হোম » প্রধান সংবাদ » নফল উদ্দিনের গল্প “প্রত‍্যুৎপন্নমতি”

নফল উদ্দিনের গল্প “প্রত‍্যুৎপন্নমতি”

শেখ হান্নানঃ নফল উদ্দিনের বাড়ি যমুনার চরে চরকাউলা গ্রামে। বিস্তৃর্ণ কাশবন আর চতুর দিকে যমুনার পানিবেষ্ঠিত কয়েকটি বাড়ি। বিশাল আয়তনের এই চরে জনসংখ‍্যা একশ জনের বেশি হবেনা। চরটি সিরাজগঞ্জ জেলায় হলেও যোগাযোগ টাঙ্গাইলের ভূঞাপুরের সাথে ভালো। নফল উদ্দিন এবার এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছে। পরীক্ষায় বাংলা রচনা এসেছিল “নৌকা ভ্রমণ”। পরীক্ষায় আনকমন রচনা হওয়ায় হতাশায় মুশরে পড়ছিল সে। হতাশ হলে চলবেনা। অগত‍্যা বানিয়ে নিজের মতো করে রচনা লিখে দিয়েছিল। ঢাকা শিক্ষা বোর্ডস্থ ভূঞাপুর কেন্দ্রের সেই পরীক্ষার খাতা দেখার জন‍্য পাঠানো হয়েছিল সরিষাবাড়ি হাই স্কুলের জনৈক শিক্ষকের কাছে। পরীক্ষক ১৮ নম্বর প্রশ্ন নৌকা ভ্রমণের উত্তর দেখছেন।

ছাত্র লিখেছে-
” আমার বোনের বিবাহ হয়েছে ঈশ্বরদীর দাসুড়িয়া। এসএসসি পরীক্ষা শেষে দীর্ঘ অবকাশ। তাই জৈষ্ঠ‍্য মাসের মাঝামাঝি আম লিচু মৌসুম উপভোগ শেষে বাড়ি ফিরে যাচ্ছি। টিকেট কিনে ঈশ্বরদী থেকে সুন্দরবন এক্সপ্রেসের নির্দ্ধারিত আসন গ্রহণ করলাম। টুকটাক লোকাল ট্রেন ভ্রমণের অভিজ্ঞতা থাকলেও এক্সপ্রেস ট্রেনে ভ্রমণ, এই প্রথম। ট্রেন ছেড়েদিল। ক্রমেই তার গতিবৃদ্ধি পাচ্ছে। ঝক ঝক। ঝকঝক। ছন্দময় দোতনা। জানালা দিয়ে বাইরে দৃষ্টিতে সবুজ বনবনানী, দুরে আকাশচুম্বী তালগাছটি চলমান ট্রেনের সাথে ঘরতে ঘুরতে দৃষ্টির আড়াল হয়ে যায় পরক্ষণে। শষ‍্যহীন মাঠের কোথাও কোথাও দুচারটে আখখেত, পাটখেত। ঘুরছে সবাই। আশ্চর্য! দারুন এক অনুভূতি। দৃষ্টি ফিরতে চায়না। বাহ! দূর্বারগতিতে ধাবমান ট্রেনের আমি একজন যাত্রী। একথা ভাবতেও রোমান্সিত হচ্ছে আমার তনুমন। ট্রেন থামলো চাটমহর স্টেশনে। শতশত যাত্রী। কেউ উঠছে কেউ নামছে। ডাক হাকের শেষ নেই। সাথে আছে ফেরিওয়ালাদের চেঁচামচি।ট্রেন ছেড়েদিল।”

পরীক্ষক ভাবছেন রচনা লিখতে বলা হয়েছে “নৌকা ভ্রমণ” অথচ ছাত্র লিখেছে ট্রেন ভ্রমণ। তিনি চিন্তিত হলেন। চোখের বায়োফোকাল চশমাটি মুছে আবার খাতায় মনোনিবেশ করলেন। “ট্রেনের ঝটিকা গতি। যখন ব্রীজগুলো আসে তখন ট্রেনের ঝনঝন শব্দ আর গতির দুলনী, অভূত শিহরণ খেলে যায় সকল যাত্রীদের।

ট্রেন সাঁই সাঁই করে চলতে চলতে ভাঙ্গুড়া, বড়াল ব্রীজ ছেড়ে মনে হলো বিশাল জলরাশির বুকচিরে অনির্ধারিত যাত্রি বিরতি দিল দিলপশার স্টেশনে। স্টেশনের দুপাশ থৈথৈ পানি।” পরীক্ষক কলমের মাথা কামড়িয়ে ভাবলেন- এ ছাত্র নৌকা ভ্রমণে রচনা লিখতে ট্রেনে দিলপশার নিয়ে এলো। তিনি বাইরে তাকাতেই দেখলেন, রেল লাইনের দুধারে সারি সারি অনেক নৌকা বাঁধা, ঢেউয়ের দোলায় দুলছে। অপেক্ষা করছে চলন বিলের জলবন্দী কোনো গ্রামে যাবার জন‍্য। মনে করলেন ছাত্র হয়তো ট্রেন থেকে নেমে নৌকায় উঠবে! না! সে ট্রেন থেকে নামলো না। নৌকায়ও চড়লো না। পরীক্ষক অসহায় ভাবে খাতায় চোখ বুলাতে লাগলেন। “ট্রেন আবার ছেড়ে দিল। সুন্দর বন এক্সপ্রেস। এ লাইনের দ্রুত গতির দ্রুতগামী ট্রেন। লাহিড়ী মোহনপুর, উল্লাপাড়া ঘাটিনা ব্রীজ পেরিয়ে ছাগলাপাগলা ব্রীজ, জামতৈল স্টেশন ছেড়ে হালুয়া কান্দি ঝাঐল ব্রীজ।

