হোম » প্রধান সংবাদ » ছোট গল্প “জ্বর”

ছোট গল্প “জ্বর”

বাদাম খাবেন?
অপু চোখ বদ্ধ করে ঘাসের উপর শুয়ে আছে। হাত দিয়ে চোখ ঢাকা। আজ সে চোখ বদ্ধ করে নিজেকে লুকাতে চাচ্ছে। আজ লুকানোর দিন।

বাদাম খাবেন স্যার?

অপু চোখ বন্ধ করেই রইলো। তার কথা বলতেও ইচ্ছা করছে না। শরীরের উপর যেন কিছু একটা ভর করেছে। শরীরের এক একটা পার্টস পাথরে রুপ নিয়েছে। সে যেভাবে ছিলো সেভাবেই শুয়ে রইলো। নড়তে চাচ্ছে কিন্তু পারছে না।

এখনকার বাদাম চা ওয়ালারা নাছোড়বান্দা টাইপ হয়। এরা পন করেই থাকে ক্রেতার কাছ থেকে কিছু একটা সাড়া না পাওয়া পর্যন্ত যাবে না। অপু টের পেল চা বেটা পাশে এখনো দাড়িয়ে।

বছর দশেক হলো অপু আর নিপার একসঙ্গে বাসবাস I একে অন্যকে খুব ভালোবাসে, অকপট ভালোবাসাI ভালোবাসা টান সাধারণ এতোদিন থাকে না, ওদের আছে। মিস করে একে অপরকে।

এই যেমন এখন সে নিপাকে মিস করছে।
অপু পার্কে নিপাকে নিয়ে আসলেই বাদাম খেত। এটা প্রেম পর্যায়ের কথা। প্রেমে পড়লে কপতকপতিদের বাদাম খাওয়া আমাদের দেশে একটা ঐতিহ্য। অপু বেশ ঐতিহ্য সচেতন। অপুর এই বাদম খাওয়া দেখে নিপা একবার বলেছিলো, জানো তো পার্কে কোন প্রেমিকরা বাদাম খায়

না জানি না।

যাদের পকেটে টাকা থাকে না তারা। বেকার প্রেমিকরা।

অপু অনেক লজ্জা পেয়েছিল কথাটি শুনে। কারন তখন সে বেকার। অপু বলেছিল, যখন অনেক টাকা হবে তখন খাবো না।এখনতো বেকার এখন খাই বলেই নিপার মুখের দিকে তাকায়-

শুনে নিপা হেসে কুটিকুটি হতো। অপুর স্বলজ্জ চেহারা দেখে ও মজা নিতো।

অপু এখন আর বেকার না। একটা বহুজাগতিক কম্পানিতে সে চাকরি করে, তবে বাদাম খাওয়া ছাড়ে নি। ছাড়তে পারে নি।

অপু চাকরি আর নিপা ঘর সামলাতে ব্যাস্ত। নিপা মস্ত সাংসারিক। দৈনন্দিন খরচ জমার হিসাব কষতে মত্তI

না পাওয়া সম্পর্ক গুলোর মধ্যে কেমন যেন আলাদা একটা মাদকতা থাকে, কিভাবে যেন ওদের সম্পর্কে সে মাদকতা আছে। সাধারণত এক বিছানায় পাঁচ বছর থাকলে এই উন্মাদনা কমে যায় ওদের হয়েছে উল্টো। বেড়েছে।

তিনদিন আগে অপুর জ্বর এলো। প্রচন্ড জ্বর। থেমে থেমে কাঁপুনি দিয়ে জ্বর। তিন দিন পর জ্বর কমলো। কিছু মুখে দিতে পারছিল না। নিপা ঝালঝাল মাংস বানায় , বেশি কাঁচামরিচ দিয়ে চিকেন স্যুপ দেয়। ঝাল হলে কিছুটা খাওয়া যায়।

শরির দুর্বল বলে অফিসে যায় নি। ছুটি নিয়ে বাসায়।তাছাড়া করোনার টেস্টের রিপোর্টও হাতে আসে নাই।

