হোম » মতামত » স্বাধীনতার অবমূল্যায়ন: শ্রেণিতত্ত্বের আড়ালে ইতিহাস অস্বীকারের রাজনীতি

স্বাধীনতার অবমূল্যায়ন: শ্রেণিতত্ত্বের আড়ালে ইতিহাস অস্বীকারের রাজনীতি

শাহজাহান সিরাজ সবুজ

বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে কেবল “মানচিত্রের স্বাধীনতা” বলে খাটো করার প্রবণতা নতুন কোনো চিন্তা নয়; এটি দীর্ঘদিন ধরে কিছু রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক ধারার মধ্যে ঘুরে ফিরে আসা এক ধরনের একপাক্ষিক ব্যাখ্যা। এই ব্যাখ্যার মূল দাবি হলো— রাজনৈতিক স্বাধীনতা কেবল একটি ভূখণ্ডগত ঘটনা, প্রকৃত মুক্তি আসে অর্থনৈতিক কাঠামোর পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে। ফলে বলা হয়, আমরা স্বাধীন দেশের নাগরিক হলেও প্রকৃত অর্থে মুক্ত নই, কারণ সমাজে শ্রেণি শোষণ ও অর্থনৈতিক বৈষম্য বিদ্যমান। বাহ্যিকভাবে এই যুক্তি আকর্ষণীয় মনে হলেও এর ভেতরে একটি গুরুতর সমস্যা আছে— এটি ইতিহাসের একটি অংশকে পুরো সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চায় এবং জাতির মুক্তির সংগ্রামের রাজনৈতিক ভিত্তিকে উপেক্ষা করে।

প্রথমেই স্বাধীনতার প্রকৃত অর্থ বোঝা জরুরি। স্বাধীনতা কেবল কোনো ভূখণ্ডের নাম, পতাকার রঙ বা মানচিত্রের সীমারেখা নয়। স্বাধীনতা হলো একটি জাতির রাজনৈতিক সার্বভৌমত্ব, অর্থাৎ নিজের ভবিষ্যৎ নিজে নির্ধারণ করার ক্ষমতা। একটি জাতি কার অধীনে থাকবে, তার আইন কী হবে, সম্পদ কীভাবে বণ্টিত হবে, রাষ্ট্রীয় নীতি কী হবে— এসব সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা যখন জনগণের হাতে থাকে, তখনই তাকে স্বাধীন রাষ্ট্র বলা হয়। এই রাজনৈতিক ক্ষমতাই অর্থনৈতিক নীতি নির্ধারণের ভিত্তি তৈরি করে। তাই স্বাধীনতাকে কেবল অর্থনীতির চোখে দেখার চেষ্টা বাস্তবতার সংকীর্ণ ব্যাখ্যা।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাস এই সত্যকে আরও স্পষ্ট করে তোলে। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ কোনো একমাত্রিক অর্থনৈতিক আন্দোলন ছিল না। পূর্ব বাংলার জনগণ দীর্ঘদিন অর্থনৈতিক বৈষম্যের শিকার ছিল, কিন্তু সেই বৈষম্যের মূল উৎস ছিল রাজনৈতিক পরাধীনতা। রাষ্ট্রক্ষমতা পশ্চিম পাকিস্তানের হাতে কেন্দ্রীভূত ছিল, এবং পূর্ব বাংলার জনগণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া থেকে কার্যত বিচ্ছিন্ন ছিল। কর তারা দিত, উৎপাদন তারা করত, কিন্তু সম্পদের নিয়ন্ত্রণ ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত অন্যরা নিত। অর্থাৎ অর্থনৈতিক শোষণ ছিল রাজনৈতিক কাঠামোরই ফল।

মুক্তিযুদ্ধ তাই কেবল আয়ের বৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াই ছিল না; এটি ছিল একটি জাতির অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রাম। ভাষা, সংস্কৃতি, পরিচয় এবং রাজনৈতিক অধিকার— সবকিছুর উপর যখন আঘাত আসে, তখন আন্দোলন কেবল অর্থনৈতিক দাবিতে সীমাবদ্ধ থাকে না। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান এবং ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ একই ধারাবাহিকতার ভিন্ন ভিন্ন পর্যায়। প্রতিটি পর্যায়ে মূল প্রশ্ন ছিল— বাঙালি জাতি নিজের ভাগ্য নিজে নির্ধারণ করতে পারবে কি না।

যারা স্বাধীনতাকে “মানচিত্রের স্বাধীনতা” বলে অবজ্ঞা করেন, তারা একটি মৌলিক বিষয় উপেক্ষা করেন— রাষ্ট্র ছাড়া অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার কেবল একটি বিমূর্ত ধারণা। কারণ রাষ্ট্রই নির্ধারণ করে অর্থনীতি কীভাবে চলবে, সম্পদ কার হাতে থাকবে, এবং কোন নীতির মাধ্যমে সমাজ পরিচালিত হবে। রাজনৈতিক ক্ষমতা ছাড়া অর্থনৈতিক পরিবর্তন দাবি করা মানে এমন একটি ফল চাওয়া, যার জন্য প্রয়োজনীয় গাছের অস্তিত্বই নেই।

