হোম » প্রধান সংবাদ » আমার লেখা বই এর খণ্ডিত অংশ

আমার লেখা বই এর খণ্ডিত অংশ

বেবী কারফরমা : নজরুলকে জানতে গেলে যেমন তাঁর পরিবারকে জানা দরকার ঠিক তেমনই তাঁর চাচা বজলে করিমকে না জানলে কবি পরিবারের প্রতি অন্যায় করা হবে। নজরুলের উত্তরাধিকার সুত্রে পাওয়া গুণের বীজ চাচা বজলে করিমই রোপণ করে গিয়েছিলেন। কাজী বজলে করিম ছিলেন কাজী ফকির আহমেদের চাচাতুতো ভাই ।

তাঁর পিতা কাজী নাজিবুল্লাহ বিহারের চাইবাসায় ব্রিটিশ পুলিশে কর্মরত ছিলেন। পিতার মৃত্যুর পর সপরিবারে চুরুলিয়ায় চলে আসেন। ফকির আহমেদ আর বজলে করিমের বন্ধুত্ব ছিল বড়োই মধুর । বজলে করিম ছিলেন একজন প্রকৃত শিল্পী মনের মানুষ এবং বাংলার লোক সংস্কৃতির বাহক । ঐ অঞ্চলে লেটো গানের জনপ্রিয়তা যে উচ্চশিখরে পৌঁছেছিল তার পিছনে বজলে করিমের ভুমিকা অনস্বীকার্য।

জ্ঞানী, সজ্জন ,সাম্যবাদী এবং প্রকৃত পণ্ডিত মানুষ ছিলেন বজলে করিম। আরবি , পারসি আর বাংলা ভাষায় তাঁর দখল ছিল অসাধারণ। উদারচেতা বজলে করিম সর্বদাই সমাজের কল্যাণের কথা ভাবতেন। তিনি এবং তাঁর চাচাতুতো ভাই ফকির আহমেদ কাজী পাড়ার মসজিদে নামাজ পড়তে যেতেন। সেখানে তিনি ধর্ম সংক্রান্ত নানা আলোচনা শুনতেন ঠিকই কিন্তু তাঁর কাছে মানবধর্মই ছিল আসল ধর্ম। তিনি গভীর ভাবে উপলব্ধি করে ছিলেন অশিক্ষায় আর কুসংস্কারে ঘিরে থাকা সমাজে শিক্ষার আলো প্রবেশ না করলে সমাজের উন্নতি হবে না।

সেই সময় চুরুলিয়ায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বলতে বেনেপাড়ার একটা পাঠশালা আর একটা টোল । পাঠশালায় আরবি আর পারসি ভাষা পড়ানোর কোন ব্যবস্থা ছিলনা আর টোলে কেবল হিন্দু ধর্মশাস্ত্র পড়ান হতো। সেখানে বিধর্মীদের সেখানে ঢোকা নিষিদ্ধ ছিল। তিনি নিজে ছিলেন একজন পণ্ডিত মানুষ, পড়াশোনার ব্যাপারে গ্রামের এই বৈষম্যনীতি তাঁর মনকে গভীর ভাবে নাড়া দিয়েছিল। তাই নিজেই উদ্যোগ নিয়ে ফজলে আহমদ সিদ্দিকির সহায়তায় মসজিদ থেকে কিছুটা দূরে ‘চুরুলিয়া মুসলিম মক্তব’ নামে একটা প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপন করেন।

খড়ের চালের প্রায় অন্ধকার একটা মাটির বাড়িতে তিনি জ্বেলে ছিলেন শিক্ষার আলো। দিন দিন সেই মক্তবের ছাত্র সংখ্যা বাড়তে থাকে। এই মক্তবেরই এক কৃতি ছাত্র কাজী নজরুল ইসলাম এবং সেই কিশোর বয়সেই তিনি এখানে শিক্ষকতাও করে ছিলেন। গুণী মানুষ বজলে করিমকে ইতিহাস মনে রাখেনি। অথচ লোকসংস্কৃতিতে তাঁর দান অপরিসীম। পারসি ভাষার সাথে বাংলা মিশিয়ে তিনি অনেক সুন্দর সুন্দর কবিতা রচনা করেছিলেন।

আবার বাংলার সাথে উর্দু মিশিয়ে বহু গজলও তিনি লিখেছিলেন। শুধু লেখা নয় সেই গজলের সুরও তিনি নিজেই করে দিতেন। বহু লেটো গানের রচয়িতা তিনি। লেটো দলের অনেকেই তাঁকে ওস্তাদ বলে ডাকতেন। কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য তাঁর কোন লেখাই সংগ্রহে নেই, কোন লেখাই কখনও কোথাও ছাপা হয়নি। একজন গুণী মানুষের অনবদ্য সৃষ্টি অবহেলায় হারিয়ে গেছে, কোথাও কোনভাবেই সংরক্ষিত হয়নি। অথচ লোকসংস্কৃতির এক উজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক কালের করাল গ্রাসে আজ বিস্মৃত। বিবাহিত বজলে করিমের শশুরবাড়ি ছিল পাণ্ডবেশ্বরের নিমসা।

লেখিকা: বেবী কারফরমা কলকাতা, ভারত।

শেয়ার করুন আপনার পছন্দের সোশ্যাল মিডিয়ায়
error: Content is protected !!