
মামনুর রশিদঃ আজ মহান মে দিবস। বিশ্ব্যাবপি দিবসটি মহা সমারহে পালিত হচ্ছে। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে তৈরি পোশাক ও চামড়া শিল্পসহ অন্যান্য রপ্তানিকারক শিল্প প্রতিষ্ঠানের অবদান অনস্বীকার্য। আওয়াজ ফাউন্ডেশন ২০০৩ সাল থেকে পোশাক শিল্পের শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নে কাজ করে আসছে। আজও এরই ধারাবাহিকতায় কর্মস্থলে ন্যায়সঙ্গত পরিবর্তন, শ্রম আইন বাস্তবায়ন ও সমঅধিকার, বাচাঁর মত যুগোপযোগি মজুরী, নারীর অর্থনৈতিক মুক্তি, অবাধ ট্রেডইউনিয়নের স্বাধীনতা, জলবায়ু পরিবর্তন জনিত সংকট, জেন্ডার ভিত্তিক সহিংসতা প্রতিরোধ এর দাবীতে এই মহান মে দিবস উপলক্ষ্যে আওয়াজ ফাউন্ডেশনের আয়োজনে বিভিন্ন স্থানে বর্নাঢ্য র্যালি ও সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।
স্থানগুলো হলো যথাক্রমে, জাতীয় প্রেস ক্লাব- ঢাকা, বায়েজিদ বোস্তামী- চট্টগ্রাম, কালুরঘাট- চট্টগ্রাম। সমাবেশে ১৪ দফা দাবী আদায়ের লক্ষ্যে শ্রমিকরা একত্রিত হন। তারা তাদের দাবীগুলো বলিষ্ঠ কন্ঠে উত্থাপন করেন।
দাবীগুলো হলো:
* বাঁচার মত মজুরী নিশ্চিত করতে হবে।
* প্রাতিষ্ঠানিক-অপ্রাতিষ্ঠানিক সেক্টরে মাতৃত্বকালীন ছুটি ৬ মাস
করতে হবে।
* অবাধ ট্রেড ইউনিয়ন অধিকার নিশ্চিত কর।
* আই এল ও সনদ ১৮৯ অনুস্বাক্ষর কর।
* কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানি ও সহিংসতা রোধ করতে আই এল ও
সনদ ১৯০ অনুস্বাক্ষর কর।
* সকল কারখানায় লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা ও হয়রানি বন্ধে এন্টি
হ্যারেজম্যান্ট কমিটি গঠন কর।
* শ্রমিকদের সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত কর।
* ব্যান্ড এ্যাকর্ড চুক্তি স্বাক্ষর কর ও প্রাইজরেট বৃদ্ধি কর।
* চতুর্থ শিল্প বিরোধের এই সময় ন্যায় সঙ্গত রুপান্তর নিশ্চিত
করতে হবে।
* সকল শ্রমিকদের জন্য মৃত্যুভয়হীন নিরাপদ কর্মক্ষেত্র
নিশ্চিত কর।
* শ্রমজীবি মানুষের জন্য ভর্তুকি মূল্যে রেশন ব্যবস্থা নিশ্চিত
কর।
* ২০২৪-২০২৫ অর্থ বছরের জাতীয় বাজেটে শ্রমিকদের জন্য
সুনির্দিষ্ট বরাদ্দ রাখতে হবে।
* জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলা সংক্রান্ত পরিকল্পনা,
শ্রমিক বান্ধব করতে হবে।
* বাংলাদেশ শ্রম আইনে ও বিধিমালায় সন্নিবেশিত শ্রমিক স্বার্থ-
বিরোধী বিধিসমূহ বাতিল পূর্বক নতুন বিধিমালা প্রনয়ন কর।
সমাবেশে আওয়াজ ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক জনাব নাজমা আক্তার তার বক্তব্যে বলেন, দেশের অর্থনীতি, রাজনৈতিক এবং সাংস্কৃতিকভাবে রয়েছে শ্রমিকদের সক্রিয় ভুমিকা যা জাতির অগ্রগতির অন্যতম শক্তি। কিন্তু আমার দেশের শ্রমিকরা সবচেয়ে সস্তায় কাজ করে যাচ্ছে, নিত্যপ্রয়োজনীয় পন্যের মূল্যবৃদ্ধির কারনে তাদের জীবন যাত্রার মান একেবারেই নিম্নমুখী, এছাড়া দুর্বল শ্রম আইনের কারনে শ্রমিকদের অধিকার অনেকক্ষেত্রেই লঙ্ঘিত হচ্ছে। বিশেষ করে নারীরা একদিকে কর্মস্থলে নিরাপত্তাহীনতা, মজুরি বৈষম্য, মাতৃত্বকালীন ছুটি না পাওয়া, যথার্থ স্বাস্থ্যসম্মত কর্মপরিবেশ ও নির্দিষ্ট কর্মঘন্টা না পাওয়াসহ নানাবিধ শোষণ-বঞ্চনার শিকার। দেশের পোশাক শিল্পসহ অর্থনীতির মূলধারার কর্মক্ষেত্র গুলোতে ও উৎপাদন ব্যবস্থায় শ্রমিকদের অংশগ্রহন ক্রমান্বয় বাড়ছে।
