হোম » মতামত » মুখোশের রাজনীতি: আত্মপ্রবঞ্চনা, আদর্শহীনতা ও বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংকট | শাহজাহান সিরাজ সবুজ

মুখোশের রাজনীতি: আত্মপ্রবঞ্চনা, আদর্শহীনতা ও বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংকট | শাহজাহান সিরাজ সবুজ

কমিউনিস্ট রাজনীতির সংকট: আদর্শ ও বাস্তবতার ব্যবধান
রাজনীতি কেবল রাষ্ট্রক্ষমতা অর্জনের একটি উপায় নয়, এটি একটি জাতির নৈতিক দিকনির্দেশনা, সামাজিক চেতনা এবং ভবিষ্যৎ নির্মাণের অন্যতম প্রধান মাধ্যম। যে রাজনীতি আদর্শ, আত্মসমালোচনা এবং জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতার ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়, সেই রাজনীতিই দীর্ঘমেয়াদে একটি জাতিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে। কিন্তু যখন রাজনীতি আদর্শের পরিবর্তে পরিচয়, ব্যক্তি বা ক্ষমতাকেন্দ্রিক হয়ে পড়ে, তখন সেখানে জন্ম নেয় মুখোশের রাজনীতি।

এই নিবন্ধে আমি যে মতামতগুলো তুলে ধরছি, সেগুলো কোনো ব্যক্তি বা সংগঠনকে অপমান করার উদ্দেশ্যে নয়। বরং বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতাকে একজন নাগরিকের দৃষ্টিকোণ থেকে মূল্যায়নের একটি প্রচেষ্টা। গণতান্ত্রিক সমাজে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি রাজনৈতিক দল ও মতাদর্শের আত্মসমালোচনাও সুস্থ রাজনীতির অপরিহার্য অংশ।

আমার মূল্যায়নে, বাংলাদেশে বর্তমানে কমিউনিস্ট পরিচয়ধারী একাধিক রাজনৈতিক সংগঠন থাকলেও প্রকৃত অর্থে এমন কোনো শক্তিশালী কমিউনিস্ট পার্টি গড়ে ওঠেনি, যা ধারাবাহিকভাবে মার্কসবাদী দর্শনের মৌলিক নীতি, সাংগঠনিক শৃঙ্খলা এবং শ্রমজীবী মানুষের রাজনীতিকে ধারণ ও চর্চা করছে। এটি একটি মতামত, যার সঙ্গে অনেকেই একমত নাও হতে পারেন। কিন্তু দীর্ঘ রাজনৈতিক পর্যবেক্ষণ আমাকে এই প্রশ্ন তুলতে বাধ্য করেছে।

কার্ল মার্কস, ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস এবং ভ্লাদিমির লেনিন যে রাজনৈতিক দর্শনের ভিত্তি নির্মাণ করেছিলেন, তার কেন্দ্রে ছিল শোষণমুক্ত সমাজ, শ্রেণিবৈষম্যের অবসান, শ্রমজীবী মানুষের রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন এবং আত্মসমালোচনাভিত্তিক সংগঠন। কিন্তু বাংলাদেশের বাস্তবতায় কমিউনিস্ট রাজনীতি বহুদিন ধরেই এক ভিন্ন চিত্র উপস্থাপন করছে। একই আদর্শের দাবিদার অসংখ্য সংগঠন, নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব, বিভক্তি এবং জনবিচ্ছিন্ন সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড—এসব মিলিয়ে সাধারণ মানুষের কাছে কমিউনিস্ট রাজনীতি একটি কার্যকর রাজনৈতিক বিকল্প হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায়নি।

একটি রাজনৈতিক আদর্শের শক্তি তার নামের মধ্যে নয়, তার কর্মের মধ্যে। কোনো দল তাদের নামের সঙ্গে “কমিউনিস্ট” শব্দ যুক্ত করলেই তারা কমিউনিস্ট হয়ে যায় না। আদর্শের সত্যতা যাচাই হয় সংগঠনের চরিত্র, রাজনৈতিক আচরণ, জনগণের সঙ্গে সম্পর্ক এবং নৈতিক অবস্থানের মাধ্যমে।

বাংলাদেশের বাম রাজনীতির ইতিহাস গৌরবময় সংগ্রামের স্মৃতিতে সমৃদ্ধ। ভাষা আন্দোলন, গণ-অভ্যুত্থান, শ্রমিক আন্দোলন, কৃষকের অধিকার এবং স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে বহু বামপন্থী নেতাকর্মীর অবদান ইতিহাসে লিপিবদ্ধ রয়েছে। সেই অবদান অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিন্তু অতীতের গৌরব বর্তমানের ব্যর্থতার বিকল্প হতে পারে না। একটি রাজনৈতিক সংগঠনকে তার ইতিহাসের পাশাপাশি বর্তমান কর্মক্ষমতা দিয়েও মূল্যায়ন করতে হয়।

