
শাহজাহান সিরাজ সবুজ
সংবিধান—শব্দটা শুনলেই অনেকের মনে এক ধরনের পবিত্রতার অনুভূতি তৈরি হয়। আমার মনেও ঠিক একই অনুভূতি কাজ করে। যেন এটি এমন এক চূড়ান্ত দলিল, যা ন্যায়, সমতা এবং মানুষের মৌলিক অধিকারের নিশ্চয়তা দেয়। কিন্তু একটু গভীরে গেলেই প্রশ্নটা সামনে এসে দাঁড়ায়—এই সংবিধান আসলে কার জন্য? কাদের হাতে এটি তৈরি, আর কাদের স্বার্থ রক্ষার জন্য এর কাঠামো দাঁড়িয়ে আছে? কারণ কোনো দলিলই শূন্যে তৈরি হয় না; এর পেছনে থাকে নির্দিষ্ট শক্তি, শ্রেণি ও ক্ষমতার প্রভাব। তাই সংবিধানকে শুধু পবিত্রতার চোখে দেখলেই চলবে না। বরং বোঝার চেষ্টা করতে হবে—এটি কতটা সবার প্রতিনিধিত্ব করে, আর কতটা নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর স্বার্থকে প্রাধান্য দেয়। এখানেই মূল প্রশ্ন, এখানেই ভাবনার জায়গা।
সংবিধানকে সাধারণত রাষ্ট্রের মূল ভিত্তি হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। বলা হয়, এটি নাগরিকের অধিকার রক্ষা করে, ক্ষমতার ভারসাম্য নিশ্চিত করে এবং শাসকদের সীমার মধ্যে রাখে। কিন্তু বাস্তবতা সবসময় এই আদর্শিক বর্ণনার সঙ্গে মেলে না। ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, অধিকাংশ সংবিধানই তৈরি হয়েছে সেই শ্রেণির দ্বারা, যারা ইতোমধ্যেই রাষ্ট্রের ক্ষমতা ও সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে।
এই ক্ষমতাসীন শ্রেণি—যাদের আমরা বুর্জোয়া বা পেটি-বুর্জোয়া বলি—তারা কখনোই নিজেদের স্বার্থের বিরুদ্ধে কোনো কাঠামো দাঁড় করায় না। বরং তারা এমন এক ব্যবস্থাই তৈরি করে, যা তাদের আধিপত্যকে দীর্ঘস্থায়ী করে এবং সেটিকে বৈধতা দেয়। সংবিধান তখন শুধু একটি আইনগত দলিল নয়, বরং একটি রাজনৈতিক হাতিয়ার হয়ে ওঠে—যার মাধ্যমে শাসনকে ‘ন্যায্য’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়।
এখানেই মূল দ্বন্দ্বটি তৈরি হয়।
একদিকে সংবিধানে লেখা থাকে সমতা, স্বাধীনতা, ন্যায়বিচার—অন্যদিকে বাস্তব জীবনে দেখা যায় বৈষম্য, বঞ্চনা এবং ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ। এই দ্বৈততা কোনো দুর্ঘটনা নয়; বরং এটি একটি সুপরিকল্পিত বাস্তবতা। সংবিধানের ভাষা যতই সুন্দর হোক, সেটি কার্যকর হয় সেই কাঠামোর মধ্যেই, যেখানে ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ আগে থেকেই নির্দিষ্ট কিছু গোষ্ঠীর হাতে কেন্দ্রীভূত।
শ্রমজীবী ও সাধারণ মানুষের জন্য সংবিধান কী দেয়—এই প্রশ্নটি তাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
কাগজে তাদের অধিকার স্বীকৃত থাকলেও, সেই অধিকার প্রয়োগের বাস্তব ক্ষমতা তাদের হাতে থাকে না। উদাহরণ হিসেবে ধরা যেতে পারে—ন্যায্য মজুরি, কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্যসেবা বা শিক্ষার অধিকার। এসব বিষয় সংবিধানে উল্লেখ থাকতে পারে, কিন্তু বাস্তবে এগুলোর প্রাপ্তি নির্ভর করে অর্থনৈতিক ও সামাজিক শক্তির ওপর, যা সাধারণ মানুষের হাতে থাকে না।
ফলে সংবিধান এক ধরনের প্রতিশ্রুতির দলিল হয়ে দাঁড়ায়, যা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বারবার ব্যর্থ হয়। এটি এমন এক কাঠামো, যেখানে মানুষের আশা জাগিয়ে তোলা হয়, কিন্তু সেই আশার বাস্তব রূপ দিতে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনা হয় না। এর ফলে একটি ভ্রান্ত ধারণা তৈরি হয়—যে, সমস্যার সমাধান সংবিধানের মধ্যেই নিহিত, যদিও বাস্তবে সমস্যার মূল কারণটি রয়ে যায় অক্ষত।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—সংবিধান শাসনব্যবস্থাকে একটি নৈতিক ভিত্তি দেয়। এটি এমনভাবে উপস্থাপন করা হয় যেন রাষ্ট্র যা করছে, তা আইনের শাসনের মধ্যেই হচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, আইন কাদের দ্বারা তৈরি এবং কাদের স্বার্থে প্রয়োগ হচ্ছে? যদি আইন তৈরির প্রক্রিয়াই একটি নির্দিষ্ট শ্রেণির নিয়ন্ত্রণে থাকে, তাহলে সেই আইন কতটা নিরপেক্ষ হতে পারে?
