
কে এম নাজির উদ্দিন জেহাদ যিনি শহীদ জেহাদ নামে সমধিক পরিচিত। তিনি ছিলেন নব্বইয়ের সামরিক শাসন বিরোধী আন্দোলনের একজন অকুতোভয় রাজনৈতিক কর্মী। রক্তঝরা ওই আন্দোলন ছিল স্বৈরাচার এরশাদ সরকারের পতনের মাধ্যমে বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনপ্রতিষ্ঠার আন্দোলন। শহীদ জেহাদ নব্বইয়ের স্বৈরাচার বিরোধী গণআন্দোলনে অগ্রনী ভূমিকা পালন করতে গিয়ে নিজের জীবন বিলিয়ে দেন। ১০ অক্টোবর ১৯৯০ সালে ঢাকার দৈনিক বাংলা মোড়ে মিছিলরত
অবস্থায় সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া সরকারী আকবর আলী কলেজের তৎকালীন ছাত্র নাজিরুদ্দিন জেহাদ পুলিশের গুলিতে শহীদ হয়ে ছিলেন। শহীদ জেহাদের রক্তস্রোতের সেই ধারা স্বৈরশাসক এরশাদের পতন ঘটিয়ে দিয়েছিল। শহীদ জেহাদের মৃত্যুর পর ২ মাসও টিকতে পারেনি স্বৈরাচারী এরশাদ সরকার। শহীদ নাজির উদ্দিন জেহাদ ১৯৬৯ সালের ৬ সেপ্টেম্বর সিরাজগঞ্জ জেলার উল্লাপাড়া উপজেলাধীন নবগ্রাম নামক গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। জেহাদের পিতার নাম কে এম মাহমুদ ও মায়ের নাম বসিরুন্নেসা। শহীদ নাজির উদ্দিন জেহাদরা ১০ ভাইবোন এবং ভাই-বোনের মধ্যে জেহাদ ছিলেন নবম। শহীদ জেহাদ ১৯৮৬ সালে সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া মার্চেন্টস পাইলট উচ্চবিদ্যালয় থেকে দ্বিতীয় বিভাগে এসএসসি পাশ করে উল্লাপাড়া সরকারি আকবর আলী কলেজে ভর্তি হন। এই কলেজ থেকে ১৯৮৮ সালে দ্বিতীয় বিভাগে এইচএসসি পাশ করে একই কলেজে বিএ ভর্তি হন। রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের একনিষ্ঠ ভক্ত নাজিরুদ্দিন জেহাদ ১৯৮৮ সালে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের সরকারি আকবর আলী কলেজ ইউনিটে যোগদানের মাধ্যমে রাজনীতি শুরু করেন। অবশ্য তার পরিবার আগে থেকেই বিএনপি রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিল। শহীদ জেহাদের আপন চাচাতো ভাই কে এম শরফুদ্দিন মঞ্জু সাবেক লেদার কলেজ(বর্তমান ঢা.বি অন্তর্ভূক্ত) ছাত্রদলের ভিপি ছিলেন, আপন বড়ভাই উল্লাপাড়া পৌর বিএনপির সভাপতি থাকা অবস্থায় প্রয়াত হয়েছেন।
ছাত্রদলে যোগদানের পর থেকে জেহাদ কলেজ শাখা ও উল্লাপাড়া উপজেলা উভয় শাখার সংগঠনকে শক্তিশালী করার দিকে মনোনিবেশ করেন। তার নিরলস প্রচেষ্ঠায় ছাত্রদল সরকারি আকবর আলী কলেজ ও উল্লাপাড়া উপজেলায় শক্ত অবস্থান তৈরি করে। ৯০ এর স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে জেহাদের সরকারী আকবর আলী কলেজের ভুমিকা দেশব্যাপী প্রশংসিত ও আলোচিত ছিল। দেশের বড় বড় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মতো এ কলেজের ছাত্ররাও স্বৈরাচার এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে যোগ দিয়ে অনেক বড় ভুমিকা পালন করেছেন, শহীদ নাজিরুদ্দিন জেহাদের আত্বত্যাগ তার বড় উদাহরন। ৯০ এর গনতন্ত্র পুনরুদ্ধার আন্দোলনের সেই উত্তাল সময়ে জেহাদ সরকারী আকবর আলী কলেজের বিএ শেষ বর্ষের ছাত্র এবং কলেজ শাখা জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের সভাপতি ও উপজেলা ছাত্রদলের সহসভাপতি ছিলেন।
