
গণতন্ত্রের শক্তি নিহিত থাকে আইনের শাসন ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতায়। যেখানে মানুষ ভয়ের বশবর্তী না হয়ে তার মতামত প্রকাশ করতে পারে, সেখানেই প্রকৃত গণতন্ত্র বিকশিত হয়। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে আমরা এমন কিছু উদ্বেগজনক ঘটনা প্রত্যক্ষ করছি, যা এ মৌলিক অধিকারকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। মুক্তিযোদ্ধা ফজলুর রহমানের বিরুদ্ধে সংগঠিত মব হিংসার প্রচেষ্টা তারই নির্মম উদাহরণ। একজন মুক্তিযোদ্ধা, যিনি দেশের স্বাধীনতার জন্য জীবন বাজি রেখেছিলেন, তাকে আজ ভিন্নমত প্রকাশের জন্য হুমকির মুখে পড়তে হচ্ছে—এটি শুধু ব্যক্তির ওপর আঘাত নয়, বরং জাতির মুক্তচিন্তা ও গণতান্ত্রিক চেতনার ওপর সরাসরি আঘাত।
মব জাস্টিস কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি গণতন্ত্রের মূল শত্রু। যখন ব্যক্তি বা গোষ্ঠী আইনকে পাশ কাটিয়ে নিজেদের হাতে বিচার নেওয়ার চেষ্টা করে, তখন তারা কেবল ন্যায়বিচারকে অস্বীকার করে না, পুরো সমাজের স্থিতিশীলতাকে বিপন্ন করে। এ ধরনের কর্মকাণ্ড একটি ভয়ঙ্কর বার্তা দেয়—কেউ ভিন্নমত পোষণ করলে তার নিরাপত্তা আর নিশ্চিত নয়। ফলে নাগরিকেরা ভীত হয়ে পড়ে, চিন্তা ও মতপ্রকাশে সংযম আরোপ করে, আর এই ভয়ই ধীরে ধীরে গণতন্ত্রকে মৃত করে দেয়।
আমাদের বুঝতে হবে, মতের ভিন্নতা গণতন্ত্রের শত্রু নয়; বরং তা গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করে। ভিন্নমতকে সহিংসতার মাধ্যমে দমন করার চেষ্টা কেবল স্বল্পদৃষ্টিসম্পন্নতা নয়, বরং তা এক প্রকার আত্মঘাতী মনোভাব। কারণ আজ অন্যের মতপ্রকাশ দমন করতে যে সহিংসতা ব্যবহার হচ্ছে, আগামীকাল সেটিই আমাদের ওপর ভর করবে। স্বাধীন মতপ্রকাশকে দমন করার মানে হলো সমাজকে অন্ধকারে ঠেলে দেওয়া, যেখানে শুধু একমুখী চিন্তাধারা প্রাধান্য পায়, আর ভিন্নমতকারীরা নিশ্চুপ হয়ে যায়।
এ পরিস্থিতিতে একমাত্র ভরসা হতে পারে আইনের শাসন। আইনের কাছে যাওয়াই সভ্য সমাজের বৈশিষ্ট্য। কেউ যদি সত্যিই মনে করে কোনো বক্তব্য সমাজের জন্য ক্ষতিকর, তার সমাধান আদালত দিতে পারে। আইন কেবল অপরাধীকে শাস্তি দেয় না, এটি নাগরিককে আশ্বস্ত করে যে তার অধিকার সুরক্ষিত। আইনকে উপেক্ষা করে মব জাস্টিসের আশ্রয় নেওয়া মানে হলো বিশৃঙ্খলার দুয়ার খুলে দেওয়া।
তাই আজ সময় এসেছে এই প্রবণতার বিরুদ্ধে একযোগে দাঁড়ানোর। সরকার, প্রশাসন, নাগরিক সমাজ—সবাইকে বুঝতে হবে, মব জাস্টিসকে প্রশ্রয় দেওয়া মানে গণতন্ত্রকে কবর দেওয়া। মুক্তিযোদ্ধা ফজলুর রহমানের ঘটনা আমাদের জন্য এক কঠিন সতর্কবার্তা। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা কেবল ভৌগোলিক স্বাধীনতা নয়; এটি চিন্তার স্বাধীনতা, মতের স্বাধীনতা। আমরা যদি এই স্বাধীনতাকে রক্ষা করতে ব্যর্থ হই, তবে মুক্তিযুদ্ধের অর্জনকে নিজেরাই কলঙ্কিত করব।
এখন আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে—আমরা কি আইনের শাসন, মানবাধিকার ও বাকস্বাধীনতার পক্ষে দাঁড়াব, নাকি সহিংস জনতার হাতে গণতন্ত্রকে ধ্বংস হতে দেখব? ইতিহাস সাক্ষী থাকবে, আমরা কোন পথ বেছে নিয়েছিলাম।
লেখক: শাহজাহান সিরাজ সবুজ,
কলামিস্ট ও সাংবাদিক।

আরও পড়ুন
ব্যবসাবান্ধব ও জনকল্যাণমুখী বাজেটই টেকসই অর্থনীতির রূপরেখা
“অসংক্রামক রোগের ঝুঁকি কমাতে তামাকপণ্যের উপর কর বৃদ্ধির প্রস্তাব চিকিৎসকদের”
কোটি টাকার যুগে এক হাজার টাকার নোট এখন অনেকটাই অপ্রতুল মনে হচ্ছে