
আওয়াজ অনলঅইন : ডিজিটাল দুনিয়ায় মুহূর্তে ভাইরাল হয়ে জনপ্রিয়তা অর্জনের লোভে পড়েছে তরুণ প্রজন্ম। এতে সোশ্যাল মিডিয়ার বিভিন্ন অ্যাপসের প্রতি আসক্তি বেড়েই চলেছে তাদের। তরুণ প্রজন্মের এমন দুর্বলতাকে কাজে লাগাতে ঘাপটি মেরে থাকে বিভিন্ন প্রতারক চক্র। সুযোগ বুঝে এসব চক্রের কেউ টাকা হাতিয়ে নেয়, আবার কেউ প্রলুব্ধ করে ধর্ষণের মতো ঘটনাও ঘটিয়েছে। কিন্তু এবারই প্রথম ভিন্ন তথ্য পেলো আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
পুলিশ বলছে, স্মার্টফোনের অত্যন্ত জনপ্রিয় মিউজিক অ্যাপস ‘টিকটক’- এ ভিডিও বানিয়ে জনপ্রিয় বানানোর প্রলোভন দেখিয়ে টাকা হাতিয়ে নেওয়া কিংবা কিশোরী ও নারীদেরকে যৌন হয়রানির খবর বেশ পুরোনো। কিন্তু এর সুযোগ নিয়ে নারীদের বিদেশে পাচার করার মতো ঘটনা রীতিমত চমকে দেওয়ার মতো। তাও এক-দুই কিংবা দশজন নয়। সংখ্যাটা হাজারের অধিক।
টিকটকের মাধ্যমে জনপ্রিয় মডেল কিংবা নায়িকা বানানোর প্রলোভন দেখিয়ে এক হাজারের অধিক নারী পাচারের সংগে জড়িত একটি চক্রকে গ্রেফতারের পরই এমন তথ্যে রীতিমত বিস্মিত পুলিশ।
বুধবার (২ জুন) সকালে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) মো. শহীদুল্লাহ সাংবাদিকদের সংগে আলাপকালে পাচার হওয়া তথ্যের বর্ণনা দেন।
তিনি বলেন, টিকটক হৃদয়ের ফাঁদে পা দিয়ে ভারতে পাচার হওয়ার ৭৭ দিন পর দেশে ফিরে আসা এক কিশোরী রাজধানীর হাতিরঝিল থানায় মামলা করেছেন। গত মঙ্গলবার মধ্যরাতে ওই কিশোরীর মামলা দায়ের পর এই মেহেদী হাসান, মহিউদ্দিন ও আব্দুল কাদের নামে তিনজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
তারাই একটি আন্তর্জাতিক মানব পাচার চক্রের সক্রিয় সদস্য। শুধু এই চক্রের সদস্যরাই হাজারের অধিক নারী পাচার করেছেন টিকটকে মডেল বানানো এবং বিদেশে ভালো বেতনের চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে। পাচার করা সেসব নারীদের কয়েকজনকে বিভিন্ন হোটেলে বিক্রি করে দেয়া হয়েছে, আবার কাউকে বন্দি রেখে অমানবিক নির্যাতন করে পতিতাবৃত্তিতে বাধ্য করা হয়েছে।
সম্প্রতি ভারত ও বাংলাদেশে ফেসবুকে ব্যবহারকারীদের কাছে একটি ভিডিও ভাইরাল হয়। ভিডিওটিতে দেখা যায়, একজন তরুণীকে বিবস্ত্র করে দু’জন নারী ও চারজন যুবক অমানবিক যৌন নির্যাতন করছে। এমন ভিডিও বাংলাদেশ ও ভারতে ছড়িয়ে পড়লে দুই দেশের পুলিশই ঘটনার তদন্তে মাঠে নামে। তবে ভারতে ওই ভিডিও প্রচার হওয়ার কয়েকদিন আগে এক তরুণী আত্মহত্যা করেছিলো। তাই আত্মহত্যা করা ওই তরুণী আর দেশটিতে ভাইরাল হওয়া ভিডিওটিতে নির্যাতনের শিকার হওয়া তরুণী একই বলে ভেবেছিল পুলিশ। তাই ঘটনার তদন্তে জোর দেয় ভারতের পুলিশ।
অন্যদিকে, ভিডিওটি বাংলাদেশেও ভাইরাল হওয়ার পর পুলিশ ভেবেছিল এটি বাংলাদেশেরই ঘটনা। তাই বাংলাদেশের পুলিশও ঘটনার রহস্য উদঘাটনের চেষ্টা করে। যার ফলশ্রুতিতে দুই দেশের পুলিশই ঘটনার রহস্য উদঘাটন করে। বাংলাদেশের পুলিশ জানতে পারে ঘটনাটি ভারতের। কিন্তু নির্যাতনকারীদের মধ্যে একজন বাংলাদেশের নাগরিক; যার নাম টিকটক হৃদয় বাবু। এরপরই বাংলাদেশের পুলিশ ভারতের পুলিশকে বিষয়টি নিশ্চিত করে তথ্য দিলে গত ২৭ মে ব্যাঙ্গালুরু পুলিশ টিকটক হৃদয় বাবুসহ ৬ জনকে গ্রেফতার করে। এরপরই ভারতের পুলিশ জানতে পারে নির্যাতনের শিকার ওই তরুণীও বাংলাদেশি।
