
মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান,ঢাকাঃ
চলমান মামলায় নিয়মিত ও কার্যকর তদারকির ব্যবস্থার অভাব, তদন্ত পরিচালনার ক্ষেত্রে ডিএনএ এবং ফরেনসিক প্রতিবেদন প্রাপ্তির দীর্ঘসূত্রিতা, শাস্তি প্রদানে নির্দেশিকার অভাব এবং ভুক্তভোগীকে দোষারোপ করা ধর্ষণ অপরাধে ন্যায়বিচার নিশ্চিতের পথে মূল অন্তরায় বলে অভিমত ব্যক্ত করেছেন মতবিনিময় সভায় উপস্থিত বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ ।
আজ ০৯ জুন ২০২৬, মঙ্গলবার বিকাল চারটায় জাতীয় প্রেসক্লাবের ভিআইপি লাউঞ্জ, তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে ধর্ষণ আইন সংস্কার জোট(Rape Law Reform Coalition) এর সচিবালয় হিসেবে”বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড এ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট”-এর আয়োজনে যৌন ও লিঙ্গ ভিত্তিক সহিংসতা প্রতিরোধে বিদ্যমান আইনের সুষ্ঠু বাস্তবায়ন নিশ্চিত এবং ভুক্তভোগীর সার্বিক নিরাপত্তা ও সুরক্ষা তথা ন্যায়বিচার নিশ্চিতে করণীয় নির্ধারণের লক্ষ্যে মতবিনিময় সভাটি আয়োজন করা হয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডঃ তাসলিমা ইয়াসমিনের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত মতবিনিময় সভায় স্বাগত বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী বাংলাদেশ লিগ্যাল এইডস এ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (BLAST)- এর অনারারি নির্বাহী পরিচালক ব্যারিস্টার সারা হোসেন বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে আমরা দেখেছি যে কোনো কোনো আলোড়ন সৃষ্টিকারী ঘটনা ঘটলে জনমনে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয় এবং দ্রুত ব্যবস্থা নেয়ার দাবি উঠে। অনেক ক্ষেত্রে রাষ্ট্রও সেই চাপের প্রেক্ষিতে পদক্ষেপ গ্রহণ করে।তবে আমাদের মনে রাখতে হবে কেবল আলোচিত বা জনমতের কেন্দ্রে থাকা মামলাগুলোতেই নয় বরং সর্বক্ষেত্রেই আইনের যথাযথ বাস্তবায়ন নিশ্চিত জরুরি যেখানে একদিকে ভুক্তভোগীর সুরক্ষা নিশ্চিত হবে অন্যদিকে অভিযুক্তের ন্যায্য বিচার পাওয়ার অধিকারও সমানভাবে সংরক্ষিত থাকবে।
ব্লাস্টের সমন্বয়কারী এডভোকেট শিপ্রা গোস্বামী বলেন, বিচার প্রক্রিয়ায় গতিশীলতা বজায় রাখতে,আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর জবাবদিহিতা নিশ্চিতে এবং নারীর প্রতি সহিংসতার অপরাধে ন্যায়বিচার নিশ্চিতে বিচার প্রক্রিয়ায় কার্যকরী তদারকি ব্যবস্থা নিশ্চিতে প্রযুক্তিভিত্তিক ই-কেস মনিটরিং , জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে মামলা তদারকি ব্যবস্থা এবং ভুক্তভোগীর পূনর্বাসন সংক্রান্ত তদারকির ব্যবস্থা বিদ্যমান থাকলে ধর্ষণসহ অন্যান্য যৌন সহিংসতার ঘটনা হ্রাস পাবে।
সাংবাদিক ও গবেষক কুররিতুন-আইন-তাহমিনা বলেন-ভুক্তভোগী, স্বাক্ষী এবং তাদের পরিবারের সদস্যদের শারীরিক, মানসিক ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিতের জন্য ভুক্তভোগীর পরিচয়ের সুরক্ষা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
