
আব্দুর রাজ্জাকঃ দীর্ঘ দিন পর, ঢাকায় ছেড়ে গ্রামগঞ্জে যাচ্ছি। আমার ছোট গ্রাম, সবুজে পরিপাটি, ধান খেতে দক্ষিণা বাতাসের ঢেউয়ের প্রবাহ, স্কুল – মসজিদ – মাদ্রাসার সামনে খেলার মাঠ, পুবপাথার জমিতে পটোলের চাষ, চৌকিদার ভিটেমাটিতে আম- জাম – কাঠাল -নিচু – লেবু – নারিকেল – মেহগুনি- আকাশ মনি বিভিন্ন গাছের সমাহার। সামনে দিগন্ত জুড়ে ফসলের মাঠ।
পাশ্ব দিয়ে পুরানো মাটির রাস্তা-এখন শহরের পিচঢালা কংক্রিটের পথচলা যেন আজগর সাপের মত এঁকেবেঁকে একগ্রাম থেকে অন্য গ্রামে। রাস্তার দুপাশ্বে দোকান। দেশীয় পণ্যের পরিবর্তে বহুজাতিক কোম্পানির প্রতিটি পন্য এখন সেখানকার রমরমা ব্যবসায়ের চাহিদা। আমরা দিন দিন সভ্য উঠছি এই সমস্ত বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে।
আজ আর জামিল ফেক্টরীর সাবান ব্যবহারিত হয় না বা অন্য কেন স্থানীয় তৈরী করা পন্য। অবশ্য সেই সুযোগও নেই। এক সময় বগুড়ার কটন মিল এর বেশ সুনাম ছিল। প্রায় পাঁচ হাজার লোকের কর্ম সংস্থান হয়েছিল।তিন সীপ্টে কাজ চলতো। আমার গ্রাম থেকে অনেকে সেখানে কাজ করতে যেতেন। যার জন্ম পাকিস্তানের সময় কাল,আর মৃত্যু স্বাধীন বাংলাদেশে। এমনি ভাবে বলা যায় বাংলাদেশের প্রতিটি জেলায় কোন কোন উৎপাদন পন্য কারখানা ছিল।
যেখানে স্থানীয় জনগণের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হতো। আজ আমাদের চিনি কলগুলিকে অধুনিকায়ন করা হচ্ছে না, অথচ প্রতি বছর দশ লক্ষ ম্যাট্রিক টান চিনি বিদেশ থেকে আমদানী করাহয়। আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় চিনি শিল্প আজ ধংসের দারপ্রান্তে। পাট শিল্প শেষ। বাকী থাকে চামড়া ও গ্রামেন্টস। এই দুই সেক্টর যদি ব্যাংকের টাকা লুট ও শ্রমিকের শ্রম শোষণ না করতে পারতো তাহলে এতদিনে সেক্টরগুলি অনেক আগেই ধংস হয়ে যেত। তিলেতিলে শ্রমিকরা তাদের রক্ত প্রদান করে সেক্টর দুইটি টিকিয়ে রেখেছে। আট ঘন্টার পরিবর্তে প্রতি দিন ১২ ঘন্টা / ১৪ ঘন্টা শ্রম দিতে হয় একজন শ্রমিকে। তার পরও মালিকের মন পায় না। কথায় কথায় শ্রমিক ছাটাই, বেতন ভাতা থেকে বঞ্চিত,যৌন হয়রানির ইত্যাদি।
আজ বহজাতিক কোম্পানির বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার, ছোট্ট ছোট কোম্পানি গুলো দাঁড়িয়ে থাকতে পারছে না। স্বাধীনতার উত্তর বাংলাদেশে অঞ্চল ভিত্তিক তেমন কোন ফেক্টরী গড়ে উঠে নাই।ফলে গ্রামীণ লাউয়ের ডগার মত লিকলিকে মেয়েরা গার্মেন্টস এর চাকুরি দিকে ঝুঁকছে। এবং আফিং সেবন এর মত নিজেকে ধীরে ধীরে নিঃশব্দে শেষ করছে অর্থনৈতিক সচ্ছলতার আশার। সেটাও ব্যর্থ চেষ্টা। শেষ বিচারে সে শূন্য আবস্থায় গ্রামে ফিরে যায়।তখন চোখে অন্ধকার দেখে।