১৯৯০ সালের ১০ অক্টোবর বিএনপির নেতৃত্বাধীন ৭ দলীয় জোট, আওয়ামীলীগের নেতৃত্বাধীন ৮ দলীয় জোট এবং বামপন্থী ৫ দলীয় জোট রাজধানীর পল্টনে মহাসমাবেশের ডাক দিলে অকুতভয় ছাত্রনেতা জেহাদ সরকারী আকবর আলী কলেজের ৬০ জন ছাত্রসহ শতাধিক কর্মী-সংগঠক নিয়ে উক্ত সমাবেশে যোগদান করেছিলেন। সেইদিনের উত্তাল ও ভয়াবহ সংগ্রামে জেহাদের সহযোদ্ধা হিসেবে তার সঙ্গে ছিলেন সরকারী আকবর আলী কলেজের সেই সময়কার ডাক সাইডের ছাত্রনেতা আব্দুর রাজ্জাক সন্টু, শফিউল মোমেন শফি, মাহবুব, আজাদ, হেলাল সরকার, মোহাব্বাত, মিঠু, আঃ রাজ্জাক, জিএস রফিক, খলিল, প্রয়াত মিন্নত, জেহাদের আপন ছোটভাই শহিদ প্রমূখ। সেদিন মিছিলরত অবস্থায় জেহাদ গুলিবিদ্ধ হলে তাকে তখনকার পিজি হাসপাতাল বর্তমানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়ে যাওয়া হয়।
পুলিশ হাসপাতাল থেকে জেহাদের মরদেহ ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করলে স্বৈরাচার এরশাদ বিরোধী আন্দোলনের আরেক মহানায়ক শহীদ শামসুল আলম খান
মিলনের নেতৃত্বে বিপুল সংখ্যক চিকিৎসক সেই প্রচেষ্ঠা প্রতিহত করেন তবে তারা জেহাদের জীবন বাঁচাতে ব্যর্থ হন। শামসুল আলম খান মিলন তার ডায়েরিতে ঘটনাটি লিখে রেখেছিলেন এবং মৃত্যুর আগে জেহাদের কথা স্মরণ করে গেছেন। ডাঃ মিলনের ডায়েরী থেকে জানা যায়, মৃত্যুর আগে জেহাদ বলেছিলেন: ‘‘স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে আন্দোলনে যোগ দিতে এসেছিলাম কিন্তু এখন পতন না দেখে মরছি। স্বৈরাচারী শাসন উৎখাত হলে আমার আত্মা শান্তিতে থাকবে।’’
১৯৮১ সালের ৩০ মে জিয়াউর রহমানকে হত্যা করা হলে বাংলাদেশের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হিসাবে ভাইস-প্রেসিডেন্ট বিচারপতি আবদুস সাত্তার ক্ষমতা গ্রহণ করেন। বাংলাদেশের তৎকালীন সেনাপ্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ রাষ্ট্রপতি সাত্তারকে অনৈতিকভাবে ক্ষমতাচ্যুত করে ২৪ মার্চ ১৯৮২ সালে একটি সামরিক আইন জারি করেন এবং নিজেকে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হিসাবে ঘোষণা করেন। তিনি বিচারপতি সাত্তারের পরিবর্তে বিচারপতি এএফএম আহসানউদ্দিন চৌধুরীকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে নিয়োগ দেন। ১১ এপ্রিল ১৯৮৩ সালে জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ সংবিধান স্থগিত করেন এবং নিজেকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হিসাবে ঘোষণা করেন। ১৯৮৬ সালের মার্চ মাসে এরশাদ ঘোষণা করেন যে, ৭ মে একটি সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। বিএনপি নেতৃত্বাধীন ৭ দলীয় জোট এই নির্বাচন বয়কট করে তা প্রতিহত করার লক্ষ্যে দেশব্যাপী হরতাল ঘোষণা করে। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ১৫ দলীয় জোট প্রাথমিকভাবে ১৭ মার্চ ১৯৮৬ সালের নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দেয়। ১৯ মার্চ চট্টগ্রামের লালদীঘি মাঠে শেখ হাসিনা এও ঘোষণা করেন : আসন্ন নির্বাচনে অংশগ্রহণের কোনো পরিকল্পনা আমাদের নেই, যারা এই ভোটে অংশ নেবেন তাদের ‘জাতীয় বিশ্বাসঘাতক’ ঘোষণা করা হবে।