উইমেন সাপোর্ট এ্যান্ড ইনভেস্টিগেশন ডিভিশনের উপ-পুলিশ কমিশনার মোসাঃ লিজা বেগম বলেন, ধর্ষণের ভুক্তভোগী নারীর সুরক্ষা নিশ্চিত ও সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারের সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত সম্পাদনের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। তিনি বলেন, পুলিশ বাহিনীর দ্বারা তদন্ত পরিচালনার ক্ষেত্রে বিভিন্ন প্রতিবেদনে পুলিশ বাহিনীর মধ্যে সমন্বয়ের অভাব এবং যৌন সহিংসতার সাথে জড়িত অপরাধীদের তালিকা নিয়ে প্রস্তুতকৃত তথ্যভান্ডারের অভাব রয়েছে।
নারীপক্ষের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য শিরীন পারভীন হক বলেন, সমাজের কোন উপাদানগুলো অপরাধীদের ধর্ষণ বা অন্যান্য সহিংসতা সংগঠনের দিকে ধাবিত করছে সে বিষয়ে মনোবিজ্ঞান ও সমাজবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে গবেষণা পরিচালনা করা প্রয়োজন। পাশাপাশি, ধর্ষণের অপরাধে ন্যায়বিচার নিশ্চিতের জন্য ধর্ষণ সংক্রান্ত আইনের আইনগত ও কাঠামোগত পরিবর্তন আবশ্যক। এছাড়া আইনী বিধান মেনে দ্রুত বিচার কাজ সম্পন্ন করার লক্ষ্যে ফরেনসিক পরীক্ষার সক্ষমতা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন বলেও তিনি মত প্রকাশ করেন।
আইন কমিশনের সভাপতি বিচারপতি জিনাত আরা বলেন, আইন কমিশনের কার্যতালিকার মধ্যে থাকা একটি অভিন্ন শাস্তির প্রদান নির্দেশিকা প্রণয়ন, ধর্ষণ অপরাধে ভুক্তভোগীর ন্যায়বিচার ও প্রতিকার নিশ্চিতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি আরো বলেন, মামলা নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রতা, তদন্ত কর্মকর্তার ও প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী কর্মকর্তার সংকট ভুক্তভোগীর ন্যায়বিচার ও প্রতিকার নিশ্চিতের পথে একটি বড় বাধা।
ধর্ষণে ভুক্তভোগীর প্রতি সংবেদনশীল আচরণের বিষয়টি উল্লেখ করে বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্টের আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি মোহাম্মদ ইমান আলী বলেন, বিচার ব্যবস্থার সাথে সংশ্লিষ্ট সকল ব্যক্তি যেমন-বিচারক, আইনজীবী এবং পুলিশের মানসিক পরিবর্তন নিয়ে আসা প্রয়োজন। বিচার কার্য দ্রুত কার্যকর এবং দৃশ্যমান না হলে অপরাধীরা মনোবলে বলীয়ান হয়ে যায় বলে তিনি অভিমত ব্যক্ত করেন। সামাজিক অবক্ষয়, পিতা-মাতার উদাসীনতা, রাজনৈতিক নেতাদের প্রশ্রয় ধর্ষণ ও নারী-শিশুর প্রতি সহিংসতার অন্যতম কারণ।
সভায় সকল বিশিষ্টজনই ধর্ষণ সংক্রান্ত আইন সংশোধন করার উপর গূরুত্বারোপ করেন।

আরও পড়ুন
“সংস্কৃতিতে ২% বরাদ্দ চাই: মানবিক বাংলাদেশ গঠনে সরকারের প্রতি সাংস্কৃতিককর্মীদের আহ্বান”
জনগণকে আইনি সুরক্ষা দেওয়া পুলিশের প্রধান দায়িত্ব : আইজিপি আলী হোসেন ফকির
প্রকৃতির সান্নিধ্যে মহাখালী মডেল হাই স্কুলের স্কাউট ডে ক্যাম্পিং অনুষ্ঠিত