হোম » প্রধান সংবাদ » সুনামগঞ্জে ২য় দফায় বন্যাপ্লাবিত ভানবাসীদের করুন আর্তনাদ শেষ পর্যন্ত কোন বার্তা নিয়ে আসে সেদিকে দৃষ্টি এখন সকলের

সুনামগঞ্জে ২য় দফায় বন্যাপ্লাবিত ভানবাসীদের করুন আর্তনাদ শেষ পর্যন্ত কোন বার্তা নিয়ে আসে সেদিকে দৃষ্টি এখন সকলের

আল-হেলাল,সুনামগঞ্জ : সুনামগঞ্জে এক সপ্তাহের ব্যবধানে ২ বারের ভয়াবহ বন্যা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেইসবুকে নানান জনের নানান মতামত পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু আসল বিষয়টি কেউই আমলে নিচ্ছেননা। সেটি হচ্ছে এই যে,বারংবারের এই বন্যার জন্য একমাত্র দায়ী প্রতিষ্ঠান হচ্ছে সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ড। পানি উন্নয়ন বোর্ডের সাথে জড়িত জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের কাবিটা বাস্তবায়ন কমিটি এবং প্রত্যেকটি পিআইসির সভাপতি সচিবরা যারা বন্যার্ত জনসাধারনের এই কঠিন দূরাবস্থার জন্য দায়ী। প্রকাশ করা আবশ্যক যে,এবার সুনামগঞ্জ জেলায় সর্বমোট ৭৪৫টি পিআইসির মাধ্যমে বেড়ীবাঁধের প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়েছে। মোট বরাদ্দকৃত অর্থ ছিল ১৩২ কোটি ১লক্ষ ৬৭ হাজার টাকা।

তন্মধ্যে পানি উন্নয়ন বোর্ড একশো কোটিরও বেশী টাকা পরিশোধ করে দিয়েছে। এর আগের বছর ২০১৮-১৯ অর্থবছরে মোট পিআইসির সংখ্যা ছিল ৫৭২টি। এর মধ্যে কয়েকটি পিআইসি বাতিল করে দিয়েছিলেন সাবেক জেলা প্রশাসক মোঃ সাবিরুল ইসলাম। সে বছর ৮০ কোটি টাকা পিআইসিদের অনুকূলে বিল হিসেবে প্রদান করা হয়েছিল। সে বছর বাম্পার ফলনও হয়েছিলো। বন্যাও হয়নি। তৎকালীন জেলা প্রশাসক মোঃ সাবিরুল ইসলাম জেলা কাবিটা বাস্তবায়ন কমিটির সভাপতি হিসেবে তার নিবিড় তত্ত¡াবধানে বাঁধের কাজগুলো সুচারুরুপে সম্পন্ন করেছিলেন।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে গত বছরের ৫৭২টি বেরীবাঁধই যেখানে হাওরের ফসল রক্ষার জন্য যথেষ্ট ছিল এবার ১৭৩টি অতিরিক্ত অপ্রয়োজনীয় বাঁধ এবং পিআইসি নেয়া হয়েছে কার স্বার্থে ? অতিরিক্ত অপ্রয়োজনীয় বাঁধগুলো কি শুধু শুধু ব্যক্তিগোষ্ঠীর পকেটভারী করার স্বার্থে নেয়া হয়েছে নাকি অতিরিক্ত বাঁধ/পিআইসি দিয়ে হাওরবাসীকে বারংবারের বন্যায় ডুবিয়ে মারার একটি পরিকল্পিত মাস্টারপ্ল্যান ছিল সে প্রশ্ন এখন জনসাধারনের মুখে মুখে। বিজ্ঞজনেরা বলছেন এবারের বাধগুলো ছিল গতবারের বাঁধের উপর নির্মিত বাঁধ বা পুরোনো বাঁধের মেরামত কাজ যেখানে গতবারের বরাদ্দের ৫০% টাকাই যথেষ্ট ছিল সেখানে অতিরিক্ত বরাদ্দ নির্ধারন করা হয়েছে কার স্বার্থে। হিসেব মিলিয়ে জেলার সচেতন মহল বলছেন,এ যেন নতুন বোতলে পূরনো মদ। ২০১৬ সালে কুখ্যাত ঠিকাদারী প্রথায় বাঁধ না করেই আগাম বন্যায় ব্যপক ফসলহানী ঘটানো হয়েছিল আর এবার অতিরিক্ত অপ্রয়োজনীয় বাঁধের মাধ্যমে জমিতে ফসল না ডুবিয়ে কৃষকদের ঘরে রেখে বাড়ীঘর সহায় সম্পদসহ ফসল ডুবানো হয়েছে। বিষয়টি অতীব গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করে আইনগত পদক্ষেপ নেয়ার দাবী উত্থাপন করেছেন হাওর বাঁচাও সুনামগঞ্জ বাঁচাও আন্দোলনের সভাপতি এডভোকেট বজলুল মজিদ খসরু ও সাধারন সম্পাদক বিজন সেন রায়।