যদিও বাংলাদেশ সরকার ১০০ টি অঞ্চলিক অর্থনৈতিক জোন গড়ে তুলার পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে।তবে এখন পর্যন্ত বাস্তবায়ের আলো চোখে পড়ছে না। শহর উন্নয়নে রাজস্ব বোর্ডের সিংহ ভাগ অর্থ ব্যয় হয়। আর তার কিছু ছিটা ছাটা তাওয়াফে কিছু অর্থ গ্রামীণ জনপদের রাস্তার জন্য ব্যয়িত হয়, সেটারও মূল উদ্দেশ্য মাল্টিমিডিয়া পন্য গুলি যাতে গ্রামে পৌঁছাতে সক্ষম হয়। গ্রামীন অবকাঠামো উন্নয়ন, উৎপাদিত পন্যের বিপণন, সংরক্ষণ ও নিরাপত্তার ব্যাপারে তেমন কোন উদ্যোগ দেখা যায় না। অথচ প্রায় ৬৫ -৭০% লোক গ্রামীণ অর্থ নৈতিক কর্মকাণ্ডের সহিত জরিত।
আমরা গণতন্ত্রের কথা বলছি, আমরা সমাজতন্ত্রের কথা বলছি , আমরা সাম্যাবস্থার কথা বলছি, আমরা জাতীয়তাবাদের কথা বলছি। এই কি তার লক্ষ্মণ। হে এই সরকার ভূমি সংস্করণ কাজ হাতে নিয়েছে । সাধবাদ জানাই। ভূমি সংস্করণ এর মত ভূমি ব্যবস্থাপনা, তার সৎ ব্যবহার, পরিকল্পিত ভাবে অঞ্চল ভিত্তিক কৃষিপন্য উৎপাদন, বিপণন, সংরক্ষণ ও সঠিক মূল্য নিশ্চিত করনের ব্যবস্থা গ্রহণ। জাতীয় বাজেটের সিংহ ভাল গ্রামীণ আবকাঠামোতে বিনিয়োগ নিশ্চতকরন, দ্বিতীয় ধাপে শিল্পায়নের ক্ষেত্রে মনোযোগ হলে স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশের চেহারাটা এমন থাকতো না।
এক শ্রেনীর লোভী প্রতারক শ্রেণি ব্যাংকের অর্থায়নে সেবামূলক প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছে প্রাইভেটেশনের নামে। এখানে সেবার নামে জনগণকে ধোঁকা দিয়ে সুকৌশলে অর্থনৈতিক বৈষম্য বর্ধক উৎস। যার টাকা আছে তার সেবা মিলে- আর যার টাকা নেই সে মৌমিক অধিকারী অন্ন, আশ্রয়, শিক্ষা, চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত। যদি দেশ এই ভাবে চলে তাহলে স্বাধীনতার সুফল ঘরে ঘরে কিভাবে আমাদের নিশ্চিত হবে? কখনই হবে না বিশেষ করে গ্রামীন জনগোষ্ঠীর সীমাহীন দুঃখের সহিত জরিত ঘটনার সমাধান না ঘটিয়ে বা গ্রামীণ অর্থ নৈতিক কর্মকাণ্ডে ব্যাপক উন্নয়নের সমাহার না ঘটাতে পাড়া। তার জন্য দরকার রাজনৈতিক কমিডমেন্ট ও বাস্তবায়ন।
শুধু মুখে বললেই স্বাধীনতার সুফল ঘরে ঘরে পৌঁছে যায় না। তার জন্য দরকার বাস্তব মুখী কর্মসূচি। আশা করি সরকার সেই দিকে অগ্রসর হবেন। তাহলেই জাতী উপকৃত হবে।আটষট্টি হাজার গ্রামের উন্নতি হলে আমার গ্রামের উন্নতি হবে,সাথে সাথে বাংলাদেশ। আর যদি শুধুই কথার ফুলছড়ি, তাহলে যেই কদু সেই লাউ।সাধু সাবধান।।
আব্দুর রাজ্জাক
গ্রামের পথের যাত্রী।।

আরও পড়ুন
সরকারি সহায়তার নামে কোটি টাকার প্রতারণা: চাঁপাইনবাবগঞ্জে ‘মাসকুরা ট্রেডার্স’ এর বিরুদ্ধে ভুক্তভোগীদের মানববন্ধ
গোপালপুরে বিএনপি’র স্বেচ্ছাসেবক দলের যুগ্ম আহ্বায়ক এর বাবা ইন্তেকাল করেছেন
বগুড়ায় ২ বছরের শিশুকে অপহরণ চেষ্টা, প্রতিবাদ করায় বাবাকে কুপিয়ে হত্যার চেষ্টা