আজ সাধারণ মানুষের একটি বড় অংশের কাছে কমিউনিস্ট রাজনীতি এমন একটি বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চায় পরিণত হয়েছে, যার সঙ্গে তাদের দৈনন্দিন জীবনের বাস্তব সমস্যার সংযোগ দুর্বল। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি কিংবা প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতির মতো প্রশ্নে জনগণের সঙ্গে নিবিড় রাজনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে ব্যর্থ হওয়ায় আদর্শের ভাষণ থাকলেও জনআস্থা তৈরি হয়নি।

আরও উদ্বেগের বিষয় হলো আত্মসমালোচনার অভাব। যে দর্শন নিজেই আত্মসমালোচনার গুরুত্ব শেখায়, সেই ধারার অনুসারীদের মধ্যেই মতপার্থক্য প্রায়ই নতুন চিন্তার পরিবর্তে নতুন বিভক্তির জন্ম দেয়। ফলে সংগঠন বাড়ে, কিন্তু শক্তি বাড়ে না; নেতৃত্ব বাড়ে, কিন্তু জনভিত্তি বাড়ে না।

আমার বিশ্বাস, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট রাজনীতির সবচেয়ে বড় সংকট প্রতিপক্ষ নয়; বরং নিজেদের ভেতরের আদর্শচ্যুতি, বিভক্তি এবং বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্নতা। জনগণের আস্থা ফিরে পেতে হলে কেবল মার্কস, এঙ্গেলস ও লেনিনের নাম উচ্চারণ করলেই হবে না, তাঁদের আত্মসমালোচনা, সাংগঠনিক শৃঙ্খলা এবং শ্রমজীবী মানুষের রাজনীতির চর্চা বাস্তবে ফিরিয়ে আনতে হবে।

অন্যথায় “কমিউনিস্ট” শব্দটি শুধু একটি রাজনৈতিক পরিচয় হিসেবেই থেকে যাবে; একটি জীবন্ত আদর্শ হিসেবে নয়।

ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলের সংকট: ধর্মের ব্যবহার, নৈতিকতা ও রাজনৈতিক বাস্তবতা
ইসলাম কেবল একটি ধর্ম নয়, এটি একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা। ন্যায়বিচার, সততা, জবাবদিহিতা, মানবিক মর্যাদা, দুর্নীতিবিরোধিতা, পরামর্শভিত্তিক শাসন এবং দুর্বল মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা—এসবই ইসলামের মৌলিক শিক্ষা। তাই যে রাজনৈতিক দল নিজেকে ইসলামভিত্তিক বলে দাবি করবে, তার প্রথম পরিচয় হওয়া উচিত নৈতিক চরিত্র, ন্যায়বিচারের প্রতি আপসহীন অবস্থান এবং ক্ষমতার চেয়ে সত্যকে অগ্রাধিকার দেওয়ার মানসিকতা।

কিন্তু বাংলাদেশের বাস্তবতা একটি কঠিন প্রশ্ন সামনে নিয়ে আসে। আমার মূল্যায়নে, দেশে এমন কোনো ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল এখনও গড়ে ওঠেনি, যারা ধারাবাহিকভাবে ইসলামের নৈতিক দর্শনকে আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার বাস্তবতার সঙ্গে সমন্বয় করে জনগণের সামনে একটি গ্রহণযোগ্য রাজনৈতিক বিকল্প হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছে। এটি একটি মতামত, যার সঙ্গে ভিন্নমত থাকা স্বাভাবিক। তবে দীর্ঘ রাজনৈতিক পর্যবেক্ষণ থেকে এই মূল্যায়নে পৌঁছেছি।

ধর্মের নামে রাজনীতি করা অন্যায় নয়। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে প্রত্যেক মতাদর্শেরই রাজনীতি করার অধিকার রয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো—যে রাজনীতি ইসলামের নামে পরিচালিত হচ্ছে, তার কর্ম, চরিত্র ও রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে ইসলামের ন্যায়বিচার, আমানতদারিতা, সত্যবাদিতা এবং মানবিকতার প্রতিফলন কতটা রয়েছে?

