
মোঃ মনিরুল ইসলাম
ব্রিটেনের ইকনোমিক সেক্রেটারি টু দি ট্রেজারি অ্যান্ড সিটি মিনিস্টার টিউলিক সিদ্দিক পদত্যাগ করেছেন। সম্প্রতি বাংলাদেশে দুর্নীতির একটি মামলায় তার মা, ভাই, বোন ও খালার পাশাপাশি তাকেও অভিযুক্ত করা হয়েছে। বাংলাদেশে দুর্নীতির তদন্তে তার নাম আসার পর থেকেই তার ওপর পদত্যাগের চাপ বাড়ছিল। টিউলিপের বিরুদ্ধে উঠা বিভিন্ন অভিযোগের তদন্ত এখনো শেষ হয় নাই তবে এর মধ্যেই তাকে পদত্যাগ করতে হয়েছে এবং তার জায়গায় লেবার পার্টির এমপি এমা রেনল্ডসকে ট্রেজারির নতুন অর্থনৈতিক সচিব নিযুক্ত করা হয়েছে।
তবে টিউলিপ সিদ্দিক বরাবরই এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। হ্যাম্পস্টিড এবং হাইগেটের লেবার পার্টির এমপি টিউলিপ সিদ্দিক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ের স্টারমার স্ট্যান্ডার্ডস এর উপদেষ্টা স্যার লরি ম্যাগনাসের কাছে পুরো ঘটনা তুলে ধরেছেন এবং সেই সাথে জোর দিয়ে বলেছেন যে, তিনি কোনও ভুল করেননি। তিনি এও বলেন, স্যার লরি দেখেছেন যে, ‘‘আমি মন্ত্রী পর্যায়ের কোন নিয়ম লঙ্ঘন করিনি তারপরেও এটা স্পষ্ট যে, ট্রেজারির অর্থনৈতিক সচিব হিসেবে আমার ভূমিকা অব্যাহত রাখা সরকারের কাজে বিচ্যুতি ঘটাতে পারে তাই পদত্যাগ করেছি’’।
মন্ত্রী হিসাবে টিউলিপ সিদ্দিকের দায়িত্ব ছিল যুক্তরাজ্যের আর্থিক বাজারে দুর্নীতি মোকাবেলা করা। কিন্তু দূর্নীতির দায়ে তিনি নিজেই বরখাস্ত হলেন। টিউলিপ সিদ্দিক ২০১৫ সাল হতে উত্তর লন্ডনের হ্যাম্পস্টিড অ্যান্ড হাইগেইট আসন থেকে এমপি নির্বাচিত হয়ে আসছিলেন, যে আসনটি ব্রিটেন প্রধানমন্ত্রী কিয়ের স্টারমারের আসন হবর্ন অ্যান্ড সেন্ট প্যানক্রাসের লাগোয়া।

বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বোন শেখ রেহানা এবং শফিক সিদ্দিক এর মেয়ে টিউলিপ সিদ্দিক ১৯৮২ সালে লন্ডনের মিচামে সেন্ট হেলিয়ার হাসপাতালে জন্ম গ্রহণ করেন। তার শৈশব কেটেছে বাংলাদেশ, ভারত এবং সিঙ্গাপুরে। ১৫ বছর বয়স থেকে তিনি হ্যাম্পস্টিড ও কিলবার্নে বসবাস শুরু করেন। এই এলাকার স্কুলে পড়েছেন এবং কাউন্সিলর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। লন্ডনের কিংস কলেজ থেকে পলিটিক্স, পলিসি ও গভর্নমেন্ট বিষয়ে তার স্নাতকোত্তর ডিগ্রি রয়েছে।
মাত্র ১৬ বছর বয়সে লেবার পার্টির সদস্য হওয়া টিউলিপ অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল গ্রেটার লন্ডন অথরিটি এবং সেইভ দ্য চিলড্রেনের সঙ্গেও কাজ করেছেন। ২০১০ সালে ক্যামডেন কাউন্সিলে প্রথম বাঙালি নারী কাউন্সিলর নির্বাচিত হন তিনি। ২০১৫ সালে ব্রিটেনের ৫৬ তম সাধারণ নির্বাচনে হ্যাম্পস্টিড ও কিলবার্ন আসন থেকে এমপি পদে বিজয়ী হন শেখ মুজিবুর রহমানের নাতনি, শেখ রেহানা এর জ্যেষ্ঠ কন্যা ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভাগ্নি টিউলিপ সিদ্দিক।
