
রায়হান শেখ, মোল্লাহাট (বাগেরহাট) প্রতিনিধি:
বর্ষার আগমনের সঙ্গে সঙ্গে বাগেরহাটের মোল্লাহাট উপজেলার গাড়ফা বাজারে চারা গাছের জমজমাট বিক্রি শুরু হয়েছে। উপজেলা মুক্তিযুদ্ধ কমপ্লেক্সের সামনে অস্থায়ীভাবে বসা চারার দোকানগুলোতে ফলজ, বনজ, ঔষধি ও বিভিন্ন প্রজাতির ফুলের চারার সমাহার দেখা গেছে। বৃহস্পতিবার (২৫ জুন ২০২৬) সকালে বাজার ঘুরে দেখা যায়, স্থানীয় বাসিন্দারা বাড়ির আঙিনা, বাগান ও বিভিন্ন খালি স্থানে রোপণের জন্য চারা কিনতে ভিড় করছেন।
চারা ব্যবসায়ী নাছির উদ্দীন জানান, বর্ষা মৌসুম তাঁর ব্যবসার সবচেয়ে ব্যস্ত সময়। তিনি বলেন, “প্রতিবছর বর্ষা এলেই মানুষ গাছ লাগাতে আগ্রহী হয়ে ওঠেন। গত বছরের তুলনায় এ বছর চারার দাম কিছুটা বেড়েছে, তবুও ক্রেতাদের আগ্রহ কমেনি। আমি বিভিন্ন নার্সারি থেকে উন্নতমানের ফলজ, বনজ, ঔষধি ও ফুলের চারা সংগ্রহ করে মোল্লাহাটের বিভিন্ন বাজারে বিক্রি করি। ভালো মানের চারা সরবরাহ করাই আমার লক্ষ্য। স্থানীয় মানুষজন আস্থা রেখেই নিয়মিত আমার কাছ থেকে চারা কিনে থাকেন। যখন দেখি আমার বিক্রি করা একটি ছোট্ট চারা কয়েক বছর পর বড় গাছে পরিণত হয়েছে, তখন সত্যিই ভালো লাগে। গাছ লাগানোর এই প্রবণতা বাড়লে পরিবেশ যেমন রক্ষা পাবে, তেমনি ভবিষ্যৎ প্রজন্মও উপকৃত হবে।”
মোল্লাহাট অঞ্চলটি দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জলবায়ু ও ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যের কারণে সবুজে সমৃদ্ধ একটি জনপদ হিসেবে পরিচিত। এখানকার প্রাকৃতিক ও সামাজিক বনায়নে নানা প্রজাতির গাছপালা দেখা যায়। ফলজ গাছের মধ্যে আম, জাম, কাঁঠাল, লিচু, পেয়ারা, নারিকেল, সুপারি, তাল, কলা ও কুল উল্লেখযোগ্য। এছাড়া মেহগনি, রেইনট্রি (কড়ই), শিশু, বাবলা, কদম ও আকাশমনি কাঠ ও জ্বালানি গাছ হিসেবে ব্যাপকভাবে রোপণ করা হয়।
এ অঞ্চলে নিম, অর্জুন, হিজলসহ বিভিন্ন ঔষধি ও পরিবেশবান্ধব গাছের উপস্থিতিও লক্ষণীয়। পাশাপাশি বাঁশঝাড়, গুল্ম ও ঘাসজাতীয় উদ্ভিদ স্থানীয় জীববৈচিত্র্যকে সমৃদ্ধ করেছে। ঢাকা-খুলনা মহাসড়কসহ বিভিন্ন আঞ্চলিক ও গ্রামীণ সড়কের পাশে সামাজিক বনায়নের অংশ হিসেবে রেইনট্রি ও মেহগনি গাছের সারি মোল্লাহাটের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করেছে। কৃষিপ্রধান এ উপজেলার অধিকাংশ বাড়ির আঙিনা ও পারিবারিক বাগানেও প্রচুর ফলজ ও ঔষধি গাছের সমাহার রয়েছে।
পরিবেশবিদ ও বিজ্ঞানীদের মতে, পৃথিবীতে ব্যাপক হারে বৃক্ষরোপণ করা গেলে বায়ুমণ্ডলে জমে থাকা বিপুল পরিমাণ কার্বন ডাইঅক্সাইড শোষণ করা সম্ভব। গবেষণায় দেখা গেছে, বৃহৎ পরিসরে বৃক্ষরোপণের মাধ্যমে বিশ্ব উষ্ণায়ন ও জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি অনেকাংশে কমিয়ে আনা যেতে পারে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ব্যাপক বৃক্ষরোপণই বর্তমান যুগের পরিবেশগত সংকট মোকাবিলার সবচেয়ে সস্তা, সহজ এবং কার্যকর সমাধান।
তবে দুঃখজনক হলেও সত্য, বৃক্ষরোপণের চেয়ে বৃক্ষনিধনের ঘটনাই বেশি চোখে পড়ে। বাড়িঘর নির্মাণ, রাস্তা সম্প্রসারণ, শিল্পপ্রতিষ্ঠান স্থাপন কিংবা বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের নামে প্রতিনিয়ত অসংখ্য গাছ কেটে ফেলা হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে ক্ষতিপূরণ হিসেবে নতুন গাছ লাগানোর বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে না। ফলে পরিবেশের ভারসাম্য ক্রমেই হুমকির মুখে পড়ছে।
স্থানীয় পরিবেশ সচেতন ব্যক্তিরা বলেন, শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বৃক্ষরোপণের আহ্বান জানালেই হবে না, বাস্তবেও গাছ লাগানো ও পরিচর্যার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। পরিবেশ রক্ষা, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি বাসযোগ্য পৃথিবী গড়ে তুলতে প্রত্যেক নাগরিককে বৃক্ষরোপণে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
বর্তমানে পৃথিবীর জনসংখ্যা প্রায় ৮০০ কোটি। বিজ্ঞানীদের হিসাব অনুযায়ী, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় বিশ্বের মানুষ সম্মিলিতভাবে ব্যাপক বৃক্ষরোপণের উদ্যোগ নিলে জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়াবহ প্রভাব অনেকটাই মোকাবিলা করা সম্ভব হবে। তাই সময়ের দাবি—প্রতিটি মানুষ অন্তত একটি হলেও গাছ লাগান এবং তার পরিচর্যার দায়িত্ব নিন।

আরও পড়ুন
পীরগঞ্জে দেশের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের অংশগ্রহনে মেডিকেল ক্যাম্প-২০২৬ অনুষ্ঠিত
বাঘার নারায়নপুরে ইয়াবা-হিরোইনসহ যুবক গ্রেপ্তার, জামিনে বের হয়েই ফের মাদক ব্যবসা
কাউখালীতে ভিটামিন এ+ ক্যাপসুলের ক্যাম্পেইনের এডভোকেসি সভা অনুষ্ঠিত