ধর্মীয় পরিচয় ব্যবহার করা সহজ, কিন্তু ধর্মীয় আদর্শ ধারণ করা কঠিন। একজন রাজনীতিক যদি দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বলেন অথচ নিজের সংগঠনের দুর্নীতি উপেক্ষা করেন, ন্যায়বিচারের কথা বলেন অথচ ভিন্নমতকে দমন করেন, কিংবা সত্যের পরিবর্তে রাজনৈতিক সুবিধাকে প্রাধান্য দেন, তাহলে তাঁর রাজনীতি ধর্মীয় পরিচয় বহন করলেও সেই রাজনীতি ইসলামের নৈতিক চেতনার প্রতিনিধিত্ব করে না।

বাংলাদেশের ধর্মভিত্তিক রাজনীতির আরেকটি বড় সংকট হলো ধর্মীয় আবেগ ও বাস্তব রাজনৈতিক কর্মসূচির মধ্যে ভারসাম্যের অভাব। অনেক ক্ষেত্রে মানুষের ধর্মীয় অনুভূতিকে রাজনৈতিক সমর্থনে রূপান্তরের চেষ্টা দেখা যায়। অথচ একটি কার্যকর রাজনৈতিক আন্দোলনের ভিত্তি হওয়া উচিত সুশাসনের পরিকল্পনা, দুর্নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান, কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতা এবং নাগরিক অধিকার রক্ষার সুস্পষ্ট রূপরেখা।

মানুষ শুধু ধর্মীয় স্লোগান শুনতে চায় না, মানুষ জানতে চায় তাদের জীবন কীভাবে বদলাবে। একটি রাজনৈতিক দল জনগণের আস্থা অর্জন করে তার কর্মসূচি, নেতৃত্বের সততা এবং বাস্তব কাজের মাধ্যমে—শুধু পরিচয়ের মাধ্যমে নয়।

আরও একটি বিষয় লক্ষণীয়। ধর্মভিত্তিক রাজনীতির দাবিদার বিভিন্ন সংগঠনও নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব, বিভক্তি এবং পারস্পরিক বিরোধ থেকে মুক্ত থাকতে পারেনি। ফলে সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন জাগে—যারা নিজেরাই দীর্ঘস্থায়ী ঐক্য গড়ে তুলতে ব্যর্থ, তারা রাষ্ট্র পরিচালনায় কতটা সফল হবে?

ইসলাম মানুষকে অহংকার নয়, বিনয় শেখায়, প্রতিশোধ নয়, ন্যায়বিচার শেখায়, ক্ষমতার লোভ নয়, আমানতের দায়িত্ব শেখায়। তাই যে রাজনৈতিক চর্চায় আত্মসমালোচনার পরিবর্তে কেবল প্রতিপক্ষকে দোষারোপ করা হয়, সেখানে আদর্শের চেয়ে ক্ষমতার প্রতিযোগিতাই বেশি স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

আমার কাছে সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, বাংলাদেশের রাজনীতিতে “ইসলাম” শব্দটি যত সহজে উচ্চারিত হয়, “ইনসাফ”, “আমানতদারিতা”, “জবাবদিহিতা” এবং “নৈতিক সাহস” শব্দগুলো ততটা গুরুত্ব পায় না। অথচ ইসলামের রাজনৈতিক দর্শনের কেন্দ্রবিন্দুতেই রয়েছে এই মূল্যবোধগুলো।

ইতিহাসের শিক্ষা স্পষ্ট—ধর্মীয় আবেগ দিয়ে সাময়িক সমর্থন অর্জন করা সম্ভব, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে মানুষের বিশ্বাস অর্জন করা যায় কেবল সততা, ন্যায়বিচার, আত্মত্যাগ এবং ধারাবাহিক নৈতিক নেতৃত্বের মাধ্যমে। তাই নামের আগে “ইসলামিক” বা অন্য কোনো ধর্মীয় পরিচয় যুক্ত করলেই একটি দল আদর্শের প্রকৃত প্রতিনিধি হয়ে ওঠে না। পরিচয়ের সত্যতা প্রমাণিত হয় কর্মে, চরিত্রে এবং জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতায়।

গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল, দেশপ্রেমিক নেতৃত্ব ও নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রয়োজনীয়তা
বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংকটের জন্য শুধু একটি বা দুটি রাজনৈতিক ধারাকে দায়ী করলে বাস্তবতার পূর্ণ চিত্র পাওয়া যায় না। কমিউনিস্ট রাজনীতির সীমাবদ্ধতা যেমন আছে, তেমনি ধর্মভিত্তিক রাজনীতিরও নানা সংকট রয়েছে। একইভাবে প্রচলিত গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলগুলোরও আত্মসমালোচনার যথেষ্ট কারণ আছে। কারণ সংকট মূলত কোনো একক দলের নয়, এটি আমাদের সামগ্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতির সংকট।

আজ এমন এক বাস্তবতা তৈরি হয়েছে, যেখানে ব্যক্তি অনেক সময় আদর্শের চেয়ে বড় হয়ে ওঠে, দল সত্যের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে যায় এবং অন্ধ আনুগত্য যুক্তিকে পরাজিত করে। ফলে ভিন্নমতকে গণতান্ত্রিক শক্তি হিসেবে গ্রহণ করার পরিবর্তে প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখা হয়। এই প্রবণতা গণতন্ত্রকে দুর্বল করে এবং রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোকে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার অংশে পরিণত করে।