এদিকে চলতি ২য় দফা বন্যা চলাকালে প্রথম দফা বন্যাতে নির্বাচনী এলাকায় অবস্থান গ্রহন করে ত্রাণ তৎপরতায় ব্যস্ত ছিলেন সুনামগঞ্জ ২ নির্বাচনী এলাকা দিরাই-শাল্লা থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য ড. জয়া সেন গুপ্তা এমপি। ২য় দফা বন্যা শুরু হতে না হতেই শুক্রবার দিরাই উপজেলার জগদল কলেজে বন্যা আশ্রয় কেন্দ্রে অসহায় বন্যার্তদের মাঝে ত্রাণ বিতরন করেছেন তিনি। দিরাই’র আওয়ামী লীগ,যুবলীগ,ছাত্রলীগ নেতৃবৃন্দ তার সাথে উপস্থিত ছিলেন। মানবতার নেত্রী হিসেবে তাকে কাছে পেয়ে এলাকাবাসী কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন।

বন্যার কথা উল্লেখ করতে গিয়ে সিলেট-সুনামগঞ্জ সংরক্ষিত আসনের এমপি এডভোকেট শামীমা শাহরিয়ার বলেন,চলতি বন্যায় ভাসছে হাওর। বিঘিœত হচ্ছে জনজীবন। প্রিয় হাওরবাসী,এই প্রাকৃতিক দুর্যোগে আমাদের সাহস ও সততা নিয়ে মোকাবেলা করতে হবে। যাদের ঘর বন্যার পানিতে প্লাবিত হয়েছে তারা নিকটস্থ আশ্রয় কেন্দ্রে যান। নিজে ও নিজের পরিবারকে সুরক্ষিত রাখুন এবং ছোট শিশুদের প্রতি দৃষ্টি রাখুন। সংক্রমন এড়াতে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকুন। ফুটানো কিংবা বিশুদ্ধ খাবার পানি পান করুন।

জেলা আওয়ামীলীগ সভাপতি সাবেক এমপি আলহাজ্ব মোঃ মতিউর রহমান বলেন, সুনামগঞ্জ সহ সারা বাংলাদেশ আজ চরম ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। বৈশ্বিক মহামারি করোনাভাইরাস এর আতঙ্কে আতঙ্কিত সুনামগঞ্জ সহ সারা বাংলাদেশ এর মানুষ। তার মধ্যে আমার প্রাণপ্রিয় সুনামগঞ্জ জেলা আজ বন্যাপ্লাবিত। পরম করুণাময় মহান রাব্বুল আল আমীন আমাদের এই মহাবিপদ থেকে উদ্ধার করুন। আল্লাহ পাক এর কাছে আমাদের এটাই প্রার্থনা। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু কন্যা জননেত্রী দেশরতœ শেখ হাসিনা’র নেতৃত্বে এবং বিচক্ষণতায় আমরা এই অদৃশ্য শক্তি মহামারি করোনার সাথে যুদ্ধ করে যাচ্ছি। আমাদের ডাক্তার,পুলিশ,প্রশাসন সহ বাংলাদেশ আওয়ামীলীগ যতটুকু সম্ভব আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে মানুষের সুরক্ষার জন্য। তিনি বন্যার্ত মানুষের পাশে দাড়ানোর জন্য দলীয় নেতাকর্মীদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন।

