করতে হবে । “একই কাজ ,একই মজুরি” নীতি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে শক্তিশালী মনিটরিং সেল গঠন করতে হবে । অমান্যকারী প্রতিষ্ঠান বা মালিককে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনতে হবে । শ্রমিকদের যাতায়াতের জন্য নিরাপদ ও ডেডিকেটেড পরিবহনের ব্যবস্থা করতে হবে ।

প্রযুক্তির উন্নয়ন ও নারী শ্রমিক ছাঁটাই প্রসঙ্গে তাঁরা বলেন , পোশাক খাতে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে নারীরা । বিজিএমইএ ও বিবিএসের তথ্যমতে আশি ও নব্বইয়ের দশকে গার্মেন্টস শিল্পে নারী শ্রমিকের সংখ্যা ছিল ৮০% কিন্তু বর্তমানে তা ৪৬-৫৩% এ নেমে এসেছে । নতুন ও জটিল যন্ত্রপাতি পরিচালনায় নারী শ্রমিকদের উপযুক্ত প্রশিক্ষণ না দেয়াই তার কারণ ।

প্রবাসী নারী শ্রমিকদের নিরাপত্তার স্বার্থে তাদের ভাষা ,আইনী অধিকার ও আত্মরক্ষামূলক প্রশিক্ষণ জোরদার করার উপর তাঁরা গুরুত্বারোপ করেন । প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে সেইফ হোমের কার্যকারিতা ও সক্রিয়তা বৃদ্ধিরও আহ্বান জানান ।

বক্তারা আরো বলেন , আইএলও এবং বাংলাদেশের নতুন শ্রম আইন অনুযায়ী প্রত্যেক কারখানায় যৌন হয়রানি প্রতিরোধ কমিটি কার্যকর করতে হবে । মার্তৃত্বকালীন আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে এবং বিশেষ আপস্কিলিং বা কারিগরি প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে ।আমাদেরকে অবশ্যই মনে রাখতে হবে এবং মানতে হবে যে, জনশক্তির অর্ধেককে বঞ্চিত রেখে পূর্ণাঙ্গ উন্নতি ও অগ্রগতি সম্ভব নয় ।

সবাইকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানিয়ে সমাপনী বক্তব্য রাখেন গোলটেবিল বৈঠকের সভাপতি রোজিনা আক্তার ।

শেয়ার করুন আপনার পছন্দের সোশ্যাল মিডিয়ায়
error: Content is protected !!