
শেখ হান্নানঃ সূর্যের আলো ফোটার পূর্বেই ছেতেমের আগমন এবং ভাইয়ের সাথে যে আলোচনা হলো বিছানায় শুয়ে সব শুনলো গোলেনুর। আজ বুধবার। একদিন পর বিবাহের দিন ধার্য হয়েছে। চিন্তাভারাক্রান্ত মনে বিছানা ছেড়ে বারান্দায় বসে প্রয়াত স্বামীর স্মৃতি, শ্বাশুড়ীর কথা মনে পড়লো। একদিন মজদারের বাড়ি ফিরতে বিলম্ব দেখে গোলেনুরকে শ্বাশুড়ী বলেছিলো-
-“মা গোলে মজদারের খাওয়া নিয়া
তোমার ঘরে যাও। রাইত অনেক হইচে,
যাও দুইজন একপাতে খাইয়া নিও”।

আসলে এই কথা দিয়ে শ্বাশুড়ী পরষ্পরকে খাইয়ে দেবার সুযোগ করে দিয়েছিলো। গোলেনুরও শ্বাশুড়ীর পরামর্শ কাজে লাগিয়ে সত্যিই সেদিন প্রিয় স্বামীকে খাইয়ে দিয়ছিলো। মনে পড়লো দুইমাসের সংসারে, শ্বাশুড়ীও তার নিজ হাতে, ভাতের নলা খাইয়ে দিয়েছে কতবার। বারবার একটার পর একটা স্মৃতি, ঘটনা, একের পর এক, মনে হতে লাগলো। আজ এই স্মৃতি ভোলার কোনো পথ জানা নেই গোলেনুরের। দেবর দেলবার ভাবির জন্য পাগল। ভাবির যেন কোনো অসুবিধা না হয়, নববধূর কী কী প্রয়োজন, ভাই মজদার না লক্ষ্য করলেও দেলবার ভাবির সাজসজ্জার প্রসাধন, চাইবার পৃর্বেই পুরুণ করে দিত। তার বিবাহের যাবতীয় কেনাকাটা সিঙ্গাপুর থেকে কিনে এনেছিলো তার আদরের দেওড়। বিবাহের সাতদিন পর সে সিঙ্গাপুর চলে গেলোও সাতদিনের শ্রদ্ধা আর সন্মান ভুলবে কেমন করে? যে ভাইকে প্রাণদিয়ে ভালোবাসতো, সেই ভাইয়ের লাশটাও শেষবারের মতো দেখবার, ভাগ্য হলো না। বদ-নসিব!পোড়া কপাল দেলবারের!

আজ এই শান্ত সোনালি সকাল বেলা ভাইয়ের মত দেবরটির কথা মনেপড়ে তার জন্য অন্তর ছিঁড়ে কুটিকুটি হতে লাগলো। গোলেনুরের চোখ অশ্রুভারে দৃষ্টি ঝাপসা হতেছিলো। হতভাগী গোলেনুর অবস ভাবনায় নয়নজলে মালাগেঁথে, অতীত স্মৃতির সব সম্পর্ক ছিন্নকরে, তার হ্নদয়াসনে ছেতেমকে বসাতে চাইলেও হ্নদয়বিদীর্ণ করে, মনের বাসনাকে চৌচির করে বেড়িয়ে আসে, প্রয়াত স্বামী মজদারের নাম, মজদারের ভালোবাসা, তার মধুর সম্পর্কের ছবি।
একদিন পর শুক্রবার। ভাবি কৈতরী এই বিবেচনায় সকালবেলায় গোলেনুরকে কাজের কোনো ফরমায়েশ নাদিয়ে,নিজেই উঠোন ঝাড়ু দিয়ে, ঝাঁটাটি ঘরের ঢোয়ায় ঠেস দিয়ে রাখতেই খলখলি দাদি এসেই বলো-
-” ক্যারে গোলে মুক চুক্কা কৈরা বৈসা
রৈইছোস ক্যা। আইজ বাদে কাইল
তোর বিয়া। এল্ল্যা হাসিখুশি থাক।
ছেতেমেক হোতি দেখচি। ও খারাপ
মানুষ না। তুইতো ওরে হেই ধুক্কাকাল
থেইকাই দেইকচোস! তোর সাথে
মানাইবো। আমারে কৈল একখান
কাপড় দিতে কোবি ছেতেমরে। আর
বিয়া বাড়ি ঝাঁটা ঢোয়ায় রাহা অশুভ।
হরাও! কৈতুরী ঝাঁটা হরাও”! খলখলি দাদি এসে গোলেনুরের যন্ত্রণা- দায়ক মনপোড়া, হ্নদয় জ্বালানো ঘটনায় কিছুটা শান্তনার অহেতুক চেষ্টা করলেও গোলেনুরের ধ্যানজ্ঞান, কামনা কল্পনা এখনো স্পষ্ট মৃত স্বামীর জয়গানে আত্ন- হারা। সে চরম অসহায়। তার অসহায়ত্ত্ব সীমাহীন। এ পৃথিবীতে এমন কে আছে যে, তার বিশ্বস্ত বন্ধু, হারিয়ে যাওয়া স্বামীকে ফিরিয়ে দিতে পারবে? সারাদিন এইরুপ বিক্ষিপ্ত ভাবনায় দিনটাকে খুব দীর্ঘ মনে হয়েছে গোলেনুরের। ভাগ্যের চাল চক্রের যে দীর্ঘ অজানা পথ, তাকে পারি দিতে হবে, আজকে সেই অজানা রহস্যেভরা পথের কাছে তার আত্মসমর্পণ ছাড়া অন্য কোনো গত্যান্তর নেই।