তারপর টানা ৪ বার এমপি নির্বাচিত হয়ে সর্বশেষ তিনি ট্রেজারির অর্থনৈতিক সেক্রেটারি এবং সিটি মন্ত্রী হিসেবে ৯ জুলাই ২০২৪ থেকে ১৪ জানুয়ারি ২০২৫ পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। এর আগে ২০১৫ সালে ব্রিটিশ লেবার পার্টির ছায়া মন্ত্রিপরিষদে সংস্কৃতি, গণমাধ্যম ও ক্রীড়া বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী এবং ২০১৭ সালে ব্রিটেনের লেবার পার্টির ছায়া শিক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব নিয়েছিলেন টিউলিপ সিদ্দিক এমপি। স্বামী ক্রিস পার্সির সঙ্গে টিউলিপ সিদ্দিক লন্ডনের অত্যন্ত অভিজাত এলাকা হ্যাম্পস্টিড ও কিলবার্নে বসবাস করছেন। এই দম্পতির এক ছেলে ও এক মেয়ে রয়েছে। মেয়ে আজালিয়া জয় পার্সি ও ছেলে রাফায়েল মুজিব সেন্ট জন পার্সি।
টিউলিপের বাবা প্রয়াত ড. শফিক আহমেদ সিদ্দিক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ও ঢাকা কমার্স কলেজ গভর্নিং বডির চেয়ারম্যান ছিলেন। তার চাচা হলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নিরাপত্তা বিষয়ক উপদেষ্টা অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল তারিক আহমেদ সিদ্দিক, যিনি গুম, খুন ও আয়নাঘর তৈরীসহ হাসিনা সরকারের নানা বিতর্কের সঙ্গে জড়িত আছেন।
রাজনীতিবিদ ববি হাজ্জাজের অভিযোগের উপর ভিত্তি করে টিউলিপ সিদ্দিক এর বিষয়ে ব্যাপকভাবে তদন্ত চালায় বাংলাদেশের দুর্নীতি দমন কমিশন। ববি হাজ্জাজের অভিযোগ ১০ বিলিয়ন পাউন্ডের রুপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র প্রকল্প নিয়ে রাশিয়া সরকারের সাথে বাংলাদেশী কর্মকর্তাদের বৈঠকের মধ্যস্থতাকারী ও সমন্বয়কারী ছিলেন টিউলিপ সিদ্দিক। তিনি বলেন আলোচনার মাধ্যমে প্রকল্পের ব্যয় এক বিলিয়ন পাউন্ড বাড়ানো হয়েছে, যার ৩০ শতাংশ টিউলিপ ও তার পরিবারের সদস্যদের মধ্যে
বন্টন করা হয়। বিভিন্ন ব্যাংক ও বিদেশী কোম্পানির মাধ্যমে এই টাকা পৌঁছানো হয় তাদের কাছে।
এই প্রকল্প থেকে ৩.৯ বিলিয়ন পাউন্ড অর্থাৎ ৩৯০ কোটি টাকা সরিয়ে নেয় শেখ হাসিনার পরিবার ও তার মন্ত্রীরা। টিউলিপের দুর্নীতির বিষয়ে মুখ খুলেছেন বর্তমান সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মোহাম্মদ ইউনুসও। তিনি ব্রিটেনের দুর্নীতি বিরোধী মন্ত্রী (সাবেক) টিউলিপ সিদ্দিককে তার ও তার পরিবারের জন্য বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত দলের দেয়া আবাসন ব্যবহারের জন্য ক্ষমা চাইতে আহব্বান জানিয়েছিলেন।
ড. ইউনূস তার বক্তব্যে স্পষ্টভাবে বলেন, লন্ডনের যে সকল আবাসন টিউলিপ সিদ্দিক ব্যবহার করেছেন বা করছেন সেগুলির তদন্ত করে দেখা উচিত ব্রিটিশ সরকারের এবং দূর্নীতির বিষয় প্রমাণিত হলে এগুলি সরাসরি চুরির মাধ্যমে প্রাপ্ত বলে বিবেচনা করতে হবে। সাম্প্রতিক কালে শেখ মুজিবুর রহমানের নাতনি সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভাগ্নী শেখ রেহানার মেয়ে টিউলিপ সিদ্দিক এর বিরুদ্ধে ব্রিটেন পার্লামেন্টে সমালোচনাসহ বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় বিস্তর প্রতিবেদন ছাপা হয়।
