
ফয়সাল হাসান, চট্টগ্রাম
বন্দর নগরীর চট্টগ্রামে — বন্দর থানাধীন মধ্য হালিশহরের চান্দারপাড়ায় “প্যাসিফিক হোম মিট ফুড প্রোডাক্টস” নামের একটি বেকারি কারখানায় চলছে ভয়ঙ্কর অব্যবস্থাপনা ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে খাদ্যপণ্য উৎপাদন। প্রতিদিন এখান থেকে বাজারজাত হচ্ছে বিস্কুট, ড্রাই কেক, কেক, বাটার বান, ক্রিম বানসহ নানান ধরনের জনপ্রিয় খাদ্যসামগ্রী। অথচ কারখানায় নেই কোনো অনুমোদিত কাগজপত্র, নেই স্বাস্থ্যসম্মত উৎপাদন পরিবেশ, নেই যথাযথ সরকারি অনুমতি।
সরেজমিন চিত্র: ময়লার স্তুপে খাদ্য উৎপাদন প্রতিবেদকের সরেজমিন পর্যবেক্ষণে দেখা যায়—কারখানার ভেতরে ছড়িয়ে আছে ময়লা-আবর্জনা। খাবার উৎপাদনের কক্ষগুলো দুর্গন্ধময় ও অস্বাস্থ্যকর। কর্মচারীরা কারও শরীরে নেই স্বাস্থ্যসম্মত ইউনিফর্ম, নেই হ্যান্ড গ্লাভস বা মাস্ক। খালি হাতে ক্রিম মেখে বান তৈরি করতে দেখা গেছে একাধিক কর্মীকে। এমনকি উৎপাদন ও প্যাকেজিং প্রক্রিয়ায় কোনো প্রকার স্বাস্থ্যবিধি মানা হচ্ছে না।
ভুয়া বিএসটিআই লোগো ব্যবহার-কারখানার ইনচার্জ জহিরুল ইসলামের কাছে অনুমোদনের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি সন্তোষজনক কোনো উত্তর দিতে পারেননি। অথচ কারখানার তৈরি পণ্যের প্যাকেটে-সুস্পষ্টভাবে ছাপানো রয়েছে বিএসটিআই অনুমোদিত লোগো। পরে জিজ্ঞাসা করলে তিনি স্বীকার করেন, বর্তমানে কোনো অনুমোদন নেই, তবে কাগজপত্র নাকি “জমা দেওয়া হয়েছে”।
মালিক পক্ষের অসৌজন্যমূলক আচরণ—প্রতিবেদকের একাধিকবার ফোন করার পরেও মালিক পক্ষ ইচ্ছাকৃতভাবে এড়িয়ে যান। পরবর্তীতে দেলোয়ার নামে একজন নিজেকে মালিক পক্ষের প্রতিনিধি পরিচয় দিয়ে প্রতিবেদকের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ করেন। তিনি পাল্টা প্রশ্ন করে বলেন, “আপনারা কে আমাদের কারখানার কাগজপত্র চাইবেন? এই অনুমতি কে দিয়েছে আপনাদের?” — যা স্পষ্টতই দায় এড়ানোর কৌশল।
বছরের পর বছর নজরদারিহীন কার্যক্রম—স্থানীয়রা জানিয়েছেন, বহু বছর ধরে এই কারখানা চলছে। কিন্তু কখনো কোনো সরকারি তদারকি কিংবা ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান চোখে পড়েনি। ফলে অনুমোদনবিহীন ও নোংরা পরিবেশে উৎপাদিত এসব নিম্নমানের খাদ্যসামগ্রী প্রতিদিন ভোক্তাদের ঘরে ঘরে পৌঁছে যাচ্ছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা-জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, এ ধরনের খাদ্য দীর্ঘদিন ভোক্তারা গ্রহণ করলে—হজমের সমস্যা,পেটের বিভিন্ন অসুখ,খাদ্যবাহিত রোগ,এমনকি ক্যান্সারের মতো জটিল রোগও হতে পারে।
তাদের মতে, এটি শুধুই জনস্বাস্থ্য নয়, বরং জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে জড়িত একটি বড় সংকট, কারণ দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম নীরবে আক্রান্ত হচ্ছে ভেজাল খাদ্যের কারণে।
প্রশাসনের হস্তক্ষেপের দাবি—এই ঘটনার পর স্থানীয় ভোক্তারা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন,আমরা চাই দ্রুত এধরনের ভেজাল ও অস্বাস্থ্যকর খাদ্য উৎপাদন বন্ধ করা হোক। এ ধরনের কারখানাগুলো প্রশাসনের ছত্রছায়ায় চলে বলে তারা এতদিন ধরা-ছোঁয়ার বাইরে ছিল। কঠোর অভিযান চালিয়ে মালিক ও দায়ীদের শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
জনদাবি: কঠোর শাস্তি ও নজরদারি-এখন এই ঘটনার পর সাধারণ মানুষের একটাই দাবি—অবিলম্বে কারখানাটি সিলগালা করা হোক,
মালিকের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হোক ভোক্তা অধিকার, খাদ্য অধিদপ্তর ও বিএসটিআই একসঙ্গে সমন্বিত অভিযান চালিয়ে দেশের প্রতিটি বেকারি ও খাদ্য কারখানার নিয়মিত পরিদর্শন করা হোক কারণ প্রশ্ন উঠেছে—যেখানে ন্যূনতম স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ নেই, সেখানে কীভাবে সরকারি অনুমোদন দেওয়া হবে? আর যদি অনুমোদন না থাকে, তবে বছরের পর বছর ধরে এই কারখানা কীভাবে ভোক্তাদের কাছে পণ্য সরবরাহ করে যাচ্ছে?
এই ঘটনা শুধু একটি কারখানার নয়, বরং সারাদেশে চলমান অস্বাস্থ্যকর খাদ্য উৎপাদন প্রক্রিয়ার নগ্ন চিত্র। প্রশাসন যদি এখনই কঠোর ব্যবস্থা না নেয়, তবে একদিকে জনস্বাস্থ্য মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়বে, অন্যদিকে ভোক্তাদের আস্থা ধ্বংস হয়ে যাবে। তাই এখন সময় এসেছে, আইন অনুযায়ী কঠোর শাস্তি দিয়ে অন্য বেকারিগুলোর জন্য দৃষ্টান্ত তৈরি করা।

আরও পড়ুন
বগুড়া মহাস্থান মাজারের ১৫ দানবাক্সে মিলল সাড়ে ৩৪ লাখ টাকা, গণনায় লেগেছে প্রায় দুই দিন
ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় গাঁজাসহ মাদক কারবারি গ্রেফতার
নওগাঁয় সরকারি কর্মকর্তা পরিচয়ে প্রতারণা করায় যুবক আটক