কিন্তু সবাইকে অবাক করে ১৯৮৬ সালের ২১ মার্চ রাতে শেখ হাসিনা ঘোষণা দেন, আওয়ামী লীগ ও ১৫ দলীয় জোট নির্বাচনে অংশ নেবে। এই সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ হয়ে ১৫ দলীয় জোটের ওয়াকার্স পার্টি, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলসহ পাঁচটি বামপন্থী দল জোট থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করে নেয় এবং বিএনপির নেতৃত্বাধীন ৭ দলীয় জোটের সঙ্গে নির্বাচন বর্জনের সিদ্ধান্তে অটল থাকে। সেই নির্বাচনে আওয়ামীলীগের আকস্মিক অংশগ্রহণ এরশাদ শাসনের ভীতকে মজবুত করতে সাহায্য করে এবং পরবর্তি কয়েক বছরের জন্য জাতীয় পাটিকে রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকার একটি বৈধ সুযোগ সৃষ্টি করে দেয় যা কিনা এরশাদ বিরোধী আন্দোলনকে একটি দুর্বল কাঠামোর মধ্যে ঠেলে দিয়েছিল।
অবশ্য ১৯৮৬ সালের সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামীলীগের শোচনীয় পরাজয় হলে আবার তারা আন্দোলনে ফিরে আসে। ১৯৮৭ সালের ২৮ অক্টোবর রাজধানীর মহাখালীতে এক বৈঠকের পর তৎকালীন দুই প্রধান জোটের নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনা এরশাদ সরকারের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। ১৯৮৭ সালে যুবলীগের সমাবেশে পুলিশের গুলিতে নিহত নূর হোসেনের মৃত্যুর পর আন্দোলন নতুন শিখরে পৌঁছে। কিন্তু পুলিশি দমন নিপিড়ন, বেগম খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনাকে ঘন ঘন গৃহবন্দি করা এবং আওয়ামীলীগের দুর্বল ও অপর্যাপ্ত সাংগঠনিক পদক্ষেপের কারনে আন্দোলনটি খুব বেশি সফলতা পায়নি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) বাংলাদেশের ইতিহাসে সকল আন্দোলন -সংগ্রামে সবচেয়ে বেশি অবদান রেখেছে। কিন্তু ১৯৮০-এর দশকে ডাকসুর কিছু নেতার দূরদর্শিতার অভাব ও বিশ্বাসঘাতকতার কারনে এই সময় এরশাদ বিরোধী আন্দোলন ছাত্রদের মধ্যে তার আবেদন হারিয়ে ফেলে।
১৯৮৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ, বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন এবং বামপন্থী ছাত্র সংগঠনগুলি ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের (ছাত্র অ্যাকশন কাউন্সিল) অধীনে একটি যৌথ প্যানেল দিয়ে ডাকসু নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠ পদে জয়লাভ করে এবং সুলতান মনসুর আহমেদ ডাকসুর ভিপি নির্বাচিত হন। কিন্তু ডাকসুর এই কমিটিও স্বৈরাচারী এরশাদ শাসনকে চ্যালেঞ্জ জানাতে ব্যর্থ প্রমানিত হয় এবং এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে কোন ভূমিকা রাখতে পারেনি। অবশেষে ১৯৯০ সালের জুনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল সমর্থিত আমানুল্লাহ আমান- খায়রুল কবির খোকন প্যানেল ডাকসু নির্বাচনে পূর্ণ প্যানেলের পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় সব হলগুলোর ইউনিয়নে জয়লাভ করে। আমানউল্লাহ আমান ডাকসুর ভিপি এবং খায়রুল কবির খোকন জিএস নির্বাচিত হন। ডাকসু নির্বাচনে জয় লাভের পর আমান-খোকনের নেতৃত্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে স্বৈরাচার বিরোধী দুর্বার আন্দোলন গড়ে উঠে। ১৯৯০ সালের ১০ অক্টোবর এমন পরিস্থিতিতে এরশাদের বিরুদ্ধে তিন জোটের ডাকা দেশব্যাপী হরতালে অংশ নিতে ঢাকায় আসা সিরাজগঞ্জের সেই ছাত্রদল নেতা নাজিরুদ্দিন জেহাদ ছাত্রদলের একটি মিছিল চলাকালীন সময়ে দৈনিক বাংলা মোড়ে পুলিশের গুলিতে শহীদ হন।
