
আব্দুর রউফ রুবেলঃ গাজীপুরের কালিয়াকৈরে ৪র্থ শ্রেনীর এক ছাত্রীকে জবাই করে হত্যার পর সেফটি ট্যাংকির ঢাকনায় লাশ বেধে খালের পানিতে ডুবিয়ে গুমের চেষ্টা করেছে বাড়ির ভাড়াটে।পরে পরিবারের সঙ্গে লাশ খোঁজে বেড়ান খুনীও। মঙ্গলবার (১৭ নভেম্বর) রাতের কোন একসময় কালিয়াকৈর উপজেলার উত্তর গজারিয়া এলাকায় এ ঘটনা ঘটে । এ ঘটনায় স্বামীকে গ্রেপ্তার ও স্ত্রীকে আটক করা হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, স্বার্ণালংকার লুট ও ধর্ষণের পর তাকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়।
নিহত লামিয়া(৯) কালিয়াকৈর উপজেলার উত্তর গজারিয়া এলাকার সাহেব আলীর মেয়ে । সে টাঙ্গাইলের মির্জাপুর গোড়াই এলাকার আলোকিত হৃদয় প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণীর ছাত্রী। গ্রেপ্তারকৃত সুমন মিয়া (২৭) বগুড়ার সদর থানার ফুলবাড়ি উত্তরপাড়া এলাকার বিল্লাল হোসেনের ছেলে এবং আটককৃত হলেন, সুমনের স্ত্রী মিলি বেগম (২২)। এসময় স্বামী-স্ত্রীর সঙ্গে তাদের দেড় বছরের ছেলে আলিফও রয়েছে।
নিহতের পরিবার ও পুলিশ সুত্রে জানা যায়, সাহেব আলী উপজেলার উত্তরগজারিয়া এলাকায় নিজের বাড়িতে তার স্ত্রী শামীমা বেগম, তিন ছেলে আব্দুল্লাহ আল মামুন, সুমন মিয়া, ইমন মিয়া, একমাত্র শিশু মেয়ে লামিয়া এবং বড় ছেলের বউকে নিয়ে বসবাস করে আসছেন। তাদের কলোনিতে ১৬ থেকে ১৭টি কক্ষের মধ্যে ১৪টি কক্ষে অন্য ভাড়াটে বসবাস করে। এরমধ্যে গত তিন মাস আগে দুই মাসের অগ্রিম ভাড়া দিয়ে সুমন মিয়া ও তার স্ত্রী মিলি বেগম এবং ছেলে আলিফকে নিয়ে গাজীপুরের কালিয়াকৈরে আসেন।
পরে নিজেকে ইন্ডিয়ান জিরা ব্যবসায়ী পরিচয়ে তার বাসায় ভাড়া নিয়ে তারা বসবাস করে আসছে। নিজেকে ইন্ডিয়ান জিরা ব্যবসায়ী পরিচয় দিলেও সুমন ওই এলাকায় বিভিন্ন সময় রাজমিস্ত্রির কাজ করতেন। বেশ কয়েকদিন ধরে ৬-৭ হাজার টাকা নিয়ে সুমনের সঙ্গে বাড়ির মালিকের দ্ব›দ্ব চলে আসছিল। গত মঙ্গলবার সন্ধ্যা ৬টার দিকে স্কুলছাত্রী লামিয়াকে তাদের এক ভাড়াটের কক্ষে দেখা যায়।
এরপর থেকে লামিয়াকে আর খোঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। প্রায় ৩০-৪০ গজ দুরে বাড়ির পাশে একটি পরিত্যাক্ত ঘরে তাকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে জবাই করা হয়। পরে রশি দিয়ে সেফটি ট্যাংকির ঢাকনায় লাশ বেধে পাশে শিমুলতলী খালের পানিতে ডুবিয়ে গুমের চেষ্টা করেছে তাদের বাড়ির ভাড়াটে সুমন। লুট করা হয় নিহতের গলায় থাকা স্বর্ণের চেইন, কানের দুল, পায়ের নুপুর ও হাতের আংটি। এদিকে লামিয়ার নিখোঁজের বিষয়টি জানাজানি হলে স্থানীয় লোকজন ও পরিবারের সদস্যরা আশপাশে খোঁজাখুজি করেও তাকে পাননি।
সবার সাথে লামিয়াকে খোঁজে বেড়ান তার খুনি সুমনও। এক পর্যায় ওই রাতেই তারা বাড়ির পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া শিমুলতলী খালের পানিতে খোঁজাখুজি করা হয়। এসময় ভাড়াটে সুমনও তাকে খোঁজতে ওই খালের পানিতে নেমে পড়েন। কিন্তু তিনি নিহতের লাশের উপর দাঁড়িয়ে লামিয়াকে খোঁজতে আসা লোকজনকে কৌশলে অন্য দিকে দেখতে বলেন। এভাবে কিছু সময় অতিবাহিত হওয়ার পর সন্দেহ হলে বাবা সাহেব আলী তার বাড়ির ভাড়াটে খুনি সুমনের পায়ের নিচে মেয়ের লাশ দেখতে পান।