বিভিন্ন খবরের সূত্র ধরে জানা যায়, টিউলিপের লন্ডনে তিনটি ফ্লাট বা বাড়ী রয়েছে। উত্তর লন্ডনে ২.১ মিলিয়ন পাউন্ডের একটি বাড়ি আছে, যার মালিক বাংলাদেশের বংশোদ্ভূত আব্দুল করিম নাজিম, তিনি আবার আওয়ামী লীগ নেতা। এটি ভাড়া হিসেবে নিলেও টিউলিপ ভাড়া দেন না।

এখানে যে, রহস্য নিহিত আছে তাতে কোন সন্দেহ নেই। কিংস ক্রসে একটি ফ্লাট আছে, সেটি তার নিজের নামে হলেও তিনি নিজে কেনেননি, উপহার হিসেবে পেয়েছেন। আর উপহার দিয়েছেন বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত আওয়ামীগ নেতা ও আবাসন ব্যবসায়ী আব্দুল মোতালিফ। এ বিষয়ে ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে, দ্য ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস-এর প্রতিবেদনে বলা হয় যে, টিউলিপ ২০০৪ সালে আবদুল মোতালিফ নামের একজন ডেভেলপারের (যিনি আওয়ামী লীগের সঙ্গে যুক্ত) থেকে লন্ডনে একটি ফ্ল্যাট উপহার পেয়েছিলেন। হ্যামস্টিড উত্তর লন্ডনে তার বোনের নামে একটি ফ্লাট রয়েছে।
প্রথমে এটি তার নিজের নামে ছিল, পরে ২০০৯ সালে তার ছোট বোন আজমিনা সিদ্দিক এর নামে হস্তান্তর করেন। যার মাধ্যমে হস্তান্তর করা হয় তিনিও আবার বাংলাদেশের বংশোদ্ভূত আওয়ামী লীগ নেতা মঈন গনি, যিনি ছিলেন শেখ হাসিনা সরকারের আইনী পরামর্শক ও লিউলিপের ভাই রাদওয়ান মুজিব সিদ্দিক ববির বন্ধু। ২০০৯ সালে যখন তার ছোট বোনের নামে বাড়িটি হস্তান্তরিত হয় তখন তার ছোট বোন নাবালক ছিলেন।
এর আগে ২০২৪ সালের আগস্টে, দ্য টাইমস এর আরও একটি প্রতিবেদনে প্রকাশিত হয় যে, টিউলিপ যে বাড়ীতে বসবাস করছিলেন তা একজন ব্যবসায়ীর মালিকানাধীন, যার আওয়ামী লীগের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। আবার দুই বছর আগে, তিনি সালমান এফ রহমানের মালিকানাধীন বাড়ীতে বসবাস করার জন্য সমালোচনার মুখে পড়েছিলেন। ওই সম্পত্তিটি সালমান এফ রহমানের ছেলের নামে একটি অফশোর কোম্পানির মাধ্যমে আইল অব ম্যান-এ নিবন্ধিত ছিল। ২০১৯ সালে, টিউলিপ বাংলাদেশের রাজনীতিতে জড়িত থাকার কথা পুরোপুরিঅস্বীকার করেছিলেন কিন্তু তার নির্বাচনী প্রচারণায় আওয়ামী লীগের সমর্থকদের ব্যবহার করার অভিযোগ রয়েছে।
২০১৭ সালের একটি সভার ফুটেজে তাকে এসব সমর্থকদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাতে দেখা যায়, যেখানে তিনি বলেন- ‘‘আপনাদের সমর্থন ছাড়া আমি আমার আসনে জিততে পারতাম না।’’ এর আগে তিনি আওয়ামী লীগের ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং যুক্তরাজ্য শাখা ও নির্বাচনী কৌশল দলের জন্য কাজ করার কথা স্বীকার করেছিলেন। দুই জন লেবার কর্মকর্তা আরও দাবি করেছিলেন যে, আওয়ামী লীগ তাদের ২০২৪ সালের নির্বাচনী প্রচারণাকে সমর্থন করেছে।