বিক্ষোভ সহিংস থেকে আরও সহিংস হয়ে ওঠে। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের শত শত শিক্ষার্থী পুলিশের সাথে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়লে কর্মসূচিটি হিংসাত্মক রূপ নেয়, এতে বহূ ছাত্র হতাহত হয়। জানা যায়, সেদিন মোট ৫ জন মারা গেলেও একমাত্র জেহাদের লাশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাজেয় বাংলার সামনে আনা সম্ভব হয়েছিল। মৃত জেহাদের লাশকে কেন্দ্র করে অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে তৎকালীন ক্রিয়াশীল সকল ছাত্র সংগঠনের নেতৃবৃন্দ সেখানে উপস্থিত হয়েছিলেন এবং ২৪টি ছাত্র সংগঠনের নেতৃবৃন্দের উপস্থিতিতে সেদিন গড়ে উঠে ‘‘সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্য’’। সেইদিন জেহাদের লাশ ছুয়ে তৎকালীন ছাত্রনেতারা শপথ নিয়েছিলেন, স্বৈরাচার এরশাদের পতন না ঘটিয়ে কেউ ঘরে ফিরবে না। উল্লেখ্য এই ‘‘সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্য’’ গড়ে উঠার আগে বৃহৎ দুই ছাত্র সংগঠন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল ও বাংলাদেশ ছাত্রলীগ আলাদাভাবে এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় ছিল। সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্যের মাধ্যমে ডাকসুর ভিপি আমানের নেতৃতে সকল ছাত্র সংগঠনের সকল শক্তি একই জায়গায় মিলিত হয়ে স্বৈরাচার এরশাদের বিরুদ্ধে গণআন্দোলনকে গণঅভ্যূত্থানে পরিনত করে। ১৯৯০ সালের ‘‘সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্যে’’র সেই সময়ের অন্যতম নেতা ছিলেন আমানুল্লাহ আমান, খাইরুল কবির খোকন, হাবিবুর রহমান হাবিব, জহির উদ্দীন স্বপন, মোস্তাফিজুর রহমান বাবুল, নাজিমুদ্দিন আলম, এম ইলিয়াস আলী, ফজলুল হক মিলন, সাইফুদ্দিন আহমেদ মনি, খন্দকার লুৎফর রহমান, আসাদুজ্জামান খান আসাদ প্রমূখ। বিএনপির নেতৃত্বাধীন ৭ দলীয় জোট, আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ৮ দলীয় জোট এবং বামপন্থী ৫ দলীয় জোটের পাশাপাশি ছাত্রদের ‘‘সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্য’’ লড়াইরত রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সকল দ্ব›দ্ব ও অবিশ্বাস উপেক্ষা করে গণঅভ্যুত্থানের চালিকাশক্তিতে পরিণত হয়। ছাত্রদের দুর্বার ও অব্যাহত আন্দোলনের মধ্যেই ২৭ নভেম্বর ছাত্র পরিষদের একটি কর্মসূচী চলাকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি মোড় দিয়ে যাওয়ার সময় এরশাদ বিরোধী আন্দোলনের চিকিৎসক পেশাজীবিদের নেতা শামসুল আলম খান মিলনকে জাতীয় পার্টির ক্যাডারা গুলিকরে হত্যা করে।
উল্লেখ্য যে, শহীদ ডাঃ মিলনের হত্যাকান্ড ছিল স্বৈরাচার এরশাদ শাসনের কফিনের শেষ পেরেক। এই ঘটনা ক্ষুব্ধ ছাত্রদেরকে আরও বিক্ষুব্ধ করে তোলে এবং কাউন্সিল ৩০ নভেম্বরের মধ্যে মন্ত্রিসভার সকল মন্ত্রীদের পদত্যাগ দাবি করে এবং ঘোষণা করে যে তাদের দাবি পূরণ না হলে, মন্ত্রিপরিষদের সদস্যদের মারাত্মক পরিণতি ভোগ করতে হবে। পরদিন ২৮ নভেম্বর ছাত্ররা ক্যাম্পাস থেকে র্যালি নিয়ে বের হয় এবং পুলিশ ও বিডিআর সদস্যরা হামলা চালায়। এতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা রণক্ষেত্রে পরিনত হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা লাঠি সোঠা নিয়ে ক্যাম্পাসের আশেপাশের এলাকায় ব্যাপক গণবিক্ষোভ শুরু করে। ছাত্ররা রাজধানীর মালিবাগে রেল অবরোধ করলে চালক ট্রেন থামিয়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়। এর আগে বিএনপির নেতৃত্বে ৭ দলীয় জোট, আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ৮ দলীয় জোট এবং বামপন্থী ৫ দলীয় জোট ১৯৯০ সালের ১৯ নভেম্বর ‘তিন জোটের যৌথ ঘোষণা’ প্রণয়ন করে। এই ঘোষণায় একটি তত্তাবধায়ক সরকারের ধারণা অন্তর্ভুক্ত ছিল যা এরশাদের পতনের পর ক্ষমতা গ্রহণ করবে এবং ক্ষমতায় আসার ৯০ দিনের মধ্যে একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন করবে।