নিপা ওর ল্যাপটপ ওপেন করেই রান্নঘরে গেছে রান্না করতে। অপু বলেছে গরুর মাংস রান্না করতে। গরম মসল্লা বেশি দিয়ে।

জ্বর হওয়ার সুবিধে হল, হঠাৎ করেই নিজেকে খুব স্পেশাল ফীল করাতে পারা যায়…

ল্যাপটপের মেসেঞ্জার কে যেন কিছুক্ষণ পর পর নক করছে। অপু শুয়েই ছিলো। সে বিছানা থেকে উঠে ল্যাপটপ বন্ধ করতে গেলো। শব্দটায় খুব ডিসটার্ব হচ্ছে। স্ক্রিনে তাকাতেই দেখে নয়ন নিপাকে নক করছে।

নয়নের কথা সে শুনেছে নিপার কাছে। স্কুলে একই সাথে পড়তো। নয়ন আর নিপার বাসা ছিলো পাশাপাশি দুই ইউনিট। খুব ভালো বন্ধু ওরা। বেস্ট ফ্রেন্ড।

অপু কৌতুহল বসত মেসেঞ্জারে চোখ রাখলো। চারদিন আগে দুপুর তিনটা দশ মিনিটের বার্তা-
আজ আমি পার্লার থেকে চুল ছেটে আসলাম। তুই স্কুলে থাকতে যেটা পছন্দ করতি সেই কাট।
অপু দেখলো উপরে নিপার নতুন চুল ছাটের ছবি।

নয়নের রিপ্লাই : তোকে খুব সুন্দর লাগছে।
সত্যি!
হুম আগের সেই পরির মতো।

পাঁচদিন আগের বার্তা। দুইটা পন্চাশ মিনিট।
নিপা : জানো খুব মন খারাপ আজ।
কেনো, কি হয়েছে?
নিপা : জানি না। তুই ফ্রী আছিস?
আছি।
চলে আয়। আজ আমারা একটু ঘুরি।
আসছি।

অপুকে নিপা এখনো বলেনি ওরা ঘুরতে গিয়াছিলো। বললে কি অপু মানা করতো? অপু অনেক চিন্তা করেও মনে করতে পারলো না সেদিন নিপার মন খারাপ ছিলো কিনা। কৈ নিপা তো ওকে কিছু বলেনি। চুলের….. নিপা কি কিছু লুকাচ্ছে। কেন?

অপু আর কোন মেসেজ পড়লো না।ল্যাপটপ বন্ধ করে দিলো। অপু টের পেলো হটাৎ ই শরির ঘামা শুরু করলো। হয়ত তেমন কিছু না তবুও ওর ভেতরটা মোচর দিয়ে উঠলো।অপুর ভেতরটা হটাৎই ফাঁকা হয়ে গেলো। ভরাট বিশস্ত পৃথিবী ফাঁকা শূন্য মনে হলো।অপু নিজেকে বোঝালো ওরা তো বেস্ট ফ্রেন্ড। অনেক কিছু শেয়ার করতেই পারে। নিপার এমন অনেক কিছু আছে যা হয়ত আমি জানি না, নয়ন জানে। হতেই পারে!

পৃথিবীতে ভালো স্বামী থাকতে পারে, বেস্ট স্বামী নাই। বেস্ট স্ত্রী ও নাই। বেস্ট ফ্রেন্ড আছে।

খুব বেশি জ্বর হলে শরিরে তাপ পানি হয়ে চোখ দিয়ে পড়ে, খুব কষ্ট হলে মনের তাপে হৃদয়ের চোখে ক্ষরন আসে।

অপুর অনেক কিছু মনে পড়ছে। জ্বর হলেই যে পুরানো সমস্ত কথা, স্মৃতি, ঝগড়া, প্রেম, চুমু, ক্ষোভ, অভিমান এভাবে মনে পড়বে এবং বুকের ভেতরে একরাশ শূন্যতা হু হু করে হৃদয় উগরে দেবে অপু সেটা কি জানত!

