
নিজস্ব সংবাদদাতা
পৃথিবীর দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকত কক্সবাজার আজ অব্যবস্থাপনা, দখলদারিত্ব ও দায়িত্বহীনতার শিকার। একসময়ের অপরূপ সৌন্দর্যে ভরা এ সৈকত এখন যত্রতত্র স্থাপিত ঝুপড়ি দোকান, অস্থায়ী স্থাপনা ও বাণিজ্যিক দখলদারির কারণে তার স্বকীয়তা হারাচ্ছে।
ঝাউবিথী হারিয়ে যাচ্ছে জোয়ারে
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রতিদিনের জোয়ারের পানিতে সৈকতের স্মৃতি বিজড়িত ঝাউবন ধ্বংস হচ্ছে। এসব ঝাউগাছ একসময় পর্যটকদের কাছে ছিল প্রধান আকর্ষণ। কিন্তু এখন সেগুলোর জায়গায় কেবল কংক্রিটের স্থাপনা, ঝুপড়ি দোকান আর আবর্জনার স্তূপ।
সৈকতের বালুতে দখলবাজি
অভিযোগ রয়েছে, সৈকতের খনিজ বালুর ওপর গড়ে তোলা হচ্ছে সারি সারি অস্থায়ী দোকান ও চায়ের স্টল। এসব দোকানপাট দেখতে যেমন শ্রীহীন, তেমনি বালুর প্রাকৃতিক গঠন নষ্ট করে দিচ্ছে। এতে বালু সরে গিয়ে জোয়ারের পানিতে ক্ষয়ক্ষতি আরও বাড়ছে।
প্রশাসনের দায়িত্বহীনতা
স্থানীয়রা বলছেন, যাদের দায়িত্বে এই বিশ্ববিখ্যাত সৈকত চলছে, তাদের অনেকের স্থায়ী বসবাস কক্সবাজারে নয়। ফলে তারা দায়িত্বহীনতার পরিচয় দিচ্ছেন। দখলবাজি, ঝুপড়ি দোকান কিংবা অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয় না।
পর্যটকদের ক্ষোভ
কক্সবাজারে বেড়াতে আসা পর্যটকরাও ক্ষুব্ধ। ঢাকার পর্যটক সুমাইয়া হক বলেন, “এত বড় সমুদ্র সৈকত দেখতে এসে হতাশ হলাম। সৈকতের সৌন্দর্যের বদলে চোখে পড়ে শুধু দোকান আর ময়লা-আবর্জনা। বিদেশে এ রকম হলে কঠোর আইন প্রয়োগ করে সৈকত সংরক্ষণ করা হতো।”
আরেক পর্যটক মিজানুর রহমান জানান, “সৈকতের প্রতিটি স্পট এখন ব্যবসায়ীদের দখলে। কোথাও বসে সমুদ্র উপভোগ করার মতো খোলা জায়গাই নেই।”
পরিবেশবিদদের সতর্কবার্তা
পরিবেশবিদরা বলছেন, সৈকতের ঝাউগাছ ও বালুর স্তর প্রকৃতিক এক ভারসাম্য রক্ষা করে। এগুলো ধ্বংস হলে জলোচ্ছ্বাস ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যাবে। এ ছাড়া সৈকতের জীববৈচিত্র্যও চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
টুরিস্ট পুলিশের বক্তব্য
কক্সবাজার টুরিস্ট পুলিশের অতিরিক্ত ডিআইজি আপেল মাহবুব বলেন, > “কক্সবাজার সৈকত বিশ্বের সবার সম্পদ। এর সৌন্দর্য রক্ষায় প্রশাসন সবসময় সচেষ্ট। ঝুপড়ি দোকান ও অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে নিয়মিত অভিযান চলছে। তবে একদিনে সব সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। আমরা চাই স্থানীয় জনগণ ও ব্যবসায়ীরাও সচেতন হোক এবং সৈকতের সৌন্দর্য ধরে রাখতে সহযোগিতা করুক।”
পর্যটন ম্যাজিস্ট্রেটের বক্তব্য
কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের পর্যটন ম্যাজিস্ট্রেট বলেন, > “সৈকতের সৌন্দর্য নষ্ট করে এমন কোনো স্থাপনা বরদাস্ত করা হবে না। নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। অনেক ঝুপড়ি দোকান ইতিমধ্যেই উচ্ছেদ করা হয়েছে। তবে দখলদাররা আবারও বসার চেষ্টা করে। আমরা কঠোর নজরদারিতে আছি, ভবিষ্যতে আরও বড় অভিযান চালানো হবে।”
ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা
কক্সবাজারের সন্তানরা আশঙ্কা করছেন, অব্যবস্থাপনা ও দখলদারিত্ব অব্যাহত থাকলে সৈকত তার ঐতিহ্য হারিয়ে ফেলবে। আগামী প্রজন্মের কাছে পৃথিবীর দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকত কেবলই ইতিহাস হয়ে থাকবে।
করণীয়
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সৈকত রক্ষায় অবিলম্বে সুপরিকল্পিত উদ্যোগ, কঠোর নজরদারি ও দখলমুক্তকরণ অভিযান চালানো প্রয়োজন। অন্যথায় পৃথিবীর দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকত হিসেবে কক্সবাজারের গৌরব আর বেশিদিন টিকবে না।

আরও পড়ুন
বগুড়া মহাস্থান মাজারের ১৫ দানবাক্সে মিলল সাড়ে ৩৪ লাখ টাকা, গণনায় লেগেছে প্রায় দুই দিন
ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় গাঁজাসহ মাদক কারবারি গ্রেফতার
নওগাঁয় সরকারি কর্মকর্তা পরিচয়ে প্রতারণা করায় যুবক আটক