এই প্রেক্ষাপটে সংবিধান অনেক সময় শোষণের একটি মার্জিত রূপে পরিণত হয়। সরাসরি দমন-পীড়নের বদলে, এখানে শাসনকে একটি গ্রহণযোগ্য কাঠামোর মধ্যে রাখা হয়, যাতে সাধারণ মানুষ সেটিকে সহজেই মেনে নেয়। এটি এমন এক প্রক্রিয়া, যেখানে বৈষম্যকে লুকিয়ে রাখা হয় আইনের ভাষায়, আর শোষণকে বৈধতা দেওয়া হয় নিয়ম ও বিধির মাধ্যমে।
তাই সংবিধানকে ঘিরে অন্ধ ভক্তি বা অতিরঞ্জিত বিশ্বাস দেখানো বাস্তবতাকে আড়াল করার শামিল। সংবিধান অবশ্যই একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল, কিন্তু এটিকে চূড়ান্ত সমাধান হিসেবে দেখানো একটি বড় ধরনের ভুল। এটি কোনো জাদুর কাঠি নয়, যা সমাজের সব সমস্যার সমাধান করে দিতে পারে।
বাস্তব পরিবর্তন আসে তখনই, যখন ক্ষমতার ভারসাম্যে পরিবর্তন ঘটে। যখন সাধারণ মানুষ সংগঠিত হয়, নিজেদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হয় এবং সেই অধিকার আদায়ের জন্য লড়াই করে। সংবিধান তখন একটি সহায়ক কাঠামো হতে পারে, কিন্তু মূল চালিকা শক্তি নয়।
মানুষের জীবনের মৌলিক প্রশ্নগুলো—খাদ্য, বাসস্থান, চিকিৎসা, শিক্ষা, ন্যায্য মজুরি, নিরাপত্তা—এসব যদি নিশ্চিত না হয়, তাহলে সংবিধানের ভাষা যতই চমৎকার হোক, তা বাস্তবে অর্থহীন হয়ে পড়ে। কারণ অধিকার শুধু কাগজে লিখে দিলেই তা বাস্তবায়িত হয় না; এর জন্য প্রয়োজন কার্যকর কাঠামো, রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং সামাজিক ন্যায্যতার প্রতি প্রতিশ্রুতি।
সুতরাং, সংবিধানকে কেন্দ্র করে রাজনীতি করার আগে এই মৌলিক প্রশ্নগুলো তোলা জরুরি। এটি কি সত্যিই মানুষের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনছে, নাকি কেবল একটি প্রতীকী কাঠামো হিসেবে টিকে আছে? এটি কি শোষণ কমাচ্ছে, নাকি শোষণকে আরও সূক্ষ্ম ও গ্রহণযোগ্য করে তুলছে?
শেষ পর্য, সংবিধানকে বুঝতে হলে এটিকে একটি নিরপেক্ষ বা পবিত্র দলিল হিসেবে না দেখে, একটি রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটের মধ্যে বিশ্লেষণ করতে হবে। এর সীমাবদ্ধতা স্বীকার করেই এর সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হবে। না হলে, সংবিধানকে ঘিরে যে আশা তৈরি করা হয়, তা কেবল হতাশার কারণ হয়ে দাঁড়াবে।
বাস্তবতা হলো—পরিবর্তন আসে সংগ্রামের মধ্য দিয়ে, চেতনার বিকাশের মধ্য দিয়ে, এবং ক্ষমতার কাঠামোকে প্রশ্নবিদ্ধ করার মধ্য দিয়ে। সংবিধান সেই প্রক্রিয়ার একটি অংশ হতে পারে, কিন্তু কখনোই পুরো প্রক্রিয়াটির বিকল্প নয়। তাই সংবিধানকে ঘিরে আবেগ নয়, প্রয়োজন সমালোচনামূলক দৃষ্টিভঙ্গি—যা আমাদের সত্যের কাছাকাছি নিয়ে যাবে, এবং প্রকৃত পরিবর্তনের পথ খুলে দেবে।
লেখক: কবি, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।

আরও পড়ুন
মুখোশের রাজনীতি: আত্মপ্রবঞ্চনা, আদর্শহীনতা ও বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংকট | শাহজাহান সিরাজ সবুজ
কৃষক মরছে কীটনাশকে
স্বাধীনতার অবমূল্যায়ন: শ্রেণিতত্ত্বের আড়ালে ইতিহাস অস্বীকারের রাজনীতি