২০১৫ সালে, টিউলিপ সেন্টার ফর রিসার্চ এন্ড ইনফরমেশন (সিআরআই) আয়োজিত একটি অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন, যেটি শেখ হাসিনার সরকারের পক্ষে মিথ্যা তথ্য প্রচারের অভিযোগে অভিযুক্ত। টিউলিপ ঐ অনুষ্ঠানে তার খালার নেতৃত্বের প্রশংসা করেছিলেন। শেখ পরিবারের জন্য বাংলাদেশের বিতর্কিত বিশেষ নিরাপত্তা আইনের সুবিধা ভোগ নিয়েও রয়েছে নানা বিতর্ক। টিউলিপ ব্রিটিশ নাগরিক ও এমপি হওয়া সত্তে¡ও এই আইনের সুবিধা ভোগ করেছেন।
আবার টিপলিপ ঢাকার ডিপ্লোম্যাটিক জোনে অবৈধভাবে প্লট বরাদ্দ পেয়েছেন বা প্রভাব খাটিয়ে নিয়েছেন, এসব নিয়ে স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন উঠেছে ব্রিটিশ মিডিয়াতে। ২০১৩ সালে রাশিয়ার সাথে রুপপুর পারমানবিক কেন্দ্রের বিষয়ে যে চুক্তি হয় সেই চুক্তির মধ্যস্থতা কারী ও সমন্বয়কারী হিসেবে টিউলিপকে ধরা হয়েছে, যদিও টিউলিপ এ বিষয়টিকে মিথ্যা ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রণোদিত বলছেন।
কিন্তু এ বিষয়ে দালিলিক প্রমান হিসেবে একটি ছবিতে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে টিউলিপের খালা সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে তাঁর ছবি রয়েছে, এটিকে অস্বীকার করার উপায় কোথায়। এই প্রকল্প থেকে ৫ বিলিয়ন পাউন্ড অবৈধভাবে সরানোর জোড়ালো অভিযোগ রয়েছে। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে, দ্য টেলিগ্রাফ একটি প্রতিবেদনে অভিযোগ করে যে, টিউলিপ এবং আওয়ামী লীগের এমপি কাজী নাবিল আহমেদ ২০১৯ ক্রিকেট বিশ্বকাপের দুটি ম্যাচ বিনামূল্যে উপভোগ করেছিলেন।
প্রতিটি টিকিটের মূল্য ছিল ৩৫৮.৮০ পাউন্ড (বাংলাদেশী টাকায় প্রায় ১ লক্ষ টাকা), যার মধ্যে লাঞ্চ অন্তর্ভুক্ত ছিল। এছাড়াও আরও নানাবিধ ও বিস্তর অভিযোগ উঠেছে টিউলিপের বিরুদ্ধে, যার প্রতিউত্তর মিলানো সত্যি কঠিন। টিউলিপের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী স্টারমারের সম্পর্ক অনেক মপুরনো ও গভীর। ২০১৪ সালে টিউলিপের নমিনেশন নিশ্চিত হওয়ার পর তিনি নাকি স্টারমারের নমিনেশনের জন্য চেষ্টা করেছিলেন। তাদের বন্ধুত্ব ও পারিবারিক সম্পর্কের কথা তারা বহূবার নিজেদের মুখেও স্বীকার করেছেন।
এমনকি নিজ নিজ পরিবারকে নিয়ে একসঙ্গে ঘুরতে গেছেন তারা। ২০২০ সালে লেবার পার্টির নতুন নেতা নির্বাচনের সময় টিউলিপ প্রকাশ্যে স্টারমারের পক্ষে কাজ করেছেন। টিউলিপের সঙ্গে সংযুক্ত বাংলাদেশী নাগরিকদের নিয়ে গড়ে উঠা সোসাইটি ‘‘লেবার ফ্রেন্ডস অফ বাংলাদেশ’’ও স্টারমারকে সমর্থন দিয়েছিল। দ্য টিলিগ্রাফ পত্রিকা এ বিষয়ে উল্লেখ করেছে যে, ২০১৬ সাল থেকে পরবর্তী সময়ে স্টারমার তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বাংলাদেশ সরকারের অনেক গুরুত্বপূর্ন ব্যক্তিদের সঙ্গে একাধিকবার দেখা করেছেন।