জেলা আওয়ামীলীগের সাধারন সম্পাদক ব্যারিস্টার এম এনামুল কবির ইমন বলেন,এমনিতেই করোনা সংক্রমণ সংকটের চার মাস অতিক্রম করছে দেশবাসী তার উপর পাহাড়ি ঢলে প্লাবিত হয়ে পড়েছে সুনামগঞ্জের জেলা শহর সহ নিম্নাঞ্চল । শনিবার দিনের বেলায় একটু তুলনামূলক কম বৃষ্টিপাত হওয়ায় শুরু হয়েছে আরেক সমস্যা নদীর দিকের পানি কমছে আবার হাওর দিকের পানি বাড়ছে। আমার বাসার সামনেও পানি ছুঁইছুঁই করছে। সুনামগঞ্জ পৌর এলাকার হাসন নগর, পাঠানবাড়ি, হাসনবসত সহ কলেজ এলাকার বহু বাড়িঘর পানিতে নিমজ্জিত। ডিসি সাহেবকে বলে সরকারি কলেজে সাধারণ মানুষের থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে। আসলে মানুষের এই যে কষ্ট তা নিজের চোঁখে না দেখলে বুঝা যায় না। একটার পর একটা প্রাকৃতিক দূর্যোগ মানুষের নাভিশ্বাস করে ফেলেছে। তবে কোন কিছুই চিরস্থায়ী নয়। আমাদেরও এই দূর্দিন চিরদিন থাকবে না। সাহসের সঙ্গে আমাদের মোকাবেলা করতে হবে। পৃথিবী আবার শান্ত হবে, জয় আমাদের হবেই ইনশাআল্লাহ।

তাহিরপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার পদ্মাসন সিংহ বলেন, বন্যার্তদের এই অসম সাহস,কঠিন মনোবল আর অপরিসীম জীবনীশক্তি আমাকে উজ্জীবিত করে। তাঁদের এই সাহস আর মনোবলকে আমি অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে শ্রদ্ধা করি। বেঁচে থাকার জন্য এরকম কঠিন সংগ্রাম বোধ হয় এর আগে দেখিনি। পানি শুকিয়ে গেলে এঁরাই দিন-রাত কঠোর পরিশ্রম করে নিজেদের অন্ন যোগানোর পাশাপাশি দেশের অর্থনীতির প্রবৃদ্ধিতে অবদান রাখবে। সরকারের পক্ষ থেকে এইসব মানুষদের জন্য সামান্য প্রণোদনা হিসেবে উপজেলা প্রশাসন, তাহিরপুর কিছু শুকনো খাবার বিতরণ করে।

সাব্বির আহমদ ফারুক বলেন,সুনামগঞ্জে আগের চেয়েও ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতি বেসামাল। ১১ জুলাই সুনামগঞ্জের ৮০% বাড়িতে চুলায় আগুন জ্বলছেনা মানুষের কান্নায় চুখের পানি বন্যার পানিতে ভাসছে। গবাদি পশুগুলো নিরুপায় হয়ে পানিতে দাড়িয়ে আছে পুকুরের মাছ সব চলে গেছে। মানুষের আহাজারি আর কাঁন্না ছাড়া সুনামগঞ্জবাসীর যেন আর কোন ভাষা নেই।

সুনামগঞ্জ ৫ নির্বাচনী এলাকা ছাতক-দোয়ারাবাজার থেকে নির্বাচিত এমপি মুহিবুর রহমান মানিকের একান্ত সহকারী মোশাহিদ আলী বলেন,বছরের ২য় দফা পাহাড়ি ঢল সৃষ্ট বন্যায় ছাতক ও দোয়ারা বাজার উপজেলার সব কয়কটি ইউনিয়নে বন্যা পরিস্থিতির চরম অবনতি হয়েছে। ছাতকে সুরমা নদীর পানি বিপদ সীমার ১৭১ সেঃ মিঃ এবং সুনামগঞ্জে ৫৪ সেঃ মিঃ উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। পানি বৃদ্ধি এখনো অব্যাহত আছে। ছাতক ও দোয়ারা বাজারের সাথে সারা দেশের সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। উপজেলা সদরের বহু দোকানপাট, বাসাবাড়ীতে পানি উঠেছে। বন্যার পানিতে নিম্নাঞ্চলের অধিকাংশ বসতবাড়ী ইতিমধ্যে তলিয়ে গেছে। হাজার হাজার মানুষ পানিবন্দী অবস্থায় আছেন। উদ্ধার ও ত্রান তৎপরতা দ্রæত শুরু করা উচিত।

