হোম » সারাদেশ » নাচোল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দুর্নীতির অভিযোগ

নাচোল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দুর্নীতির অভিযোগ

মোঃ আরিফুল  ইসলামের,নাচোল, চাঁপাইনবয়াবগঞ্জ প্রতিনিধিঃ চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে একাধিক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। কর্মরত স্থানে যোগদানে ঘুষ, সরকারি সম্পদ আত্মসাৎ, অ্যাম্বুলেন্সে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়, পূরনো  আসবাবপত্র বিক্রির টাকা ফাঁকি দেওয়া, মেডিকেলে রোগী ভর্তি না থাকলেও, সমাজসেবা অফিসের ফর্মে রোগীদের ওষুধ লিখে ডাক্তারের সহি সিগনেচার করে ওষুধ উঠিয়ে বিক্রি করা। মেডিকেলের গাছ বিক্রির টাকা আত্মসাত করা, ড্রাইভার অ্যাম্বুলেন্স গোপনে রেখে নিজের মাইক্রো রোগীদের জন্য ব্যবহার করা। সিন্ডিকেটদের বাইরে অন্যরা কোন কিছু করলে, মব সৃষ্টি করে বদলি হতে বাধ্য করাসহ নানা বিষয়ে বর্তমান কর্মরত কর্মকর্তা, কর্মচারী ও স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা দেখা দিয়েছে।
দীর্ঘদিন ধরে দায়িত্বে থাকা কয়েকজন কর্মচারীর বিরুদ্ধে অভিযোগের পাহাড় রয়েছে। তারা স্থানীয় হওয়ায় ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে মব সৃষ্টি করে বাইরের জেলা থেকে আসা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাছ থেকে বিভিন্নভাবে অর্থ আদায়, হেনেস্থা করাসহ নানান ভাবে জড়িত তারা। অভিযুক্তদের মধ্যে রয়েছেন— প্রধান সহকারী মোঃ রাজু আহমেদ, অফিস সহকারী আব্দুল আলীম, অফিস সহায়ক বশির আহমেদ, এবং অ্যাম্বুলেন্স চালক আঃ বারেক আলী।
অভিযোগ রয়েছে, উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা কামাল হোসেনের অনুপস্থিতিতে তার স্বাক্ষর জাল করে ভান্ডার রক্ষক জুয়েল আহমেদকে শোকজ নোটিশ প্রদান করেন প্রধান সহকারী রাজু আহমেদ। শোকজ পত্রে কর্মকর্তার স্বাক্ষর জাল ও নাম ভুল পাওয়া যায়। পদধারী না হয়েও রাজু আহমেদ প্রায়ই কর্মকর্তার চেয়ারে বসে অফিস পরিচালনা করেন। অন্যদিকে, সরকারি মোটরসাইকেল ব্যক্তিগত কাজে নিয়মিত ব্যবহার করা, তৎকালীন স্টুকিপারের দ্বায়িত্বে জকারিয়া থাকলেও চাবি নিয়ে থাকেন বশির আহমেদ। তার মনমত ব্যবহার করতেন বশির আহমেদ।
একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, এই চারজনই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের প্রায় সব অনিয়ম ও দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত। সম্প্রতি সিনিয়র স্টাফ নার্স মুনিরা খাতুন এবং নৈশপ্রহরী সুলতান মাহমুদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ করেন আব্দুল আলীম ও বশির আহমেদ। তাদের রুম থেকেও বের করে দেওয়া হয়। অভিযোগকারীরা বলেন, “বর্তমানে বশির, রাজু, আলীম ও বারেক—এই চারজন মিলে পুরো অফিসকে নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে।” মেডিকেলের একজন ছোট কর্মচারী জানান ডাঃ কামাল হোসেনের সহযোগিতায় বশির আহমেদ সব কাজের কাজি ছিলেন। তিনি ভয়ঙ্কর রুপ নিয়ে দাপটের সহিত সব অনিয়ম, দুর্নীতি করতেন।
নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত চিকিৎসক ও নার্সদের কাছ থেকে ‘বকশিশ’ নামে ২ হাজার টাকা করে নিতেন আঃ আলিম। কাগজে-কলমে হাসপাতালের রান্নাঘরে ২২টি সসপ্যান থাকার কথা থাকলেও বাস্তবে আছে মাত্র ৩টি।
এছাড়াও, ২০১৪ সাল থেকে আবাসিক কোয়ার্টারে উপজেলা হিসাব রক্ষ অফিসের তাহাসিনা খাতুন গোপনে ভাড়া থাকছেন। অভিযোগ রয়েছে, কোয়ার্টারটি স্বাস্থ্যবিভাগের বরাদ্দ হলেও অ্যাম্বুলেন্স চালক আঃ বারেক তার নামে ভাড়া নিয়ে পরে তাহসিনা কে গোপনে ভাড়া দেন। প্রতিমাসে ২,৪৫০ টাকা হারে ভাড়া বাবদ প্রায় ৩ লাখ ২৩ হাজার টাকা পুরোটাই আঃ আলিম এবং বারেকের পকেটে গেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এ অর্থের কোনো হিসাব উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের নথিতে পাওয়া যায়নি।
অ্যাম্বুলেন্স সেবায়ও রয়েছে অনিয়ম। রাজশাহী পর্যন্ত সরকার নির্ধারিত ১,৬৫০ টাকার ভাড়ার পরিবর্তে ২,৬০০–৩,০০০ টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত অর্থ নেওয়ার অভিযোগ করেছেন একাধিক ভুক্তভোগী।
প্রতিবেদনে আরও জানা যায়, এমার্জেন্সি রোগীর অ্যাম্বুলেন্স প্রয়োজন হলে, অ্যাম্বুলেন্সের ঘরে তালা মেরে রেখে, ক্যাম্পাসের ভেতরে রাখা ড্রাইভার বারেক এর নিজস্ব মাইক্রোতে করে ২৫০০ থেকে ৩০০০ টাকা ভাড়া দিয়ে রোগীদের যেতে হয় রাজশাহী।
এই প্রতিবেদক সরেজমিনে গিয়ে দেখেন, কোনো নিয়োগপত্র ছাড়াই মাসুম নামের এক ব্যক্তি ইমারজেন্সি রুমে রোগী দেখছেন। তিনি দাবি করেন, ডাক্তার নন, হাসপাতালের বিদ্যুৎকাজ করেন। কর্তব্যরত চিকিৎসকও স্বীকার করেন, “রোগীর চাপের সময় মাঝে মাঝে এদিক-ওদিক হয়ে যায়।”
অভিযুক্তদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও একে অপরের উপর দ্বায় চাপিয়ে দেন। এবং কেউই ক্যামেরার সামনে মন্তব্য করতে রাজি হননি। উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডাঃ মোঃ মাহাবুব-উল আলম বলেন—“আমি দুইদিন হলো যোগদান করেছি। অভিযোগগুলো তদন্ত করে দেখব। সত্যতা প্রমাণ হলে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনের আওতায় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
স্থানীয়রা অভিযোগ করেন, সরকারি হাসপাতাল হওয়া সত্ত্বেও এখানে চলছে ব্যক্তিগত প্রভাব ও স্বার্থের রাজনীতি। এসব অনিয়ম সাধারণ মানুষের চিকিৎসা সেবা আরও দুর্বিষহ করে তুলছে। কাজেই এদেরকে এখান থেকে অন্য জায়গায় বদলি করে এই হাইনাদের হাত থেকে রক্ষা করতে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে করোজোরে আবেদন করেছেন।
শেয়ার করুন আপনার পছন্দের সোশ্যাল মিডিয়ায়
error: Content is protected !!