হোম » সারাদেশ » টঙ্গীতে জ্যোতির জীবনের ৩৬ ঘণ্টার অন্ধকার

টঙ্গীতে জ্যোতির জীবনের ৩৬ ঘণ্টার অন্ধকার

টঙ্গীর আকাশে এখনো ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা। তবে এক মায়ের বুক আজ শুন্য, এক পরিবারে নেমে এসেছে নিস্তব্ধতা। খোলা একটি ম্যানহোলে হারিয়ে যাওয়া তাসনিম সিদ্দিকী জ্যোতির নিথর দেহ খুঁজে পাওয়া গেছে ৩৬ ঘণ্টা পর।

গত রবিবার (২৭ জুলাই) রাত ৮টার দিকে জ্যোতি টঙ্গীর হোসেন মার্কেট এলাকায় হেঁটে যাচ্ছিলেন। চারপাশে তখন বৃষ্টির গর্জন, আর ফুটপাত জুড়ে জল। সেই সময়ই খোলা ও ঢাকনাবিহীন এক ম্যানহোল তাকে গ্রাস করে— এক নিমিষেই।

কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই স্রোতের তোড়ে জ্যোতি তলিয়ে যান অজানার দিকে। ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দল রাতভর খুঁজেছে, কিন্তু ব্যর্থ হয়েছে বারবার।
মঙ্গলবার (২৯ জুলাই) সকাল ৯টার দিকে, অবশেষে উদ্ধারকর্মীরা তার নিথর দেহ পান টঙ্গীর বাষ্পট্টি বিলের মাঝখানে।

তাসনিম সিদ্দিকী জ্যোতি (৩০) ছিলেন মিরপুর ১০ নম্বরের বাসিন্দা। বাবা মারা গেছেন আগেই, মা বেঁচে আছেন। তিনি ‘মনি ট্রেডিং’ নামক একটি ওষুধ আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানে সেলসম্যান হিসেবে কাজ করতেন। কর্মজীবী, সংগ্রামী— এমন এক নারীর জীবন শেষ হয়ে গেল অনিরাপদ এক রাস্তায়, এক ঢাকনাহীন গর্তে।

“জ্যোতি শুধু একজন কর্মজীবী নারী ছিলেন না, ছিলেন একটি পরিবারের ভরসা, ছিলেন সমাজের সম্ভাবনা।”
বোন হারিয়েছেন ভাই, মেয়ে হারিয়েছেন মা, বন্ধু হারিয়েছেন সহকর্মীরা। কিন্তু রাষ্ট্র হারিয়েছে তারই নাগরিকের প্রতি দায়িত্বশীলতার একটি বড় প্রশ্ন।

এ ঘটনায় সোমবার সন্ধ্যায় স্থানীয়রা ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক অবরোধ করে ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
তাদের কণ্ঠে উঠে আসে আর্তনাদ, “জ্যোতির মতো আর কেউ যেন না হারিয়ে যায়, শুধু একটি ঢাকনার অভাবে!”

“খোলা ম্যানহোল” নয়, এটা ছিল মৃত্যুফাঁদ
স্থানীয়দের অভিযোগ, অপরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থার কারণে বড় ড্রেন সংকুচিত করে ছোট করা হয়েছে, যার ফলে সৃষ্টি হয়েছে প্রচণ্ড স্রোত। ফুটপাত ঘেঁষে খোলা এসব ম্যানহোল ঘিরে নেই কোনো সতর্কতা, নেই রেলিং, নেই কোনো নিরাপত্তা বলয়।
ফায়ার সার্ভিসের সিনিয়র অফিসার মো. শাহিন আলম বলেন, “ম্যানহোলটি প্রায় ১০ ফুট গভীর ছিল, বৃষ্টির পানিতে সেটি পুরোপুরি তলিয়ে গিয়েছিল। উদ্ধার করতেই এত সময় লেগেছে।”

তদন্ত চলছে, কিন্তু জ্যোতি তো আর ফিরবেন না
গাজীপুর সিটি করপোরেশন ৪ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। ফায়ার সার্ভিসসহ বিভিন্ন সংস্থা যুক্ত এই কমিটি ৭ কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দেবে। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে— “এই প্রতিবেদন, এই দেরি, এই দায় এড়ানোর সংস্কৃতি কি আরেকটি জ্যোতির জীবন বাঁচাতে পারবে?”

স্থানীয় বাসিন্দারা আজ একটাই দাবি জানাচ্ছেন—“প্রতিটি ম্যানহোল ঢাকুন, প্রতিটি রাস্তা নিরাপদ করুন। কারণ জ্যোতিরা প্রতিদিন আমাদের পাশে হাঁটে।”
তাসনিম সিদ্দিকী জ্যোতির গল্প শুধু একটি মৃত্যুর গল্প নয়, এটা রাষ্ট্রীয় অব্যবস্থাপনার দায়মুক্তির গল্প। তার হারিয়ে যাওয়া যেন আমাদের চোখ খুলে দেয়, যেন আর কোনো মা তার মেয়েকে খালি হাতে খুঁজতে না হয়।

শেয়ার করুন আপনার পছন্দের সোশ্যাল মিডিয়ায়
error: Content is protected !!