বিবাহের আগের মেয়েদের গোসল করানো হয়। গোসল দিয়ে গোলেনুর শীতল পাটিতে বসে আছে। পাড়া প্রতিবেশিগণ এসেছে দেখতে। নৈমুদ্দিনের বিবাহের আয়োজনে ব্যস্ত। কৈতুরী খাওয়া নাওয়া নেই। হাজার কথা, লক্ষকথা হচ্ছে নিজে দের মধ্যে। হচ্ছে হাসিঠাট্টা। ডিস ভর্তি হুরুম আর গুড়ের বাতাসা। ছোট বড় সবাই খাচ্ছে। এমন সময় সাদা রঙের একটি মাইক্রোবাস নৈমুদ্দিনের বাড়ির সামনে এসে থামলো। বাস থেকে গোলেনুরের শ্বশুর শ্বাশুড়ী আর দেবর দেলবার নেমে সোজা বাড়ির ভেতরে। নৈমুদ্দিন তাদের দেখে হতভম্ব। শ্বশুর, শ্বাশুড়ী, দেবর দেলবারের উপস্থিতি বুঝতে পেরে গোলেনুর শীতল পাটিছেড়ে দরজার পাশে কপাটের আড়ালে দাঁড়িয়ে তাদের অবাঞ্ছিত আগমনে বিব্রত হচ্ছিলো। কিন্তু না! কিছু না বল্লেই এই অসময় তাদের আগমন উপস্থিতি অনভিপ্রেত। নৈমুদ্দিন জিজ্ঞেস করলো-
-“তাঐসাব! তাকী মনে কৈরা আইচেন”?
-“আইছি আমার মায়েরে নিয়া যাইতে”। এমন উত্তরে নৈমুদ্দিন কী প্রশ্ন করবে, কী উত্তর দিবে সব তালগোল পাকিয়ে ফেললো। সাবেক তাঐএর প্রতি কিছুটা রুষ্ট, ক্রুদ্ধ! তবুও কিছুটি সংযম করে বললো-
-“আপনের মাথা খারাপ হৈচে? তার
স্বামী সন্তান নাই, আর আপনে
আইচেন তারে নিয়া যাইতে।
পাগলামী ছাইড়া রওনা হন”।
-“বাবা নৈমুদ্দিন হ্যাঁ পাগল খালি আমি
হোই নাইম। আমার মায়ের জন্যে
আমরা পুরা পরিবার পাগল হৈচি।
আমরা পাগল হৈচি বৈলাই আমার
মায়েরে নিয়া যাইতে আইচি”।
-“কিন্তু গোলের তো বিয়া ঠিক হৈচে।
আগামীকাল বিয়া। আর আমি কী
বেয়াক্কেল যে আমার বোনের স্বামী
সন্তান নাই, কোন যুক্তিতে বোনরে
আপনের বাড়িতে পাঠামু”।
-“বাবা নৈমুদ্দিন আমি তোমার কথায়
গোস্যা করি নাই। আমি আমার
মায়েরে সঠিক মর্যাদা, সন্মান দিয়া
নিয়া যামু”।
-“আমার বোইন আপনের বাড়ি
থেইকা বিধবার পোষাক পৈরা
বাইর হৈচে। তারে কী কৈরা সন্মান
আর মর্যাদা দিবেন, কন? আমার
মনে হয় আপনে বিয়া ভন্ডুল কৈরতে
ভাজি দিতে আইছেন”।
-“বাবা নৈ আমার দেলবারের সাথে
আমার মায়েরে নিয়া যামু। মাইনষে
কয় আমার মায়ে অলক্ষী অপয়া।
অশুভ! আমি কই মাইনষে লক্ষীও
চেনেনা, অপয়া অশুভ কী তা তারা
জানেও না কী কও? আমি জানি,
আমি বুইঝতেও পারি, আমার
মায়ের পায়ের ধূলায় আমার ঘর
সংসার বসত বাড়ি সোনায় পরিণত
হৈচে! বজ্রপাতে আমার ছাওয়ালের
শহিদী মর্যাদায় মৃত্যু হইচে। আল্লাহ
যাকে পছন্দ করেন তাকে নিয়া যান।
সব তার ইচ্ছা। আমার এই জীবনে
হাজার হাজার নারী দেখচি, কিন্তু
আমার মায়ের মতো লক্ষী নারী,
লাখেও একজনকে দেখি নাই।
তাইতো মাকে আমার দেলবারের
সাথে নিতে আছি”।

