
হুমায়ুন কবির সুমন, সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি : আজ ১৪ ডিসেম্বর হানাদার মুক্ত সিরাজগঞ্জ দিবস। ১৯৭১ সালের এদিনে হানাদার মুক্ত হয় সিরাজগঞ্জ। দীর্ঘ নয় মাসের সশস্ত্র লড়ায়ের শেষে মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মিলিত বাহিনীর কাছে পরাজিত হয় পাক হানাদার বাহিনী। মিত্র বাহিনীর সহায়তা ছাড়াই এদিন লড়াকু মুক্তিযোদ্ধারা অবরুদ্ধ সিরাজগঞ্জকে শক্রমুক্ত করে। মুক্তিযুদ্ধের চুড়ান্ত বিজয়ের মাত্র দুদিন আগে ১৪ ডিসেম্বর মুক্ত হয় সেদিনের মহুকুমা আজকের জেলা শহর সিরাজগঞ্জ। হানাদার মুক্ত এদিনে সকাল ১০টার দিকে মুক্তিযোদ্ধারা ফাঁকা গুলি ছুড়ে বিজয় উল্লাসে সিরাজগঞ্জ শহরে প্রবেশ করে।
মুক্তিযোদ্ধাদের সিরাজগঞ্জে প্রবেশের সাথে সাথে বিজয় উল্লাসে আপামর জনতা উৎসাবে মেতে উঠে। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ গভীর রাতে পাক বাহিনী অপারেশন সার্চ লাইটের নাম নিয়ে ঢাকায় ঝাপিয়ে পড়ে নিরস্ত্র বাঙালীদের ওপর। তারপরও, ২৬ মার্চ থেকে এপ্রিলের ১৬ তারিখ পর্যন্ত সিরাজগঞ্জ ছিলো হানাদার মুক্ত। ঐ বছরের এপ্রিলের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত মুক্তিযোদ্ধারা পাকিস্তানী বাহিনীর বিরুদ্ধে বিভিন্ন স্থানে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। অবশেষে ১৭ এপ্রিল পাক বাহিনী সিরাজগঞ্জ প্রবেশ করে।
সিরাজগঞ্জ প্রবেশের পথে জ্বালা-পোড়াও, গুলি, হত্যা এবং শেষে গোটা সিরাজগঞ্জ শহরকে আগুনে পুড়িয়ে দিয়ে পাকিস্তনী বাহিনী জনমানবহীন শহরের দখল নেয়। সাময়িক পরাস্থ হয়ে মুক্তিযোদ্ধারা প্রশিক্ষণ ও অস্ত্রে বলীয়ান হয়ে পাকিস্তানীর বর্বর বাহিনীর বিরুদ্ধে পুন শুরু করে সশস্ত্র লড়াইয়ের সূচনা করে। মুক্তিযোদ্ধারা ৭১ এর কয়েক মাসে বড়ইতলী, বাগবাটী, ব্রন্মগাছা, কৈগাড়ি, ভদ্রঘাট, নওগা, বারুহাস ছোনগাছা, ভাটপিয়ারী, রহমতগঞ্জ গোরস্থান এলাকার সন্নিকটেসহ বিভিন্ন স্থানে পাকিস্তান বাহিনী এবং রাজাকারদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়।
এ সময়ই মুক্তিযোদ্ধারা ৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে একদিনের যুদ্ধে অবিস্মরণীয় এবং একমাত্র বিজয় অর্জন করে নওঁগা হন্ডিয়ালে। ১৯৭১ সালের ১২ নভেম্বরে সংঘটিত এই যুদ্ধে পলাশডাঙা যুব শিবিরের কাছে নিশ্চিহ্ন হয় পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ৩২ বেলুচ রেজিমেন্ট। মুক্তিযুদ্ধের শেষের দিকে ডিসেম্বর মাসে মুক্তিযোদ্ধার সিরাজগঞ্জ শহরকে মুক্ত করার জন্য পাকিস্তান বাহিনীর সাথে শহরের সন্নিকটে যুদ্ধে অবতীর্ন হয়। ৭১ সালের ৯ ডিসেম্বর থেকে-১৩ তারিখ পর্যন্ত টানা কয়েকদিন যুদ্ধের পর ১৪ ডিসেম্বর মুক্তিযোদ্ধারা যৌথবাহিনীর ছাড়াই সিরাজগঞ্জ শহরকে পাক হানাদার মুক্ত করে।
শহর মুক্ত করার লক্ষ্যে পরিচালিত এই যুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধারা পরিকল্পিতভাবে তিনদিক থেকে আক্রমন করে। মোজাম্মেল হক ও ইসহাক আলী নেতৃত্বে পূর্ব দিক থেকে, সোহরাব আলী ও লুংফর রহমান দুদুর নেতৃত্বে পশ্চিম দিক থেকে এবং আমির হোসেন ভুলু ও জহুরুল ইসলামের নেতৃত্বে উত্তর দিক থেকে এবং দক্ষিন দিক থেকে ইসমাইল হোসেন ও আব্দুল আজিজের নেতৃত্বে শানিত আক্রমনে পাকিস্থানীরারা দিশেহারা হয়ে পড়ে। ১৩ তারিখ পেরিয়ে রাত শেষ প্রহরের দিকে হানাদার বাহিনী যুদ্ধে পরাস্থ হয়ে ট্রেন যোগে উল্লা পাড়া হয়ে নগরবাড়ী হয়ে ঢাকা অভিমুখে পালিয়ে যায়।
১৪ তারিখ ভোরে মুক্তিযোদ্ধারা ওয়াপদা অফিস হানাদার মুক্ত করে তাদের ঘাটি স্থাপন করে। একইদিন কওমী জুটমিল, মহুকুমা প্রশাসকের অফিসসহ শহরের বিভিন্ন স্থানে উড়িয়ে দেয় লাল সবুজ এবং হলুদ মানচিত্র শোভিত স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা। হানাদার মুক্ত মহুকুমা প্রশাসকের দায়িত্ব দেয়া হয় সাবেক ছাত্রনেতা মুক্তিযোদ্ধা ইসমাইল হোসেনকে (আমেরিকা প্রবাসি)। এবং সর্বাধিনায়কের দায়িত্ব দেয়া হয় সকলের প্রিয় আমির হোসেন ভুলকে। সিরাজগঞ্জ শহর মুক্ত করার এ যুদ্ধে অসীম সাহসিকতার সাথে লড়াই করে শহীদ হন সুলতান, সামাদ ও সোহরাব। ১৩ ডিসেম্বর পাকিস্থানী বাহিনীর সাথে যুদ্ধে শহীদ হন প্রকৌশলী আহসান হাবিব, সুলতান মাহমুদ সহ কয়েকজন। সিরাজগঞ্জবাসী উংসব উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে প্রতিবছর এদিনটি উদযাপন করে। এদিনকে স্মারণ করে গৌরববোধ করে। শ্রদ্ধায় মাথানত করে সালাম জানায় শহীদ এবং জীবিত মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি।

আরও পড়ুন
দশ মাসের আত্মগোপনের অবসান: র্যাবের অভিযানে ধরা মমিনুল হত্যা মামলার আসামি
চিলাহাটি রেলস্টেশনে দুই শিশু সন্তানসহ মায়ের আত্মহত্যার চেষ্টা
সরকারি সহায়তার নামে কোটি টাকার প্রতারণা: চাঁপাইনবাবগঞ্জে ‘মাসকুরা ট্রেডার্স’ এর বিরুদ্ধে ভুক্তভোগীদের মানববন্ধ