এরপরই নড়েচড়ে বসে বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। সেই সংগে একের পর এক বেরিয়ে আসতে শুরু করে টিকটক হৃদয় বাবুদের অপকর্মের নানান কাহিনী। পুলিশ গ্রেফতারকৃত এবং নির্যাতনের শিকার তরুণীদের কাছ থেকে তথ্য পায়, টিকটক হৃদয় বাবুরা একটি আন্তর্জাতিক মানব পাচার চক্রের সদস্য। এরপরই অব্যাহত অভিযানে গত ১ জুন ওই চক্রের ৪ সদস্যকে গ্রেফতার করে র্যাব।
গ্রেফতারের পর র্যাব জানায়, চক্রটি গত ৭-৮ বছরে প্রায় ৫ শতাধিক কিশোরী ও নারীদেরকে টিকটকে মডেল বানানো এবং ভালো বেতনে চাকরি দেয়ার প্রলোভন দেখিয়ে ভারতসহ সীমান্তবর্তী বিভিন্ন দেশে পাচার করেছে।
এদিনই মঙ্গলবার দিবাগত রাতে ওই চক্রের আরও তিনজনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। গ্রেফতারের পর তাদের কাছ থেকেও একই তথ্য পেয়েছে পুলিশ। তারা পুলিশকে জানিয়েছে, গত ৭-৮ বছর ধরে তারা বিভিন্ন বয়সী নারী-কিশোরীদেরকে টার্গেট করে মডেল বানানো এবং ভালো বেতনে চাকরির প্রলোভন দিয়ে ভারতসহ বিভিন্ন দেশে পাচার করেছে। পাচারকৃত ওই নারীদেরকে হোটেল ও বিভিন্ন পতিতাবৃত্তির কাজে নিয়োজিত হদে বাধ্য করেছে তারা। এজন্য তারা সেসব নারীকে অমানবিক যৌন নির্যাতন করতো বলেও স্বীকার করেছে পুলিশের কাছে।
এই বিষয়ে ডিএমপির তেজগাঁও বিভাগের ডিসি মো. শহীদুল্লাহ বলেন, টিকটক হৃদয়ের মাধ্যমে ভারতে পাচার হওয়া এক কিশোরী তিন মাসের নির্মম নির্যাতন ও বন্দিদশা থেকে পালিয়ে দেশে ফিরে হাতিরঝিল থানায় মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইনে মামলা করেন। এই মামলায় ১২ জনকে আসামি করা হয়। এরমধ্যে বাংলাদেশের ৫ জন। তারা দেশে অবস্থান করছে বলে প্রাথমিকভাবে জানতে পারে পুলিশ। বাকি ৭ জন ভারতের নাগরিক।
তিনি বলেন, টিকটকের গ্রুপের মাধ্যমে হাতিরঝিলের মধুবাগ ব্রিজ এলাকায় হৃদয়ের সংগে পরিচয় হয় ওই কিশোরীর। হৃদয় তাকে কখনো টিকটক স্টার বানানো, কখনো ভালো বেতনের চাকরির অফার দিয়ে প্রলুব্ধ করতো। ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে নারায়ণগঞ্জের অ্যাডভেঞ্চার ল্যান্ড পার্কে ৭০ থেকে ৮০ জনকে নিয়ে টিকটক হ্যাংআউট এবং একই বছরের ১৮ সেপ্টেম্বর গাজীপুরের আফরিন গার্ডেন রিসোর্টে ৭০০ থেকে ৮০০ জন তরুণ-তরুণীকে নিয়ে পুল পার্টির আয়োজন করে হৃদয় বাবু। এরপর চলতি বছরের ১৯ ফেব্রুয়ারি কুষ্টিয়ায় বাউল লালন শাহ মাজারে আয়োজিত টিকটিক হ্যাংআউটে নিয়ে যাওয়ার কথা বলে, আন্তর্জাতিক সক্রিয় এই মানব পাচারকারীর চক্রের অন্য সহযোগীদের সহায়তায় কৌশলে এই কিশোরীকে ভারতে পাচার করে হৃদয় বাবু।
তিনি বলেন, পাচারকারী চক্রের খপ্পরে পরার পর থেকে পালিয়ে দেশে ফেরা পর্যন্ত তার ৭৭ দিনের লোমহর্ষক করুন কাহিনী কল্পনাকেও হার মানিয়েছে। আমরা রীতিমত বিস্মিত!
