
রবিউল হাসান লায়ন , জামালপুর
জামালপুরের সরিষাবাড়ী উপজেলার বাউসী এলাকায় অবস্থিত মেসার্স স্বস্তিকা রাইসমিল দীর্ঘদিন ধরে কার্যক্রমহীন থাকলেও প্রতিষ্ঠানটির নামে সরকারি চাল সরবরাহ এবং সম্প্রতি ৬৪ টন ধান বরাদ্দ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে সরকারি খাদ্য সংগ্রহ কার্যক্রমে স্বচ্ছতা এবং খাদ্য বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভূমিকা নিয়ে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, একসময় রাইসমিল হিসেবে পরিচালিত প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে মূলত স্বস্তিকা ফ্লাওয়ার মিল হিসেবে কার্যক্রম চালাচ্ছে। একই সাইনবোর্ডে “স্বস্তিকা ফ্লাওয়ার অ্যান্ড রাইস মিল” লেখা থাকলেও রাইসমিলের কোনো কার্যক্রমের আলামত পাওয়া যায়নি। মিলের চাতাল দীর্ঘদিন ব্যবহৃত না হওয়ায় ভেঙে গেছে এবং সেখানে ঘাস জন্মেছে। ধান সেদ্ধ করার বয়লার অচল অবস্থায় পড়ে আছে। ধান ভেজানোর হাউজে মাছ চাষ করা হচ্ছে। গুদামে গম মজুত থাকলেও ধান বা চালের কোনো মজুত দেখা যায়নি। এছাড়া সচল যন্ত্রপাতি, শ্রমিক কিংবা চাল উৎপাদনের কোনো কার্যক্রমও চোখে পড়েনি।
স্থানীয় সূত্রের দাবি, মিলটির মালিক সমীর কুমার সাহা। বর্তমানে ফ্লাওয়ার মিল চালু থাকলেও রাইসমিলের নামে বিদ্যুৎ সংযোগ বহাল রয়েছে। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির নামে পুষ্টি চাল উৎপাদনের লাইসেন্সও রয়েছে বলে জানা গেছে।
অভিযোগ রয়েছে, চলতি সরকারি খাদ্য সংগ্রহ মৌসুমে এই মিলের নামে ২১ টন চাল সরকারি খাদ্য গুদামে সরবরাহ করা হয়েছে। এছাড়া সরকারি গুদামে চাল সরবরাহের উদ্দেশ্যে ৬৪ টন ধানও বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। তবে স্থানীয়দের দাবি, সরকারি গুদাম থেকে উত্তোলন করা ধান কখনোই ওই মিলে আনা হয়নি। ফলে দীর্ঘদিন কার্যক্রমহীন একটি রাইসমিল কীভাবে চাল সরবরাহ করেছে এবং নতুন করে বরাদ্দ পাওয়া ধান থেকে কীভাবে চাল উৎপাদন করবে—তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, জেলা ও উপজেলা খাদ্য বিভাগের কিছু অসাধু কর্মকর্তা এবং মিল মালিকদের যোগসাজশে বছরের পর বছর সরকারি খাদ্য সংগ্রহ কার্যক্রমে নানা অনিয়ম চলে আসছে। তাদের ভাষ্য, এসব অনিয়ম এখন যেন নিয়মে পরিণত হয়েছে।

তবে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন মেসার্স স্বস্তিকা রাইসমিলের মালিক সমীর কুমার সাহা। তিনি বলেন, “আমাদের প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের কোনো ভিত্তি নেই। সরকারের সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তি, বিদ্যমান আইন এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুসরণ করেই ধান সংগ্রহ, চাল উৎপাদন ও সরবরাহের সব কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়েছে। সরকারি বরাদ্দ ও চুক্তির শর্ত অনুযায়ী ধান সংগ্রহ এবং চাল সরবরাহ করা হয়েছে। এতে সরকার, সাধারণ মানুষ বা অন্য কোনো পক্ষের কোনো ক্ষতি হয়নি। আমাদের সব হিসাব-নিকাশ ও ব্যবসায়িক কার্যক্রম সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিয়ম-নীতির মধ্যেই পরিচালিত হয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, “অতীতে জামালপুরে একাধিক রাইসমিল চালু থাকলেও সময়ের ব্যবধানে অনেক প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে। বর্তমানে লাইসেন্স, সরকারি বরাদ্দ ও ব্যবসায়িক কার্যক্রম সরকারের নীতিমালা ও প্রশাসনিক তদারকির আওতায় পরিচালিত হচ্ছে।”
এ বিষয়ে জামালপুরের ভারপ্রাপ্ত জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মো. আসাদুজ্জামান খান বলেন, “সরিষাবাড়ী উপজেলায় ধান ক্রাশিংয়ের জন্য মিল নির্বাচন খাদ্য অধিদপ্তরের নীতিমালা অনুযায়ী করা হয়েছে। কোনো উপজেলায় পর্যাপ্ত অটোমিল না থাকলে কিংবা মিলমালিকরা সরকারি নির্ধারিত দরে ধান ক্রাশিংয়ে আগ্রহী না হলে পার্শ্ববর্তী উপজেলার মিল অথবা প্রয়োজনে অন্য জেলার মিলেও ধান ক্রাশিং করার সুযোগ রয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, “স্বস্তিকা রাইসমিলের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের কোনো ভিত্তি নেই। প্রতিষ্ঠানটির পুষ্টি চাল উৎপাদনের কার্যক্রম রয়েছে। অতিরিক্ত পরিবহন ব্যয় কমানো এবং ধান সংগ্রহ কার্যক্রম ব্যাহত না করতেই সংশ্লিষ্ট মিলের সঙ্গে চুক্তি করা হয়েছে। কৃষকদের স্বার্থ বিবেচনায় এবং সরিষাবাড়ীতে ধান সংগ্রহ নির্বিঘ্ন রাখতে পরবর্তীতে দুইটি মিলের মধ্যে বরাদ্দ ভাগ করে দেওয়া হয়েছে।”
এদিকে কার্যক্রমহীন একটি রাইসমিলের নামে সরকারি বরাদ্দ ও চাল সরবরাহের অভিযোগকে কেন্দ্র করে বিষয়টির নিরপেক্ষ তদন্ত এবং প্রকৃত ঘটনা উদঘাটনের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা। তাদের মতে, অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হলে সরকারি খাদ্য সংগ্রহ কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত হবে।

আরও পড়ুন
আত্রাইয়ে দুই ভ্যানের মুখোমুখি সংঘর্ষে এক গৃহবধূর পা বিচ্ছিন্ন
আড়ানী ডিগ্রি কলেজে ৩১টি নতুন ডেস্কটপ কম্পিউটার প্রদান
বগুড়ায় সাবেক ছাত্রদল নেতাকে কুপিয়ে হত্যা