শ্রেণিতত্ত্বের গুরুত্ব অস্বীকার করার সুযোগ নেই। সমাজে ধনী–গরিব বিভাজন, সম্পদের অসম বণ্টন এবং ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ বাস্তব সত্য। কিন্তু এই বাস্তবতা থেকে এমন সিদ্ধান্ত টানা যে জাতীয় স্বাধীনতা গৌণ, তা যুক্তিগতভাবে দুর্বল। কারণ শ্রেণি সম্পর্ক কখনোই রাজনৈতিক কাঠামো থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। রাষ্ট্রক্ষমতা কার হাতে থাকবে, সেটিই শেষ পর্যন্ত শ্রেণি সম্পর্কের গতিপথ নির্ধারণ করে। তাই রাজনৈতিক স্বাধীনতাকে বাদ দিয়ে শ্রেণি বিশ্লেষণ সম্পূর্ণ হয় না; বরং তা অসম্পূর্ণ থাকে।

বিশ্ব ইতিহাসও এই বাস্তবতার সাক্ষ্য দেয়। ভারত, ভিয়েতনাম, আলজেরিয়া কিংবা আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ— কোথাওই জাতিগুলো বলেনি যে আগে শ্রেণি বৈষম্য দূর হবে, তারপর স্বাধীনতা আসবে। বরং তারা বুঝেছিল, উপনিবেশিক বা পরাধীন অবস্থায় থেকে অর্থনৈতিক মুক্তি অর্জন করা সম্ভব নয়। প্রথমে রাজনৈতিক স্বাধীনতা অর্জন করতে হয়েছে, এরপর শুরু হয়েছে অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংস্কারের দীর্ঘ সংগ্রাম। অর্থাৎ স্বাধীনতা ছিল পথের শুরু, শেষ নয়।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও একই সত্য প্রযোজ্য। আজ আমরা যে রাষ্ট্রীয় কাঠামোর মধ্যে কথা বলতে পারি, সমালোচনা করতে পারি, আন্দোলন করতে পারি— এগুলো সবই রাজনৈতিক স্বাধীনতার ফল। এই স্বাধীনতা না থাকলে কোনো নাগরিক অধিকার, কোনো সাংবিধানিক সুরক্ষা বা কোনো সামাজিক আন্দোলনের সুযোগ থাকত না। যারা স্বাধীনতাকে তুচ্ছ করে দেখেন, তারা আসলে সেই স্বাধীনতার প্রদত্ত অধিকার ব্যবহার করেই স্বাধীনতার বিরোধিতা করেন— যা এক ধরনের আত্মবিরোধিতা।

এখানে আরেকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। বলা হয়, আমরা স্বাধীন দেশের নাগরিক কিন্তু মুক্ত মানুষ নই। এই বক্তব্য আংশিকভাবে বাস্তব, কারণ অর্থনৈতিক বৈষম্য ও সামাজিক অন্যায় এখনো বিদ্যমান। কিন্তু এই বাস্তবতা স্বাধীনতার অপ্রয়োজনীয়তা প্রমাণ করে না; বরং প্রমাণ করে যে স্বাধীনতার প্রকৃত চেতনা এখনও পূর্ণভাবে বাস্তবায়িত হয়নি। স্বাধীনতা অর্জন মানে সমস্যার সমাপ্তি নয়; বরং সমস্যার বিরুদ্ধে লড়াইয়ের রাজনৈতিক সুযোগ সৃষ্টি হওয়া।

একটি পরাধীন সমাজে মানুষ রাষ্ট্রকে প্রশ্ন করতে পারে না, অধিকার দাবি করতে পারে না, বা নীতিগত পরিবর্তনের জন্য সংগঠিত হতে পারে না। কিন্তু একটি স্বাধীন রাষ্ট্রে এসব সুযোগ বিদ্যমান। তাই স্বাধীনতা নিছক প্রতীক নয়; এটি রাজনৈতিক সম্ভাবনার ক্ষেত্র। এই ক্ষেত্রের ভেতরেই অর্থনৈতিক মুক্তির সংগ্রাম গড়ে ওঠে।

অতএব স্বাধীনতা ও অর্থনৈতিক মুক্তি পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়; বরং পরিপূরক। স্বাধীনতা হলো ভিত্তি, আর অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার সেই ভিত্তির উপর নির্মিত সমাজের লক্ষ্য। ভিত্তি ছাড়া কোনো কাঠামো দাঁড়াতে পারে না, আবার কাঠামো ছাড়া ভিত্তির কোনো অর্থ থাকে না। এই দ্বৈত সম্পর্ক অস্বীকার করাই বিভ্রান্তির মূল উৎস।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ আমাদের শিখিয়েছে, স্বাধীনতা কেবল মানচিত্র নয়— এটি একটি জাতির আত্মমর্যাদার ঘোষণা। সেই আত্মমর্যাদাকে “শ্রেণিতত্ত্বের” নামে খাটো করা যেমন রাজনৈতিকভাবে দুর্বল, তেমনি ইতিহাসের দিক থেকেও অসম্পূর্ণ। কারণ ইতিহাস কখনো একমাত্রিক ব্যাখ্যা গ্রহণ করে না; এটি বহুমাত্রিক বাস্তবতার সমন্বয়।

শেষ পর্যন্ত সত্য হলো— স্বাধীনতা কোনো চূড়ান্ত গন্তব্য নয়, কিন্তু স্বাধীনতা ছাড়া কোনো গন্তব্যেই পৌঁছানো সম্ভব নয়। তাই স্বাধীনতাকে অস্বীকার করে মুক্তির রাজনীতি প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা আসলে ইতিহাসের অর্ধেককে পুরো সত্য হিসেবে উপস্থাপনের একটি বুদ্ধিবৃত্তিক বিভ্রান্তি।

লেখক: কবি, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

শেয়ার করুন আপনার পছন্দের সোশ্যাল মিডিয়ায়
error: Content is protected !!