ডিসি বলেন, ভারতে পাচারের পর তাকে ব্যাঙ্গালুরুর আনন্দপুর এলাকায় পর্যায়ক্রমে কয়েকটি বাসায় রাখা হয়। এ সময় ভারতে অবস্থানের সময়ে এই চক্রের মাধ্যমে পাচার হওয়া আরও কয়েকজন বাংলাদেশি কিশোরীকে দেখেন, যাদের তিনি আগেই চিনতেন। তাদেরকেও সুপার মার্কেট, সুপার শপ, বিউটি পার্লারে ভালো বেতনে চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে পাচার করা হয়েছিলো।
তিনি বলেন, ব্যাঙ্গালুরুতে পৌঁছার কয়েকদিন পরই ভিকটিমকে চেন্নাইয়ের ওইয়ো (OYO) হোটেলে ১০ দিনের জন্য পাঠানো হয়। সেখানে তাকে অমানবিক শারীরিক ও বিকৃত যৌন নির্যাতনে সামান্য দয়া-করুনাও দেখায়নি এই চক্রের সদস্যরা। বরং কৌশলে নেশা জাতীয় দ্রব্য খাইয়ে কিংবা জোরপূর্বক বিবস্ত্র ভিডিও ধারণ করে পরিবারের পরিচিতদের তা পাঠিয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়ে জিম্মি করে রাখা হয় তাকে। ভারতে পাচারের ৭৭ দিন পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল ভিডিওর ঘটনার ভিকটিমের সহযোগিতায় দেশে ফিরে আসেন এই কিশোরী।
তিনি বলেন, মামলায় অভিযুক্ত পাঁচজনের মধ্যে তিনজনকে সাতক্ষীরা জেলার সীমান্তবর্তী দাবকপাড়া কালিয়ানী এলাকায় অভিযান চালিয়ে গ্রেফতার করা হয়েছে। এ সময় তাদের কাছ থেকে পাচারের কাজে ব্যবহৃত ২টি মোটরসাইকেল, একটি ডায়রি, ৪টি মোবাইল ও ১টি ভারতীয় সিম কার্ড উদ্ধার করা হয়েছে।
তারা প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে পুলিশকে জানিয়েছে, একটি মানব পাচার চক্রের সক্রিয় সদস্য তারা। এই কিশোরীসহ তারা এক হাজারের বেশি নারী পাচারের সংগে জড়িত। গ্রেফতার মেহেদী হাসান প্রায় ৭-৮ বছর ধরে ভারতে নারী পাচারের সংগে জড়িত বলে জানিয়েছে।
গ্রেফতারের পর তাদের কাছ থেকে উদ্ধার হওয়া মোবাইল ও ডায়রিতে হৃদয় বাবু, সাগর, সবুজ ও রুবেলের ভারতীয় মোবাইল নম্বর পাওয়া গেছে। পাশাপাশি তার কাছ থেকে উদ্ধারকৃত ডায়রিতে সম্প্রতি ভাইরাল হওয়া রুবির আধার নম্বর ও ভারতে পাচার হওয়া উল্লেখযোগ্য সংখ্যক তরুণীদের নাম ও মানব পাচারে জড়িত ব্যক্তিদের ডিটেইল তথ্য পাওয়া গেছে।
ডিসি শহীদুল্লাহ বলেন, এই চক্রটি সীমান্তবর্তী এলাকায় পাচারের কাজে ব্যবহারের জন্য ঘর নির্মাণ করেছে। সেখানে পাচারের জন্য আনা তরুণীদের রেখে সহায়তার পাশাপাশি মোটরসাইকেল দিয়ে সীমান্ত পার করে ভারতীয় দালালের হাতে তুলে দিতো।
সূত্র: বিভি।/এইচ.

আরও পড়ুন
মাস্টার্স পাস করেও কর্মহীন ৯ লাখ তরুণ: দিশেহারা উচ্চশিক্ষিত বেকার সমাজ
জুলাই থেকে বকেয়াসহ নিয়মিত বেতন স্বাভাবিক হচ্ছে: শিক্ষামন্ত্রী
‘বাংলার জয়যাত্রা’ ১১৫ দিন পর হরমুজ পার হলো