পরে হত্যাকারী সন্দেহে সুমনকে আটক করে গণপিটুনি দিয়ে পুলিশে খবর দেয় এলাকাবাসী। খবর পেয়ে পুলিশ রাত সাড়ে ১১টার দিকে ঘটনাস্থলে গিয়ে সেফটি ট্যাংকির ঢাকনার সাথে বাধা জবাই করা লামিয়ার লাশ উদ্ধার করে। এ সময় তার শরীরে জামা থাকলেও পরণের পাজামা খুলা অবস্থায় ছিল। পরে ময়নাতদন্তের জন্য নিহতের লাশ গাজীপুর শহীদ তাজউদ্দিন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়েছে।
এ ঘটনায় বাড়ির ভাড়াটে সুমন মিয়াকে গ্রেপ্তার ও জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তার স্ত্রীকেও আটক করে পুলিশ। এসময় বাবা-মায়ের সাথে তাদের দেড় বছরের ছেলে আলিফও রয়েছে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, স্বার্ণালংকার লুট ও ধর্ষণের পর তাকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে। এ ঘটনায় ওই এলাকায় শোকের ছায়া নেমে আসে।
নিহতের মা শামীমা বেগম বলেন, তিন ছেলের পর শেষ বয়সে আমার একটা মেয়ে হয়েছিল। তাদের মধ্যে সে আদরের মেয়ে ছিল। সেই আদরের মেয়েকে ওরা খুন করে ফেলেছে। এ শোক আমি সইবো কি করে? নিহতের ভাই সুমন মিয়া জানান, ইন্ডিয়ান জিরা ব্যবসা করে এমন পরিচয় দিয়ে বাসা ভাড়া নেয় সুমন। এর মধ্যে ৬-৭ হাজার পাওনা টাকা নিয়ে তার সাথে আমাদের একটু জামেলা হয়েছিল। কিন্তু রাতে ছোট বোন লামিয়াকে পরিত্যাক্ত ঘরে নিয়ে জবাই করে খালের পানিতে ডুবিয়ে গুম করার চেষ্টা করেছে। আমার বোনের হত্যাকারীর দৃষ্টান্তমুলক শ^াস্তি চাই।
এদিকে এ ঘটনার খবর পেয়ে পরের দিন বুধবার সকালে গাজীপুরের পুলিশ সুপার শামসুন্নাহার, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জহিরুল ইসলাম, গাজীপুর পিবিআই ওসি সফিকুল ইসলাম, কালিয়াকৈর থানার ওসি মনোয়ার হোসেনসহ পিবিআই ও সিআইডি টিম ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। গাজীপুরের পুলিশ সুপার শামসুন্নাহার পিপিএম জানান, লামিয়া নামে চতুর্থ শ্রেণী ছাত্রীর গলাকাটা লাশ পাওয়া গেছে।
তাকে কি কারণে হত্যা করা হয়েছে? তা এখনো জানা যায়নি। তার কাপড়ের একটা অংশ খোলা ছিল এবং তার গায়ে স্বর্ণালংকারগুলো নিয়ে গেছে। তবে হত্যার আগে তাকে ধর্ষণ করা হয়েছে কিনা ডাক্তারী পরিক্ষা ছাড়া বলা যাচ্ছে না। এ ঘটনায় সুমন নামে একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এছাড়া গ্রেপ্তারকৃত সুমনের স্ত্রীকে আটক করে প্রাথমিকভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। এ বিষয়ে মামলার প্রস্তুতি চলছে।

আরও পড়ুন
কর্মসংস্থানের শর্তে মুচলেকা: সোনারগাঁয়ে মাদক ব্যবসা ছাড়লেন আরও এক ব্যবসায়ী
বগুড়ার কাহালুতে পুকুরের পানিতে ডুবে ভাই-বোনসহ তিন শিশুর মৃত্যু
মাদকসংক্রান্ত বিরোধে শ্যালককে রক্ষা করতে গিয়ে দুলাভাই নিহত, আহত ২