লিউলিপ যুক্তরাজ্য আওয়ামীলীগ ও ঘনিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়ে মাঠে একসঙ্গে ক্রিকেট খেলা দেখা এবং এসকল ব্যক্তিদের সঙ্গে স্টারমারের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে উপস্থিত হওয়া এরকম নজির রয়েছে অনেক। এমনকি স্টারমারের নির্বাচনী ফান্ড রেইজিং অনুষ্ঠানেও টিউলিপ যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগকে ব্যবহার করেছেন। ফলে লেবার পার্টির সঙ্গে আওয়ামী লীগের সম্পর্ক এবং টিউলিপ ও স্টারমার এর পারিবারিক ও ব্যক্তিগত সম্পর্কের কারনে স্টারমার লিউলিপের ব্যাপারে নমনীয়, রক্ষনাত্বক ও পক্ষপাতিত্ব সুলভ ভ‚মিকা পালন করছেন, সেটি নিয়েও খোদ লেবার পার্টির মধ্যেই অস্বস্তি রয়েছে।
টিউলিপের পদত্যাগপত্র গ্রহণ করে এক চিঠিতে স্যার কিয়ের স্টারমার বলেছেন যে, ‘‘তার জন্য দরজা খোলা রয়েছে’’। গোটা ব্রিটিশ মিডিয়া ও পার্লামেন্ট যেখানে টিপলিপের বিষয়ে সরগরম সেখানে প্রধানমন্ত্রীর এমন নির্লিপ্ত নআচরন অনেকেই ভাল চোখে দেখছেন না। এতে করে টিউলিপের জন্য ভাল কিছুতো হবেই না বরং প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ের স্টারমার নিজের ও দলের এবং টিউলিপের সর্বনাস ডেকে আনবেন।
কারন ব্রিটিশ পার্লামেন্ট ও ব্রিটিশ মিডিয়া বাংলাদেশের মতো নয়। সেদেশে কেউ অন্যায় করলে নিজ দলের এমপিরাও তার বিরুদ্ধে অবস্থান নেয় আর বিট্রিশ মিডিয়াতো যে ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে লাগে তার আর কোন কিছু অবশিষ্ট থাকেনা। যুক্তরাজ্যের রাজনীতিতে এরকম নজির অনেক রয়েছে।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী টনি বেøয়ারের স্ত্রী আইনজীবি চেরি ব্লেয়ার চরম ব্যস্ততা ও সময়ের অভাবে একদিন নির্ধারিত গাড়ী পার্কিং এর জায়গায় গাড়ী পার্কিং না করে আদালতের জরুরী হেয়ারিংএ উপস্থিত হয়েছিলেন। পরে তার গাড়ীটি আটক করা হয়, তার নামে মামলা হয় এবং তাকে জরিমানা করা হয়।
মিসেস টনি ব্লেয়ার এই ঘটনার যথাযত কারন উল্লেখপূর্বক ব্যাখ্যা প্রদাণসহ দুঃখ প্রকাশ করেছিলেন, তার স্বামী তখনকার প্রধান মন্ত্রী ছিলেন। তারপরও তার নামে ব্রিটিশ মিডিয়া ও প্রশাসন এমনভাবে লেগেছিল যে, তার জেল হওয়ার উপক্রম হয়েছিল এবং টনি বেøয়ারের প্রধানমন্ত্রীত্ব হারানোর মত অবস্থা হয়েছিল। টিউলিপ আজকে মন্ত্রীত্ব হারিয়েছেন, কালকে এমপি পদ ও নমিনেশন দুটোই হারাবেন। প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ের স্টারমার বিষয়টি আচ করতে পেরেছেন বৈকি।

মন্ত্রিত্ব খোয়ানোর ব্যাপারে প্রথমে ব্রিটেন পার্লামেন্টের বিরোধী দল কনজারভেটিভ দলের পক্ষ থেকে টিউলিপের সিটি মিনিস্টারের পথ থেকে পদত্যাগ করার দাবি ওঠে। তারপর ব্রিটিশ মিডিয়া ও বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় এ বিষয়ে একের পর এক প্রতিবেদন ছাপা হয়। বৃটেনের বিখ্যাত পত্রিকা দ্য ডেইলি মিরর, দ্য ফিনান্সিয়াল টাইম, দ্য টাইমস, দ্য মেইল, দ্য ইকোনোমিস্ট, সানডে টাইমস, দ্য গার্ডিয়ান প্রভৃতি খ্যাতনামা পত্রিকায় টিউলিপ বিরোধী সংবাদ ব্যাপকভাবে প্রচার হতে থাকে।