তিনদিনের জ্বরই অপুকে বুঝিয়ে দিলো পৃথিবীর সমস্তটাই ক্ষণিক… সমস্তটাই ম্রিয়মান… কেন জ্বর হলেই কেবল প্রলাপ বকি, হৃদয়র মোচড় বুঝি!
অপু আসলেই প্রলেপ বকছে। ছোট ব্যাপারকে অনেক বড় করে দেখছে! পরে দেখা যাবে কিছুই না।

অপুর সমরেশের কোন একটা বইয়ে পড়েছিল :
“ছেলেরা ভালোবাসার অভিনয় করতে করতে যে কখন সত্যি সত্যি ভালোবেসে ফেলে তারা তা নিজেও জানেনা। মেয়েরা সত্যিকার ভালোবাসতে বাসতে যে কখন অভিনয় শুরু করে তারা তা নিজেও জানেনা”।
আবার সেই উল্টাপাল্টা ভাবনা। অপুকে এখন বেরোতে হবে।”

পাঠক ঠিক বলতে পারবে সমরেশের কথাটা ঠিক নাকি ভূল।

অপুর এই ঘোর থেকে বেরোতে হবে। ও ঠিক করলো সে রমনা পার্কে যাবে। যেখানে ওদের দেখা হতো। ওখানে গেলে ওর মন শান্ত হবে। নিপাকে এ নিয়ে এখন কিছু বলা ঠিক হবে না। মানুষ সব বড় বড় অঘটন রাগের মাথায় ঘটায়।

স্যার বাদাম নিবেন। ও স্যার নিবেন?

নিবো। তোর কাছে কতো কেজি বাদাম আছে?
একা মানুষ এতোগুলো বাদাম দিয়ে কি করবেন?
খাবো? তোর কাছে কয় কেজি আছে?
তিন কেজি
দাম কতো?
আমি বেচুম না।
কেন?
এতো বাদাম দেয়ার ঠোঙা নাই।
সেই চিন্তা আমার। এইনে ছঁয়শ চার টাকা। চার টাকা দিয়া দুইটা পলিথিন আইনা বাদামগুলো ভরে দে।
আমিতো দাম কই নাই স্যার।
দাম আমি জানি।

অপু দরজায় কলিং বেল বাজাচ্ছে। অপুর কলিং বেল বাজানোর নিয়ম হলো পরপর দুইবার বাজিয়ে এক মিনিট দাড়িয়ে থাকা। এই এক মিনিটের ভেতরে নিপা দরজা খুলে। কখনো এর ব্যত্যয় হয় নাই। আজও না।
দরজা খুলেই নিপার চোখ গেল অপুর হাতে।
এগুলো কি?
বাদাম।
নিপার চোখের দিকে তাকিয়ে অপু বুঝতে পারছে নিপা প্রচন্ড রেগে আছে। ওকে কিছু না বলে এই দুর্বল শরিরে অনেক্ষণ অপু বাইরে। মোবাইলটাও সাথে ছিলো না। নিপা এতোই রেগেছে যে, রাগে কিছু বলতে পারছে না। এখনই কেঁদে দিবে।নিপার এই রাগ মিশ্রিত ভালোবাসাকে অপু কিভাবে অগ্রাহ্য করে। এখানেতো কোন লুকোচুরি নাই। ফাঁকি নাই। নিখাদ।

মানুষের জীবন বিভিন্ন অধ্যায়ে বিভক্ত। সব অধ্যায়ে সবার প্রবেশাধিকার থাকে না।

যে জীবনের গহীনে কোন গল্প থাকে না সে জীবন কোনো স্বপ্নও আঁকে না।

নিপারও একটি স্বপ্ন আছে। বুকের গহিনে প্রতিটি মেয়ে যে স্বপ্ন আঁকে রক্তের আঁচড়ে। নিপা সেখানে নিঃস্ব, নিঃসঙ্গ। অপু পারেনি সেই নিঃস্বতা পূরন করতে।

অপুও কাঁদে। নিজে নিজে।
লুকায় নিজেকে, নিজের কাছে।

লেখক: কাজী তবিবুর রহমান।

শেয়ার করুন আপনার পছন্দের সোশ্যাল মিডিয়ায়
error: Content is protected !!