বিশ্বব্যাপী নানা ভাবে মে দিবস মর্যাদার সহিত পালিত হচ্ছে ঠিকই কিন্তু আজও সেভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি শ্রমিকদের অধিকার। তাই শ্রমিকদের প্রতিটি ক্ষেত্রে অংশগ্রহন ও ক্ষমতায়নের জন্য সরকারী ও বেসরকারী উদ্যোগ অবশ্যই প্রয়োজন। এই ব্যাপারে মালিক শ্রেনী ও সরকারকে বিশেষভাবে হস্তক্ষেপ করার জন্য আহবান জানাচ্ছি। তিনি আরো বলেন, জেন্ডার ভিত্তিক সহিংসতা বিষয়টি শ্রম আইনে অর্ন্তভুক্ত করতে হবে।
তিনি আরো বলেন,বন ভূমির গাছপালা কেটে ফেলা, শিল্প কলকারখানার ধোঁয়া ও দূষিত বর্জ্য পদার্ধ প্রকৃতির সাথে মিশে পরিবেশকে মারাত্বক বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। অন্যান্য সকল ক্ষেত্রের মতো পোশাক শিল্পেও পরিবেশ দূষনের প্রভাব বহুদিন ধরে পরিলক্ষিত হচ্ছে। এ ধরনের পরিবেশ দূষনের ফলে কারখানার আশেপাশে যে সব শ্রমিকেরা থাকে তাদের পারিপার্শিক পরিবেশ খুবই নোংরা এবং নোংরা পরিবেশের কারনে শ্রমিকেরা প্রায়শই বিভিন্ন রোগের শিকার হয়। কারখানায় ব্যবহৃত রাসায়নিক বর্জ্য ও অপরিচ্ছন্ন কর্ম পরিবেশের দরুন তাদের বিভিন্ন পেশাগত ব্যাধি হয়। এসব মোকাবেলায় সরকারী ও বেসরকারী উদ্যোগ অবশ্যই প্রয়োজন। শ্রমিকদের জন্য বাসযোগ্য আবাস স্থল নিশ্চিত করতে হবে। যথাস্থানে কারখানা নির্মান করতে হবে। প্রকৃতি বিনাশ করে এভাবে শিল্পকারখানা ও স্থাপত্য নির্মান চলতে থাকলে বাংলাদেশ ভবিষ্যতে ভয়াবহ ক্ষতির মুখে পড়বে।
আওয়াজ ফাউন্ডেশনের সভাপতি জনাব মমতাজ বেগম তার বক্তব্যে বলেন, শ্রমিকদের অধিকার রক্ষায় পোশাকশিল্পের সকল কারখানায় ট্রেড ইউনিয়ন গঠন ও যৌথ দর কষাকষির পূর্ণ স্বাধীনতা দিতে হবে। আমাদের অভিবাসী শ্রমিকেরা বিদেশে যেমন নির্যাতনের শিকার হচ্ছে আবার দেশে এসেও সামাজিক বৈষম্যের শিকার হচ্ছে। এতে করে তাদের অধিকার ব্যাপকহারে লঙ্ঘন হচ্ছে। সে কারনে আমাদেরকে আরো সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে।
তিনি আরো বলেন শ্রমিকদেরকে শ্রমিক হিসাবে নয় মানুষ হিসাবে দেখতে হবে। দেশের বৃহত্তর স্বার্থে শ্রমিকদের উপর নানারকম নির্যাতন রোধে সকলকে এগিয়ে আসতে হবে। অন্যথায় পোশাক শিল্পের উৎপাদন ব্যাহত হবে এবং জাতি অনেক ক্ষতির সম্মুক্ষীন হবে। দেশের টেকসই উন্নয়নের জন্য পোশাক শিল্পে কর্মরত শ্রমিকদের অবদান অনস্বীকার্য।
সমাবেশে আরো বক্তব্য রাখেন, সম্মিলিত গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশনের সহ-সাধারন সম্পাদক জনাব মোহাম্মদ সৈকত চৌধুরী, আরএমজি ওয়ার্কার্স ফোরামের সভাপতি বিলকিস বেগম ও সাধারন সম্পাদক উর্মি আক্তার সহ বিভিন্ন কারখানার ইউনিয়নের শ্রমিক নেতৃবৃন্দ। সমাবেশে আরো উপস্থিত ছিলেন, উক্ত আলোচনা সভায় আরো উপস্থিত ছিলেন, ইসমত জেরিন, ইমরান রহমান, আলি সম্প্রীতি, আফরোজা,মামনুর রশিদ, তোফায়েল আহম্মেদ, হাবিবুর রহমান,মোহাম্মাদ আরমান, কাজী তানজির, সাব্বির আহম্মেদ, মিরাজ,সালমান, লালচান, ফরিদ,আশিক, ঊর্মি, হালিমা, সহ বিভিন্ন শ্রমিক ফেডারেশনের নেতৃবিন্দু ও আওয়াজ ফাউন্ডেশনের অন্যান্য কর্মীবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।

আরও পড়ুন
“অসংক্রামক রোগের ঝুঁকি কমাতে তামাকপণ্যের উপর কর বৃদ্ধির প্রস্তাব চিকিৎসকদের”
কোটি টাকার যুগে এক হাজার টাকার নোট এখন অনেকটাই অপ্রতুল মনে হচ্ছে
গতি পাচ্ছে না দেশের প্রধান শেয়ারবাজার