কথাগুলো বলেই উচ্চস্বরে কান্না শুরুকরে দিলো।কান্নার শব্দে অনেক মানুষের সমাগমহলো। তার এমন প্রস্তাবে নৈমুদ্দিন বোবার মত, হত বিহবল। শ্বাশুড়ী ঘরে প্রবেশমাত্রই গোলেনুর তাকে বুকেজড়িয়ে কাঁদতে লাগলো। অলিপুর কেন্দ্রিয় মসজিদের ইমাম মাওলানা ফেরদৌস মনিরকে ডেকে অপ্রতুল সংক্ষিপ্তাকারে দেবর দেলবারের সাথে বিয়ে পড়িয়ে, ঘন্টা খানেকের মধ্যে গোলেনুরকে নিয়ে চলে গেলো। খলখলি দাদি ইতোমধ্যে ছেতেমে কাছে গোলেনুরের বিবাহের খবর পৌঁছে দিয়ে ছেতেমের পাশে শান্তনা দেবার ভূমিকায় দাঁড়িয়ে রইলো। মনের দুঃখে অপমানে ছেতেম উদভ্রান্তের মতো দাঁড়িয়ে দেখতে ছিলো গোলেনুর তার সামনে দিয়ে মাইক্রোতে চড়ে চলে যাচ্ছে। এমন দৃশ্যে ছেতেমের বুকটা ফেটে যাচ্ছে। দুচোখ চিরে হুহু অশ্রুবন্যা গামছা দিয়ে মুছে যতদুর দৃষ্টি যায় দেখলো।
দেখলো বোরোধান কাটা শস্যহীন অবারিত মাঠ, চোখের সামনে শক্তিহীন অবচেন অসহায় ভাবে শুয়ে আছে। জীবনে সবচেয়ে কঠিন একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে, বুকফাঁটা হাহাকারে নিজেকে ডুবিয়ে দিয়ে দেখতে লাগলো, দেখতে লাগলো শস্যহীন জমিতে কর্তনকৃত ধানের মোথা উন্মুক্ত আকাশের দিকে অনর্থক হা করে তাকিয়ে আছে। শুয়ে আছে বিশ্বজোড়া অসহায়ত্ত্ব আর নিরূপায় বেদনার যাতনা নিয়ে।
ছেতেম নির্বাক নিথর পাথরের মত দাঁড়িয়ে আর কী ভাবছে? বোঝা বড় কষ্টকর! তবে বেদবুদ্ধির ভাবনায় স্ত্রীহারা মানুষটি ভাবতে পারে, ভবের নাট্যশালায়, মানুষ চেনা দায়।
**সমাপ্ত**
শেখ হান্নান।
নাট্যকার লেখক
আজিমপুর, ঢাকা-১২০৫।
বুধবার ৩ নভেম্বর ২০২১।

আরও পড়ুন
অপ্রত্যাশিত দেখা!
উইশলিস্টে রাখতে পারেন তুহিন সুলতানা মুক্তি’র ” ভালোবাসতে পারো আমায় “
অটল সাহসের গান