দৈনিক সুনামগঞ্জ প্রতিদিন পত্রিকার সম্পাদক আহমদুজ্জামান চৌধুরী হাসান বলেন,২০০৪ সালের বন্যা এবং এবারের দুদফায় বন্যায় দেখা গেছে পাহাড়ী ঢলের আগ্রাসনসহ বন্যায় সবার আগে প্লাবিত হচ্ছে সুনামগঞ্জ শহর। পাহাড়ী ঢল এবং বন্যার পানি প্রথমে আঘাত হানছে শহরের উত্তরপ্রান্তে পরবর্তীতে শহরের দক্ষিণ প্রান্তে। এর আগে ঢল ও বন্যার পানির আঘাতে লন্ডভন্ড হচ্ছে সুরমা পাড়ের উত্তর এলাকার বিস্তীর্ণ জনপদগুলো। ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে শহরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সড়ক হালুয়ারঘাট টু নবীনগর রাস্তাটি। ঐ রাস্তা দিয়ে চলাচল করে সদর উপজেলার ৩ ইউনিয়নের প্রায় লক্ষাধিক জনগোষ্ঠী। তাই এগুলোকে রক্ষা করতে হলে একদিকে নবীনগর রাস্তাটিকে প্রশ্বস্থসহ সিলেট-সুনামগঞ্জ সড়কের সাথে সংযুক্ত করে প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে হবে। অন্যদিকে হালুয়ারঘাট বাজার,মইনপুর,ইব্রাহিমপুর ও সদরগড় গ্রামগুলোকে রক্ষা করার জন্য জনপদ রক্ষা বাঁধ নির্মাণ করতে হবে। শহর রক্ষা ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাঁধ দিয়ে পাহাড়ী ঢলের পানির প্রবল ¯্রােতকে নিয়ন্ত্রণে না আনতে পারলে সুনামগঞ্জ শহরকে ভবিষ্যতে টিকিয়ে রাখা সম্ভব হবেনা।

সুনামগঞ্জ জেলা আওয়ামীলীগের কার্যকরী সদস্য সাবেক উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান ফেরদৌসী সিদ্দকা বলেন,ফসল রক্ষা বাঁধের নামে অপরিকল্পিত ও অপ্রয়োজনীয় পিআইসি নিয়ে হরিলুট হয়েছে সুনামগঞ্জে। কতবার পাহাড়ী ঢল হয়েছে কোনবারই সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার সুরমা ইউনিয়নের সদরগড়,ইব্রাহিমপুর ও মইনপুর গ্রাম প্লাবিত হয়নি। প্লাবিত হয়নি হালুয়ারঘাট মঙ্গলকাটা বাজার সড়ক। কিন্তু এবার সুরমা ইউনিয়নে অপ্রয়োজনীয় ১২টি বাধ দেওয়ায় উত্তর সুরমার ৩টি ইউনিয়ন বন্যায় সবচেয়ে বেশী ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। এই অপরিকল্পিত বাঁধের কারণে সবার ঘরবাড়ি ডুবে গেছে। এজন্য দায়ী ব্যক্তিদের চিহ্নিত করা দরকার।

এ্যাডভোকেট কল্লোল তালুকদার চপল বলেন,প্রতি বর্ষায় টানা দুয়েক দিনের বর্ষণে সুরমা প্লাবিত হয়ে সুনামগঞ্জ শহর জলনিমগ্ন হয়ে পড়ে। অপরিকল্পিত নগরায়ণ, শহরের প্রাকৃতিক খাল, নালা, জলাধার ভরাট প্রভৃতি নানাবিধ কারণে জল নিষ্কাশন বিলম্বিত হয়। জলাবদ্ধতার কারণে জনদুর্ভোগ ক্রমশ বেড়েই চলেছে। সেই সঙ্গে আছে প্রতি বছরের লক্ষ লক্ষ টাকার সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি। এই নিত্য দুর্ভোগ থেকে পরিত্রাণের জন্য একটি শহররক্ষা বাঁধ নির্মাণ একান্ত প্রয়োজন। সুরমার পাড় ঘেঁষে শহররক্ষা বাঁধ সুপরিকল্পিতভাবে নির্মিত হলে গণদুর্ভোগ তো লাঘব হতোই, আরও নানাভাবে শহরবাসী উপকৃত হতো। শহরে কোনও পার্ক নেই। রিক্সা-অটো প্রভৃতির দ্রুত সংখ্যা বৃদ্ধির কারণে রাস্তায় হাঁটা দায়। একটি পরিকল্পিত বাঁধ নির্মিত হলে পার্কের চাহিদা যেমন পূরণ হতো, সেই সঙ্গে অপরূপা সুরমার নৈসর্গিক সৌন্দর্যের মধ্যে স্বাস্থ্যরক্ষার জন্য মানুষ হাঁটাহাঁটিরও সুযোগ পেয়ে যেতো। ফলে শহরের সৌন্দর্য বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে মানুষের শরীর-স্বাস্থ্যেরও উন্নতি হতো।

সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলে বন্যার কারন ও করণীয় সম্পর্কে ফাজিলপুর বালিপাথর মহালের ইজারাদার ফেরদৌস আলম বলেন,উজান থেকে নেমে আসা পানিতেই সুনামগঞ্জ প্লাবিত হয়। অতীত কাল থেকেই এখানের জলবায়ূর পরিবেশ দেশের অন্যান্য এলাকা হতে আলাদা। ইতিমধ্যেই অপরিকল্পিত উন্নয়নের নামে স্বাধীনতা পরবর্তি বছর বছর সড়ক নির্মান হাওরক্ষা বাঁধ দেয়া নদী খালগুলো ভরাট হয়ে যাওয়া অনেক ছোট ছোট নদী ও খাল বন্ধ করে দেওয়ার কারনে পরিবেশ বিপর্যয় ঘঠেছে। ফলে পাহাড়ী ঢল পরিমানের চেয়ে একটু বেশী হলেই বন্যার সৃষ্টি হয়।

১। আশির দশকে হাওরাঞ্চলে বেঁরী বাঁধের সূচনা হয়। পানি উন্নয়ন বোর্ড হাওরগুলোর বেঁরী বাঁধের সম্ভাব্যতা যাচাই করে যে সুপারীশ করেছিল এই সুপারীশই এখন এই অঞ্চলে গলার ফাঁস হয়ে দাড়িয়েছে। প্রতিটা হাওরের পাশ দিয়া কোননা কোন নদী বয়ে গেছে। নদীগুলো তখনেই নাব্যতা হারিয়েছে। নদীগুলো খনন না করে হাওরের কিনার হতে মাটি তুলে বছর বছর বেঁরী বাঁধ নির্মান করা হয়েছে,আর বর্ষার ঢেউয়ে বাঁধ ভেঙে মাটি পাশের নদীতে ফেলেছে। এতে করে নদীর তলদেশ আরো উচু হয়েছে। এইভাবে বাঁধের কাজ হচ্ছে প্রায় ৪০ বছর যাবৎ। ৪০ বছরে গড়ে ৩/৪ ইঞ্চি করে ভরাট হলেও নদীগুলো ১০-১৫ ফুট ভরাট হয়েছে। বিগত ৩/৪ বছর যাবৎ বেঁড়ী বাঁধগুলো আরো উচু ও প্রশস্ত করে দেওয়া হচ্ছে। ইহাতে আগাম বন্যার হাত থেকে ফসল রক্ষা হলেও বর্ষাকালিন বন্যার কারণ বেশী আকারে বৃদ্ধি পাচ্ছে।
২। সুনামগঞ্জ,নেত্রকোনা,সিলেট, মৌলবীবাজার,কিশোরগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া হবিগঞ্জের নদী ও হাওরের পানি নিষ্কাসিত হয় ভৈরবের কাছে মেঘনা নদীর মাধ্যমে। হাওরে বেড়ীবাঁধ নির্মানের পূর্বে বর্ষার প্লাবনের পানি নদীসমুহ ও হাওরের উপর দিয়ে গিয়ে মেঘনায় পতীত হয়। কিন্তু ইদানীং হাওরের বেড়ীবাঁধ নির্মানে অনেক জায়গায় স্থায়ী সড়ক নির্মান হয়েছে। এই সকল বাঁধ ও সড়ক সমূহে ভাটিয়াল জলরাশী বাধাপ্রাপ্ত হয়ে ফুলে উটে হাওর এলাকায় বন্যার সৃষ্টি করছে।
৩। সুরমা,কুশিয়ারা, মনু, শুমেস্বরী ইত্যাদী নদী সমূহ সরাসরী ভারতের গাড়ো খাসীয়া পাহাড় হতে উৎপত্তি। কিশোরগঞ্জের ইটনা উপজেলায় ধনু নদীর মাধ্যমে ভৈরবের কাছে মেঘনায় মিলিত হয়েছে। উজানের কয়েকটি নদীর পানি একমাত্র ধনুনদী দিয়াই যেতে হয়। তাই নিষ্কাশনের জন্য ধনু নদীর রাস্তাটি খুবই সরু। তাছাড়া ধনু নদীর গভীরতা হারিয়েছে অনেক আগেই। যে কারনে উজানের পানি নিষ্কাসিত না হওয়ায় হাওর এলাকায় বন্যার প্রাদুর্ভাব আরো বেড়ে গেছে।
