হোম » সাহিত্য » জুড়ান করাতি – (পঞ্চম পর্ব)

জুড়ান করাতি – (পঞ্চম পর্ব)

শেখ হান্নানঃ আওয়াজ অনলাইনঃ ওই সময় জুড়ান ছিলো বুলবুলির প্রিয় মানুষ। লজ্জায় বলতে পারেনি ভালোবাসার কথা। বলার সাহসও ছিলোনা বুলবুলির। অন্তরে অনুভবে জুড়ার করাতির চেয়ে জুড়ান বয়াতিকে বেশি পছন্দ হতো তার। আজকে এতো কাছে পেয়ে বুলবুলি অনেকটা আত্নহারা।

জুড়ান হাত ছাড়িয়ে নিতে চেষ্টা করছিলো। এইবার বুলবুলি জুড়ানের দুহাত জড়িয়ে ধরে বলতে লাগলো-করাতি জানিনা আপনার হাত ধরা ঠিক হইছে কিনা? আমার অন্তরের মধ‍্যে যে আক্ষেপ তারতো মিমাংসা হইলো না। আবার আর কোনোদিন আপনার সাক্ষাত পামু কিনা জানি না? আমি এতো দিন ধইরা যে, সাত নরকের যন্ত্রণা বুকে কৈরা বৈতাছি, আইজ আপনের সেই কথা শুইনতেই ওইবো। ওই যে আমার ছাওয়াল কুদ্দুসরে দেইখলেন, ওর পাঁচ বছর বয়সের সময় আমি বিধবা হইছি।

আইজ তরি ওই ছাওয়ালডার মুখের দিকে তাকায়া বাঁইচা আছি, দ্বিতীয় নিকা করি নাই। আমার বাপের খুবই ইচ্ছাছিলো আপনারে জামাই কৈরা রাইখতে। কিন্তু যুদ্ধের সময় সেই যে চৈলা গেলেন! ক‍্যান ফিরা আইলেন না? আপনের না আসাতে বুঝছি আমার বাপ আপনের চাইতেও গরীব আছিলো বৈলা? আমার বিশ্বাস আছিলো ইঁন্দুরের বিয়া ইঁন্দুরের সাথে হয়।

কিন্তু ক‍্যান হইলোনা আর ক‍্যান ফিরা আইলেন না!বুলবুলির আফসোস জড়ানো হ্নদয় বিদীর্ণ করা কথাগুলো জুড়ানকে শুধু শরাহতই করলো না হতচকিত হলো। শ্বাসরুদ্ধ কন্ঠে করাতি বলতে লাগলো-বুলবুলি আর কৈও না। ওই ঘটনা মনে কৈরা দিওনা! আমি আর সহ‍্য করতে পারতেছিনা। যে দিন এইগ্রামে পাকিস্তানি মিলিটারি আইলো, তুমিতো জানো মানুষ যে-যার মতো, সব কিছু রাইখা জানডা নিয়া পালাইয়া গেলো।

গিয়াস ভাই চিল্লাচিল্লি কৈরা কৈলো, মিলিটারি গ্রামে ঢুইকছে। সব পালাও। আমি আমার করাতটা কান্দে নিয়া দৌড়াইয়া তোমাগারে বাড়িত যায়া দেহি, তোমরা কেউ বাড়িতে নাই। ঘর খালি। এই করাত ঘরের মধ‍্য রাইখা, নানান জায়গা পথঘাট ঘুইড়া সাতদিন পর খৈলসাকুড়া বাড়িত যাই। যে রাস্তায় যাই, শুনি সেই রাস্তায় রাজাকার আর মিলিটারি। বাড়ি গিয়া দেহি পুরা গ্রাম আগুন দিয়া পোড়া। চেনা যায়না নিজের বাড়িঘর। পুইড়া নিঃশ্চিহ্ন। গ্রামে কোনো মানুষ নাই।

আমি আমার বাজানেক ডাকি, আমার মা, ছোট ভাইবোনেরে ডাকি, কোনো উত্তর পাইনা।পরে তালুকদার বাড়ির আমার সমবয়োসী মোকা মামা আমার কাছে আইসা আমাক জড়াইয়া ধইরা কয়-আমার বাপ মা ছোট ভাইডারে মিলিটারিরা গুলিকৈরা মাইরা ফালাইছে। ছোট বোইনডার নরপশুরা—-! আমি ওই কথা তোমারে কৈতে পারুমনা বুলবুলি।

আমি অজ্ঞান হয়া পৈরা ছিলাম। আর জ্ঞান ফিরলে দেহি আমার আদরের বোইনডা আমারে বুকে পৈরা কাইনতাছে।জুড়ানের এমন বিভৎস কথায় স্তম্ভিত বুলবুলি। জুড়ানের স্বজন হারানো বেদনা তাড়িত কথাগুলো তার নিজের মনে করে ভীষণ কষ্ট পাচ্ছিলো বুলবুলি। জুড়ানের মুখে হাতদিয়ে কথা থামিয়ে বলতে লাগললো-আমি ভুল করছি। আমি না জাইনা ভুল বলছি। আমাকে ক্ষমা কৈরা দেন। জুড়ান বললো-ভুল করো নাই।

আমার বাপ মা ভাইয়ের ম‍ৃত‍্যু যন্ত্রণা আইজব্দি বৈয়া বেড়াইতাছি বুলবুলি। কও কোন সাহসে, কোন শক্তিতে ভর কৈরা এইখানে আইসা দাঁড়ামু। মানুষের জীবনের ওই অবস্থায় কারো বুদ্ধি সাহস থাকে? জ্ঞান বুদ্ধি সাহস, কোনোটাই থাকার কথা নয়। জীবনের অনেক কিছুই পরিবর্তিত হয়েছে।

কিন্তু আমার হক ট‍্যাকার কেনা করাত যে জায়গায় রাইখা গেছিলাম সেই স্থানেই পাইলাম। কী আশ্চর্য! অসম্ভব! বাইরে উঠানের মধ‍্যে জুড়ানের স্ত্রী পিড়পিড়ি দাঁড়িয়ে গাঢ় পাটকেল রঙের কবুতর জোড়ার প্রণয় সঙ্গীত মুগ্ধ নয়নে দেখছিলো। দেখছিলো সুখের পায়রাদের প্রিয়সী বশিকরণের নানা কসরত ও প্রণয়নৃত‍্যগীত।
!!চলবে!!
রচনাঃ-শেখ হান্নান।
নাট‍্যকার ও লেখক
নাটোর পাড়া।
পশ্চিম ব‍্যাংক টাউন,
সাভার। ঢাকা।
শুক্রবার, ৪ ফেব্রুয়ারি ২০২২খ্রিঃ

শেয়ার করুন আপনার পছন্দের সোশ্যাল মিডিয়ায়
error: Content is protected !!