হোম » প্রধান সংবাদ » “মিথ্যে অহঙ্কার”

“মিথ্যে অহঙ্কার”

শেখ হান্নান: আসাদ খাঁ পেশকার সাহেবের বাৎসরিক কামলা। সারা বছর কৃষিকাজ করলেও বর্ষার সময়টা জুড়ে নৌকা চালানোর দায়িতই বেশি করে পালন করতে হয়।

বর্ষাকল। চারদিকে পানি থৈ থৈ করে। এরি মধ্যে পেশকার সাহেব গতকাল সিরাজগঞ্জ টাউনে গেছেন পেনশনের টাকা তুলতে। যাবার সময় বলে গেছেন, আজ বিষুদ বার জামতৈল ইস্টিশন ট্রেনে থেকে নেমে গাড়াবাড়ি হাট দিয়ে বাড়ি আসবেন।
কথামতো আসাদ বেলা তিনটা নাগাদ নৌকা নিয়ে গাড়াবাড়ি হাটে যাবার জন‍্য প্রস্তুত। যাত্রার সহযাত্রী হলেন পেশকার সাহেবের দুই ভাগ্নে। একজন সয়াধানগড়া খান বংশের বদি খাঁন। অন‍্যজন অলিপুরের ভাগ্নে আব্দুল শেখের পুত্র আজিজল শেখ। দুই খালাতো ভাইয়ের গলায় গলায় ভাব হলেও কোনো একটি বিষয়ে দুজন দুজন থেকে পার্থক্য করে রেখেছে। বদি ভাবে তার বাবা শিক্ষিত। ব‍্যবসা করে। শহরে থাকে। তার উপর সে খান বংশের। আবার আজিজল ভাবে তাতে কী! তার নানা মামারা শেখ। সেও শেখ বংশের। তার বাপের অনেক জমিজমা আছে। শহরে থাকে তাতে কী হয়েছে? বদির চেয়ে বংশ গৌরব কোনো অংশেই কম নয় তার ।

আসাদের নৌকার দুই সহযাত্রীর এরুপ মানসিক বিপর্যয়ের বোঝা নিয়ে নৌকা ছাড়লো। হাট তিন মাইলের দুরত্ব হলেও অলিপুর থেকে হাট দেখা যায়। পাড়ি দিতে হবে দূর্গাপুর, ফুলজোর নদী। ডানে তেতুলিয়া গ্রাম এরপর ঝাটিবেলাইয়ের কাটাখালি তারপর গাড়াবাড়ি হাট। যাত্রার শুরুতেই মশুলধারে বৃষ্টি। তীব্র স্রোতের প্রমত্তা ফুলজোর পাড়ি দেয়া যেমন দুঃসাহসিক তেমনি ভয়ংকর কষ্টসাধ‍্য। এই দূর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার মধ্যে অত‍্যন্ত দক্ষতার সাথে নৌকা চালাচ্ছে আসাদ। বিরামহীন বৃষ্টি আর দমকা বাতাসে সৃষ্ট বিক্ষুব্ধ ঢেউয়ের আঘাতে নৌকা বাগে রাখা অসম্ভব প্রায়। ঢেউয়ের আঘাতে ঝলকে ঝলকে পানি ভরতে থাকে নৌকায়। নদীর মাঝামাঝি। পানি উঠছে। নৌকা ডুবু, ডুবু প্রায়। আসাদ বিপদ আসন্ন দেখে অনুরোধ করে বললো-
-“বাবারা এভাবে হাত পাও গোটায়া
বইসা থাইকলে নৌকায় পানি উঠা
পানিতে ডুইবা মইরতে ওইবো! এল্ল‍্যা
পানি হেচেন! নইলে ডুইবা মইরবেন”। পেশকার সাহেবের বংশীয় দুই ভাগ্নে কেউ শুনলো না অসহায় আসাদের কথা। আসাদ মাঝির কথায় আরো শক্ত, আরো কঠিন ভাবে বসে আত্ন গড়িমায় ওম দিতে লাগলো দুই অর্মন‍্য। বদি হীম ঠাণ্ডা বাতাসে শীতে কাঁপছে আর ভাবছে-
-“সে কেনো নৌকার পানি সেচবে?
তাদের বংশের কেউ কোনো দিন
নৌকায় চড়ে পানি সেচেনি। মরে
গেলেও এই অমর্যাদার কাজটি সে
করবে না”! আবার আজিজল চুপচাপ অনুভূতি হীন পাথরের মতো বসে শত্রুভাবাপন্ন দৃষ্টিতে বদিকে অবলোকন করে ভাবছিলো-
-“ধানগড়ার খাঁদের চেয়ে কোনোক্রমেই
তার শেখ বংশ নিচু বা ছোট নয়।
নৌকার পানি সেচার মতো ছোট
কাজ করে বংশকে ছোট করতে
পারবো না। এর চেয়ে নদীর পানিতে
ডুবে মরাই উত্তম! আর তার তো
পানিতে ডুবে মরার ভয় নাই! সে তো
সাঁতার জানে”! আসাদ জীবন বাজী রেখে নৌকা চালাতে চালাতে আর পারলোনা। নৌকা! অবশেষে পেশকার সাহেবের আদরের, স্নেহধন্য ভাগ্নেদের নিয়ে নৌকা ডুবে গেলো। নৌকা যেখানে ডুবলো সেখানটা নদীর কাটাল থেকে অনেকটা সমতল। আসাদ ঝাপদিয়ে পানিতে নেমে জড়িয়ে ধরলো বদিকে। সে জানে বদি সাঁতার জানে না। দেখলো গলা পানি। হাপ ছেড়ে আসাদ বললো-
-“পেশকার সাহেবের অনেক বোঝা
বইচি। আইজকার মতো এতো
ভারি বোঝা আর কোনোকালে
বইনাই। নুন খাইছি তার। সেই
নুনের ঋণ কী দিয়া শোধ দিমু।
তার সাঁতার না জানা ভাইগ্নাডারে
বাঁচাইতে পারছি এই আমার সুখ।” অতপর নৌকা টেনে তীরে ভিড়িয়ে পানি সেচে আবার নৌকা চালালো লগি ঠেলে। গাড়াবাড়ি হাটের ঘাটে নৌকা ভিড়তেই দেখলো পেশকার সাহেব সুন্দর ধবধবে সাদা দামি কাপড়ের পায়জামা পাঞ্জাবী পরে কারো জন‍্য অপেক্ষায়। কাঁধে তার ঝোলানো চামড়ার ব‍্যাগ। হাতে আসাদ ও তার ভাগ্নেদের জন‍্য পদ্মপাতায় মোড়ানো গুড়ের জিলাপি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন মমতা জড়ানো দৃষ্টিতে।

শেয়ার করুন আপনার পছন্দের সোশ্যাল মিডিয়ায়
error: Content is protected !!