এমতাবস্থায় তিনি সুপারিশ করেন (ক) জেলার প্রধান নদী সমূহ অনতিবিলম্বে খনন করা আবশ্যক (খ) হাওরাঞ্চলের জেলা সমূহের ছোট বড় বন্ধ হয়ে যাওয়া নদী খাল গুলো খুলে দিতে হবে (গ) অপরিকল্পিতভাবে নির্মিত সড়ক গুলোতে প্রয়োজনীয় ব্রীজ কার্লভার্ট নির্মানের মাধ্যমে পানি চলাচলের পথ সুগম করতে হবে (ঘ) হাওর এলাকায় নদীগুলোকে খোদাই করে তীরে নির্মিত বেড়ীবাঁধ সমূহের উচ্চতা কমিয়ে এগুলোকে পাকাকরনের মাধ্যমে স্থায়ী রুপ দিতে হবে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের পরিকল্পনা দেখে মনে হচ্ছে ভাটি এলাকার প্রাকৃতিক পরিবেশ ও প্রতিবেশ সম্মন্ধে যথেষ্ট ধারণার অভাব। কেননা ফসল রক্ষার বাঁধে বর্ষাকালিন বন্যা সৃষ্টি হতে পারে সে বিষয়টিকে গুরুত্ব দেয়া হয়নি। তাই ফসলহানীর বন্যা এবং বর্ষাকালিন বন্যার কারণ মাথায় রেখেই হাওর এলাকার বেড়ীবাঁধ সহ সকল উন্নয়নমূলক কাজগুলো করা আবশ্যক।
জাতীয় পার্টির নেতা সাজ্জাদুর রহমান সাজ্জাদ বলেন,ঘরে বাইরে পানি, দায়িত্ব্যপ্রাপ্ত সচিব মহোদয় ঢাকায় থেকে কি হাওরের পানির হুঙ্কার শুনছেন? করোনাকালে দ্বিতীয় দফা বন্যায় আক্রান্ত প্রিয় সুুনামগঞ্জ। মানুষের কষ্ট বাড়ছে দূর্ভোগ বাড়ছে। পাহাড়ী ঢল যেমন অব্যাহত বৃষ্টিও তাল মিলিয়ে ঝরছে। এত বৃষ্টি। পানি আরও কয়েকদিন বাড়ার কথাই বলছেন আবহাওয়াবিদরা। ইতোমধ্যেই অনেক পানিবন্দী মানুষ বিভিন্ন বিদ্যালয়ে আশ্রয় নিয়েছেন পরিবার পরিজন সহ। সুুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসন স্কুল গুলোকে বন্যাশ্রয় কেন্দ্র হিসাবে ঘোষণা দিয়েছেন। প্রাপ্ত সরকারী অনুদান অসহায় মানুষদের মাঝে বিতরণ হচ্ছে ঢিমেতালে। তবে তা পর্যাপ্ত নয় নগণ্যই বলা যায়। সেখানেও অনিয়ম। হাওরের মানুষের এই মহাসংকটে হাওরের মানুষের সহযোগিতা প্রয়োজন। রাস্তাঘাট ভাঙ্গন ও নদী ভাঙ্গনে এখানে দূর্বিষহ জীবনযাত্রা মানুষের। খাদ্য সঙ্কট নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন সঙ্কট এখন প্রকট। সরকারের পক্ষ থেকে আরো বেশী সহযোগিতা প্রয়োজন। বন্যা পরিস্থিতিতে সরকার একজন সচিব কে দায়িত্ব দিয়েছেন জেলার দেখভাল করতে। আমরা উনার কাছ থেকে বিবৃতি চাই, তিনি কি করছেন কি করবেন আগামীতে হাওরের বিপদে।
শেষপর্যন্ত ২য় দফায় বন্যাপ্লাবিত ভানবাসীদের করুন আর্তনাদ সরকারের নীতিনির্ধারকদের সামনে কোন বার্তা নিয়ে আসে সেদিকে দৃষ্টি এখন সকলের।

শেয়ার করুন আপনার পছন্দের সোশ্যাল মিডিয়ায়
error: Content is protected !!