এমনকি দ্যা সানডে টাইম পত্রিকার এক সাংবাদিক বাংলাদেশে এসে গণভবনে যেসব আলামত সংগ্রহ করেন তার মধ্যে টিউলিপ সিদ্দিক এর নির্বাচনী প্রচারপত্র ও লেবার পার্টির নির্বাচনী লিফলেট পাওয়া যায়, যার কারনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাথে তার যে সম্পর্ক নেই, সেটি বলার কোন উপায় থাকে না এবং বিষয়টি আরও জটিল আকার ধারন করে। গত বছর ৫ই আগস্ট ছাত্র জনতার গণ অভুত্থানের মাধ্যমে সাবেক স্বৈরাচার আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হলে শেখ হাসিনা ও তার পরিবারের সদস্যরাসহ এমপি, মন্ত্রী ও নেতাকর্মীরা দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান।
তারপর থেকে বাংলাদেশে শেখ পরিবারের বিরুদ্ধে ব্যাপক দুর্নীতি ও অর্থপাচারের অভিযোগ ও গণহত্যাসহ নানাবিধ অবৈধ কর্মকান্ডের বিপরীতে মামলা ও তদন্ত শুরু হয়। ফলে শেখ পরিবারের দুর্নীতি ও অর্থপাচারের অভিযোগ ব্যাপকভাবে উঠে আসে দেশী বিদেশী বিভিন্ন মিডিয়াগুলোতে।
তারই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ ও ব্রিটেনে টিউলিপ সিদ্দিক এর নামে দুর্নীতির অভিযোগ উঠতে থাকে। শোনা যায়, বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে যে নজিরবিহীন লুটপাট ও ব্যাপক ভিত্তিক অর্থপাচার হয়েছে তার মূল কারিগর হিসেবে শেখ রেহানা এবং কিছু কিছু ক্ষেত্রে সজীব ওয়াজেদ জয় ও টিউলিপকে দায়ী করা হয়। আওয়ামী লীগের কমিশন বাণিজ্যের একটি বড় সিন্ডিকেট শেখ রেহানা, জয় ও টিউলিপের মাধ্যমে হয়েছে বলে অনেকেই মনে করেন। শেখ পরিবারের এই দুর্দিনে টিউলিপ সিদ্দিক ও হাসিনা পুত্র জয় আওয়ামী লীগ ও শেখ পরিবারকে উদ্ধার করা তো দূরের কথা উল্টো আওয়ামী লীগ ও শেখ পরিবারকে দেশে বিদেশে বেকায়দায় ফেলে দিয়েছে। অথচ তারা গোটা পৃথিবীর দুই মোড়ল রাষ্ট্র আমেরিকা ও বৃটেনের নাগরিক এবং গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। তারপরও তারা দুর্নীতি ও বিতর্কিত কর্মকান্ডের মাধ্যমে শেখ পরিবারের বিপদ বাংলাদেশ থেকে টেনে ব্রিটেন ও আমেরিকাতে নিয়ে গেছেন।
নিজেদের সিন্ডিকেট ও কমিশন বানিজ্যকে টিকিয়ে রাখতে মেগা প্রকল্পের নামে মেগা দূর্নীতি, বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরি এবং ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতে দরবেশ বাবা ও এস আলমের মতো ব্যাংক ডাকাত ও দস্যুদেরকে প্রমোট করে ব্যাংকগুলোকে লুটের মালে পরিণত করেছেন।
ব্যাংকার, লেখক ও
কলামিস্ট

আরও পড়ুন
ব্যবসাবান্ধব ও জনকল্যাণমুখী বাজেটই টেকসই অর্থনীতির রূপরেখা
“অসংক্রামক রোগের ঝুঁকি কমাতে তামাকপণ্যের উপর কর বৃদ্ধির প্রস্তাব চিকিৎসকদের”
কোটি টাকার যুগে এক হাজার টাকার নোট এখন অনেকটাই অপ্রতুল মনে হচ্ছে