ছাত্রদের এই ধারাবাহিক গণবিক্ষোভ ও গণঅভ্যুত্থান এরশাদ সরকারকে নিরাপদ প্রস্থানের কথা ভাবতে বাধ্য করে। দেশের রাজনীতি, প্রশাসন, সেনাবাহিনী সবকিছু একে একে এরশাদের বিরুদ্ধে চলে যায়। ১ ডিসেম্বর ১৯৯০ ঢাকা সেনানীবাসে এক জরুরী বৈঠকে বসেন উর্ধতন সেনা কর্মকর্তারা। সে মিটিং এর আলোকে তৎকালীন সেনাপ্রধান নূর উদ্দিন ৩ ডিসেম্বর রাষ্ট্রপতি এরশাদের সাথে দেখা করেন এবং এরশাদ সেনাবাহিনীর সাহায্য চাইলে, দেশের চলমান
রাজনৈতিক সংকটে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর করনীয় কিছু নেই বলে সেনাপ্রধান তাকে জানিয়ে দেন। জেনারেল এরশাদ সেনাবাহিনীর মনোভাব বুঝতে পেরে ৪ ডিসেম্বর ক্ষমতা হস্তান্তরের উদ্যোগ গ্রহন করেন এবং ৬ ডিসেম্বর চুড়ান্তভাবে ক্ষমতা ছেড়ে দেন। দীর্ঘ ৯ বছরের এক স্বৈরশাসকের পতন হয়, তাকে গ্রেফতার করা হয় এবং বিচারপতি শাহাবুদ্দিন আহমেদ অস্থায়ী সরকারের দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
১০ অক্টোবর ১৯৯০ জেহাদের সেই শাহাদত বরণ ছাত্রদের স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে ভিন্ন মাত্রা এনে দিয়েছিল একথা বলার অপেক্ষা রাখেনা। অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে ছাত্ররা ‘‘সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্য’’ গঠনসহ জেহাদের লাশ ছুয়ে যে শপথ গ্রহন করেছিলেন তার ফলশ্রুতিতে শ্বৈরাচার বিরোধী গণআন্দোলন গণঅভ্যূত্থানে পরিনত হয় এবং জেহাদের মৃত্যুর ৫৬ দিনের মাথায় স্বৈরাচার এরশাদের চুড়ান্ত পতন ঘটে। শহীদ জেহাদকে পাবনা-রংপুর মহাসড়কের পাশে অবস্থিত নিজ গ্রামের কবরস্থানে দাফন করা হয়। বিএনপির চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া যতবারই উত্তর বঙ্গে আসা যাওয়া করেছেন ততবারই শহীদ জেহাদের কবর জিয়ারত করেছেন, হোক সেটা দিনে কিংবা রাতে। বিএনপির চেয়ারপার্সনের পাশাপাশি মহাসচীবগণ ও কেন্দ্রীয় নেতারা জেহাদের কবর জিয়ারত করেছেন বহূবার। এছাড়া প্রতিবছর শহীদ জেহাদ দিবসে বানী প্রদানসহ জেহাদকে শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করেন বিএনপির শীর্ষ নেতৃবৃন্দসহ শহীদ জেহাদ স্মৃতি পরিষদ, ৯০ এর ‘‘সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্যে’’র নেতৃবৃন্দ, স্থানীয় উপজেলা বিএনপি প্রভৃতি। একজন অপরাজেয় রাজনীতির বরপুত্র শহীদ জেহাদের জনম যে সার্থক এটা বলা যেতেই পারে। এমন মৃত্যুই বা কয়জনের ভাগ্যে জোটে, মৃত্যুর পরও মানুষ যাকে মনে রাখে।
মোঃ মনিরুল ইসলাম
সিনিয়র ব্যাংকার, জনতা
ব্যাংক পিএলসি.
রাজশাহী।

আরও পড়ুন
মোরেলগঞ্জে হাজারো মানুষের ভালোবাসায় সিক্ত হলেন অধ্যাপক ড.এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম।
দাগনভূঞায় ইসকন নিষিদ্ধের দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল।
বাংলার সারদীয় দুর্গাপূজা ও সর্বজনীনতা নিয়ে কিছু কথা