
এম,এ রাশেদ,বগুড়া জেলা প্রতিনিধি:
বগুড়ার শেরপুর উপজেলা-এ গ্রামীণ সড়ক নির্মাণকাজে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ তুলে কাজ বন্ধ করে দিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তাঁদের অভিযোগ, নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার, সড়কের দুই পাশের কৃষিজমি থেকে অপরিকল্পিতভাবে মাটি কাটা, এবং প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ও গুণগত মান বজায় না রেখেই কাজ পরিচালনা করা হচ্ছিল। এতে এলাকাবাসীর মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হলে তারা নির্মাণকাজ বন্ধ করে দেন। ঘটনাটি ঘটেছে উপজেলার খামারকান্দি ইউনিয়ন-এর ঘোড়দৌড় গ্রামে।
স্থানীয়দের দাবি, উপজেলা প্রকৌশলী দপ্তরের যথাযথ তদারকি ও মনিটরিংয়ের অভাবেই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ইচ্ছেমতো কাজ পরিচালনা করছে। ফলে সরকারি অর্থ ব্যয়ে নির্মিত সড়কের স্থায়িত্ব ও মান নিয়ে জনমনে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। এ ঘটনায় তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে উপজেলা প্রশাসন।
উপজেলা প্রকৌশলীর দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, বৃহত্তর পাবনা ও বগুড়া জেলার গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় প্রায় আড়াই কিলোমিটার সড়ক নির্মাণকাজ চলছে। প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছে ২ কোটি ৬৮ লাখ ৪৮ হাজার টাকা। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করছে বরেন্দ্র কনস্ট্রাকশন লিমিটেড। ২০২৫ সালের ১৬ নভেম্বর কাজ শুরু হয় এবং আগামী ৮ সেপ্টেম্বর কাজ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, দীর্ঘ প্রায় দুই দশক ধরে এলাকাবাসী সড়কটি পাকাকরণের দাবি জানিয়ে আসছিলেন। মাঝেমধ্যে কিছু অংশে ইট বিছানো হলেও পুরো সড়কটি কখনোই টেকসইভাবে চলাচলের উপযোগী করা হয়নি। সম্প্রতি পাকা সড়কের কাজ শুরু হওয়ায় মানুষের মধ্যে স্বস্তি ফিরেছিল। কিন্তু কাজের শুরু থেকেই নানা অনিয়ম চোখে পড়ায় সেই আশায় ভাটা পড়ে।
ঘোড়দৌড় এলাকার বাসিন্দা শাকিল বলেন,
“এটি আমাদের এলাকার গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ সড়ক। এই পথ দিয়েই মানুষ উপজেলা সদর ছাড়াও ধুনট ও শাহজাহানপুর উপজেলার সঙ্গে যোগাযোগ করেন। কিন্তু শুরু থেকেই ঠিকাদার নিম্নমানের কাজ করছেন। সড়কের পাশে কৃষিজমি কেটে মাটি এনে ব্যবহার করা হয়েছে। প্রতিবাদ করেও কোনো ফল পাইনি।”
একই এলাকার সাইফুল ইসলাম বলেন,
“প্রায় দুই মাস ধরে কাজ চলছে। এখানে বিট বালু ব্যবহারের কথা থাকলেও বিভিন্ন স্থানে কাদামাটি ফেলা হয়েছে। এতে এলাকাবাসী ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। পরে উপজেলা প্রকৌশলীর দপ্তরের লোকজন এলে তাঁদের সঙ্গে স্থানীয়দের বাকবিতণ্ডা হয়।”
এদিকে সড়ক খুঁড়ে রেখে দীর্ঘ সময় কাজ বন্ধ থাকায় স্থানীয়দের দুর্ভোগ চরম আকার ধারণ করেছে। বিশেষ করে কৃষিপণ্য পরিবহনে মারাত্মক সমস্যা তৈরি হয়েছে।
মাগুড়ের তাইড় এলাকার কৃষক আবদুর রাজ্জাক বলেন,
“মাঠের ধান-ভুট্টা পেকে নষ্ট হচ্ছে। সড়কের কারণে সেগুলো বাড়িতে আনতে পারছি না। একজন শ্রমিকের মজুরি এখন ১২০০ টাকা। এই অবস্থায় আমরা দিশেহারা হয়ে পড়েছি।”
স্থানীয় আরেক বাসিন্দা আব্দুর রহিম অভিযোগ করে বলেন,
“আগে সড়কের কিছু অংশ ইট দিয়ে বাঁধানো ছিল। ঠিকাদারের লোকজন সেই ইট তুলে খোয়া বানিয়েছে। এখন সড়ক এমনভাবে খুঁড়ে রাখা হয়েছে যে যান চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে।”
স্থানীয় বাসিন্দা চান মিয়া বলেন,
“ধান বাড়িতে আনতে কয়েকদিন আগে আমাকে প্রায় ১৫০০ টাকা অতিরিক্ত খরচ করে বিকল্প পথ ব্যবহার করতে হয়েছে।”
ঘোড়দৌড় এলাকার বাবু মিয়া অভিযোগ করেন, সড়কের দুই পাশে থাকা পুকুর ও ডোবার অংশে কোনো গাইড ওয়াল নির্মাণ করা হয়নি। এতে বর্ষা মৌসুমে সড়কটি ভেঙে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তবে কাজে অনিয়মের বিষয়টি আংশিক স্বীকার করেছেন শেরপুর উপজেলা প্রকৌশলীর দপ্তরের সহকারী প্রকৌশলী আসাফুদ্দৌলা বিপ্লব। তিনি বলেন,
“লোকবল সংকটের কারণে সব কাজ নিয়মিত তদারকি করা সম্ভব হয় না। অভিযোগ পাওয়ার পর আপাতত কাজ বন্ধ রাখা হয়েছে।”
তিনি আরও জানান,
“ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সরাসরি কাজ না করে অন্য একজনের মাধ্যমে কাজ পরিচালনা করছে। ফলে সমন্বয়হীনতা তৈরি হয়েছে। আমরা সাইট ইঞ্জিনিয়ারের সঙ্গে কথা বলেছি এবং দ্রুত সমস্যার সমাধানের চেষ্টা চলছে।”
অন্যদিকে বরেন্দ্র কনস্ট্রাকশন লিমিটেড-এর সাইট ইঞ্জিনিয়ার ফিরোজ আহমেদ বলেন,
“অভিযোগ পাওয়ার পর কাজ বন্ধ রাখা হয়েছে। খুব দ্রুত মানসম্মত বালু ও উপকরণ ব্যবহার করে পুনরায় কাজ শুরু করা হবে।”
এ বিষয়ে শেরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাইদুজ্জামান হিমু বলেন,
“সড়ক নির্মাণকাজের গুণগত মান নিশ্চিত করতে উপজেলা প্রকৌশলীকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কোনো ধরনের অবহেলা বা অনিয়ম প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

আরও পড়ুন
লালমোহনে খাটের নিচ থেকে ৩৪ বস্তা চাল উদ্ধার
আওয়ামীলীগ জন্মলগ্ন থেকে দেশের ক্ষতি করেছে: ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু
বগুড়া শেরপুরের চুরি মামলার তদন্তে প্রাপ্ত আসামি আফিল পিন্টু গ্রেপ্তার