তবে একটি বিষয় স্বীকার করা প্রয়োজন। প্রচলিত গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলগুলো অন্তত নিজেদের রাজনৈতিক পরিচয় গোপন করে না। তারা নিজেদের যে আদর্শে বিশ্বাস করে, সেই পরিচয় নিয়েই জনগণের সামনে আসে। তাদের নীতির সঙ্গে দ্বিমত থাকা স্বাভাবিক, কিন্তু তারা সাধারণত এমন কোনো আদর্শের দাবি করে না, যা তারা নিজেদের রাজনৈতিক পরিচয়ের অংশ হিসেবে অস্বীকার করে। এই দিক থেকে আদর্শের নামে রাজনীতি করে ভিন্ন বাস্তবতা চর্চা করার চেয়ে তাদের অবস্থান তুলনামূলকভাবে স্পষ্ট।

কিন্তু স্পষ্ট পরিচয় থাকলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। গণতন্ত্র কেবল নির্বাচন নয়, এটি আইনের শাসন, জবাবদিহিতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, বিরোধী মতের প্রতি সহনশীলতা এবং শক্তিশালী রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। যে গণতন্ত্রে ক্ষমতা রাষ্ট্রের ওপরে স্থান পায়, সেখানে গণতন্ত্র ধীরে ধীরে আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত হয়।

আজ বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন আরেকটি নতুন রাজনৈতিক দল নয়, বরং একটি নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি। এমন একটি সংস্কৃতি, যেখানে নেতৃত্ব ব্যক্তি-নির্ভর হবে না, নীতি-নির্ভর হবে, যেখানে সমালোচনা শত্রুতা হিসেবে বিবেচিত হবে না, যেখানে আত্মসমালোচনাকে দুর্বলতা নয়, শক্তি হিসেবে দেখা হবে, এবং যেখানে জনগণের স্বার্থ দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে স্থান পাবে।

একই সঙ্গে দেশপ্রেমের অর্থও নতুনভাবে অনুধাবন করা প্রয়োজন। দেশপ্রেম মানে কেবল আবেগ নয়, রাষ্ট্রের আইনকে সম্মান করা, দুর্নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া, নাগরিকের অধিকার রক্ষা করা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র গড়ে তোলার দায়িত্ব গ্রহণ করা। যে রাজনীতি জনগণকে বিভক্ত করে, ঘৃণা ছড়ায় বা ক্ষমতাকে একমাত্র লক্ষ্য বানায়, তাকে প্রকৃত অর্থে দেশপ্রেমিক রাজনীতি বলা কঠিন।

আমাদের রাজনীতিবিদদের পাশাপাশি শিক্ষক, সাংবাদিক, লেখক, বুদ্ধিজীবী এবং সচেতন নাগরিকদেরও দায়িত্ব রয়েছে। সত্যকে দলীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে বিচার করলে একটি সমাজ কখনো সুস্থ হতে পারে না। নিজের দলের অন্যায়কে অন্যায় বলা এবং প্রতিপক্ষের সঠিক কাজকে স্বীকার করার নৈতিক সাহসই একটি গণতান্ত্রিক সমাজের অন্যতম ভিত্তি।

আমরা যদি সত্যিই একটি পরিবর্তিত বাংলাদেশ চাই, তাহলে নতুন মুখের চেয়ে নতুন রাজনৈতিক চরিত্রের প্রয়োজন বেশি। নতুন স্লোগানের চেয়ে নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রয়োজন বেশি। নতুন জোটের চেয়ে প্রয়োজন সততা, জবাবদিহিতা, নৈতিক নেতৃত্ব এবং জনগণের প্রতি প্রকৃত দায়বদ্ধতা।

ইতিহাস ব্যক্তি বা দলের নাম দিয়ে বিচার করে না, বিচার করে তাদের চরিত্র, কর্ম এবং জনগণের জন্য রেখে যাওয়া অবদানের মাধ্যমে। তাই বাংলাদেশের রাজনীতির ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে আমরা মুখোশের রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আদর্শ, ন্যায়বিচার, গণতন্ত্র এবং দেশপ্রেমভিত্তিক একটি নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তুলতে পারি কি না।

প্রশ্নটি তাই আজও আমাদের সামনে রয়ে গেছে—আমরা কি আদর্শের রাজনীতি করব, নাকি আদর্শের মুখোশ পরে ক্ষমতার রাজনীতি চালিয়ে যাব? এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে বাংলাদেশের আগামী দিনের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ।

লেখক: কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।

শেয়ার করুন আপনার পছন্দের সোশ্যাল মিডিয়ায়
error: Content is protected !!