প্রকৃতির কী শোভা। নানা বৃক্ষ আর ফলফলাদীতে পূর্ণভূমি আমাদের সিরাজগঞ্জ, আমাদের বাংলাদেশ। স্রোষ্টা যেন না চাইতেই অকৃপাণ ভাবে ঢেলে দিয়েছে তার করুণা। এরুপ শষ‍্যসম্ভারে বৃক্ষলতা যদি যমুনা বিস্তৃর্ণচরে শোভিত থাকতো, তাহলে কত ভালোইনা হতো।”

পরীক্ষক বিব্রত। কী করবেন ভেবে পাচ্ছিলেন না। তার দীর্ঘ শিক্ষকতার জীবনে এমন আত্নভোলা ছাত্র দ্বিতীয় জন পাননি। অবশেষে ট্রেন সিরাজগঞ্জ রায়পুর, সিরাজগঞ্জ বাজার, সিরাজগঞ্জ বাহির

গোলা হয়ে বয়রাবাড়ি সিরাজগঞ্জ রেলঘাটে থামলো। পরীক্ষক ছাত্রের এমন আচরণ এবং অহমিকতায় বিস্মিত হয়ে ভাবলেন, এখন কী করা যায়? চিন্তিত হলেন। রাগলে, মাথা গরম করলে চলবে না। কারণ তিনি এখন বিচারক। ট্রেন যখন সিরাজগঞ্জ ঘাটে এসেছে, দেখা যাক এখন কোথায় নিয়ে যায়।

নফল উদ্দিন ট্রেন থেকে নেমে কোষা নৌকার যাত্রী হলেন। ছাত্র রচনার উপসংহার লেখার পূর্বে লিখেছে-” দীর্ঘ আনন্দঘন ট্রেন যাত্রা শেষে সন্ধ‍্যার কিছু পূর্ব কয়েক যাত্রী নিয়ে ইঞ্জিন চালিত নৌকায় চরকাউলীর উদ্দেশ্য যাত্রা শুরু হলো। সে বিস্ময় ভরা চোখে স্বপ্নের অঞ্জন জড়িয়ে তার ভালোবাসার ধূলোয় ধূসর কাশবনাচ্ছিদত, দুঃখিনী বানভাসীর চরকে দেখছে নফল উদ্দিন।

চরকাউলীকে যমুনার অবুঝ স্রোতধারা শতধা ক্ষতবিক্ষত করে প্রতি বছরের বন‍্যায়। দেখছে নৌকা উজান বেয়ে আসছে, কত নৌকা ভাটিয়ালি গান গেয়ে চলে যাচ্ছে নিজ নিজ গন্তব্যে। নৌকা চলছে যমুনার প্রসস্থ বুক চিরে ছলাৎ ছলাৎ শব্দে। হাতের ডানে মতিনের ঘাট থেকে ছেড়ে গেলো কয়েকটি লঞ্চ সোহাগপুর ও চৌহালীর দিকে।

আমাদের নৌকা চলছে নদীর নতুন পানির বিপরিত স্রোতমুখী হয়ে। ইতোমধ‍্যে রেলঘাট থেকে এমভি সোহরাওয়ার্দী স্টীমারটি সাইরেন বাজিয়ে আমাদের নৌকা অতিক্রম করে দ্রুত চলে গেলো জগন্নাথগঞ্জ ঘাটের উদ্দেশ্যে। নফল উদ্দিনের মনে উদয় হলো ভাবনার বেদনা।উদয় হলো ভবের হাটে মানুষের অস্তিত্বের জিজ্ঞাসা। নৌকা এবং ট্রেনের মতো কোথা হতে আসে মানুষ, কোথা চলে যায়? ট্রেন এবং নৌকা জীবন স্টেশানের এক স্থান থেকে ছেড়ে চলে যায় অপার্থিব অজনায়। শুধু চলে যাওয়া। মনে হলো রবীন্দ্রনাথের কবিতার স্তবক –
“সম্মুখে উর্মিমালা পশ্চাতে ঢেউ,

দেবনা দেবনা যেতে শোনে নাহি কেউ।” “নৌকা ভ্রমণ” প্রবন্ধের উপসংহারের নফল উদ্দিন যাই লিখুক, পরীক্ষক কী যথার্থ নম্বর দেবেন এই প্রত‍্যূৎপন্নমতির ছাত্রকে?

(একটি অনু গল্প)

শেখ হান্নান।
নাট‍্যকার লেখক

শেয়ার করুন আপনার পছন্দের সোশ্যাল মিডিয়ায়
error: Content is protected !!