
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে গোলাম মোস্তফা বলেন, গত সোমবার (৩১ মার্চ) ঈদের দিন আমি বগুড়া থেকে বাড়ি ফিরছিলাম। রাত সাড়ে ১১ টার দিকে তাড়াশ-রানীহাট আঞ্চলিক সড়কের বেরখালি এলাকায় সড়কের উপর গাছ ফেলে আট থেকে ১০ জনের ডাকাত দল আমাদের আক্রমন করেন। ডাকাতের দল প্রথমে আমার প্রাইভেটকার চালক লিটন চন্দ্রদাশকে হাসুয়া দিয়ে কোপ মারেন। তিনি সামান্য আহত হোন। তারপর আমার কাছ থেকে ৪৬ হাজার টাকা ও একটি স্বর্ণের চেইন ছিনিয়ে নেন। গাড়ির ভেতর একদম তছনছ করে ফেলেন আরো কিছু পাওয়ার আশায়। প্রায় দশ মিনিট সময় লেগে যায় ডাকাতি করতে। তাড়াশ থানা পুলিশ টহলের সামান্য অদূরেই ঘটে ডাকাতির ঘটনা।
সংবাদ সম্মেলনে গোলাম মোস্তফা আরো বলেন, আমার ফোনে চার্জ ছিলোনা। আমি বাড়িতে গিয়ে আমার স্ত্রী ফারজানা পারভিনকে ঘুম থেকে ডেকে তুলি ও পাওয়ার ব্যাংক ফোনে লাগিয়ে তাড়াশ থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) মো. নাজমুল কাদের কল দেই। তিনি আমাকে থানায় যেতে বলেন। কিছুক্ষণের মধ্যে তিনিও থানায় আসেন। আমি ও আমার স্ত্রীকে থানার গেটের ভেতরে দাড় করিয়ে রেখে ডাকাতির ঘটনার বর্ণনা শুনতে চান এবং পরের দিন অভিযোগ দিতে বলেন। আমি বলি অভিযোগ দিয়ে কি হবে। একই রাতে একাধিক ডাকাতি হচ্ছে পুলিশ টহল গাড়ির সামান্য দূরে। আমি ডাকাতির মামলা করতে করতে চাই। এ কথা বলতেই পুলিশ পরিদর্শক তদন্ত আমার উপর ক্ষেপে যান। আমাকে তেরে-তেরে মারতে আসেন এবং আমার ড্রাইভারকে বলেন ‘এই শুয়োরের বাচ্চা প্রাইভেটকার থানার ভেতরে রেখে দে। গাড়ি জব্দ করা হল, গাড়িতে অবৈধ মালামাল আছে।’ এক পর্যায়ে আমার স্ত্রীকে তিনি নিজে আমার প্রাইভেটকার থেকে টেনে হেঁচরে নামান। এতে আমার স্ত্রী ডান হাঁটুতে আঘাত পান।
এরপর আমাকে বলেন তুই মদ খেয়ে এসে থানায় আক্রমণ করেছিস। চল তোকে হাসপাতালে নিয়ে পরিক্ষা করাবো। তিনি আমাকে পুলিশ পিকআপে তুলতে বলেন। কিন্তু তেমন কেউ তার ডাকে সারা দেন না। পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) মো. নাজমুল কাদের নিজেই আমার শার্টের কলার ধরে ধাক্কাতে ধাক্কাতে পুলিশ পিকআপ তোলার চেষ্টা করেন। এএসআই উত্তম কুমারও আমার সাথে যথেষ্ট খারাপ ব্যবহার করেন। পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) মো. নাজমুল কাদের আমার চুল টেনে ধরে গাড়িতে তোলেন ও ঘারে বেশ কয়েকটি কিল ঘুষি মারেন। গাড়িতে তুলে আমার দুই হাতের কব্জিতে পুলিশের লাঠি দিয়ে বারি মারেন এবং বলতে থাকেন পাঁচ তারিখের আগে হলে তোকে ডাকাতির স্থানে নিয়ে ক্রস ফয়ার দিতাম। পরে বলতাম ডাকাত দলের সদস্যদের সাথে গোলাগুলির সময় তুই মারা গেছিস। আমার স্ত্রী ফারজানা পারভিন মারধর থেকে আমাকে বাঁচাতে এগিয়ে এলে পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) মো. নাজমুল কাদের আবারো আমার স্ত্রীকে ধাক্কা মেরে দূরে সরিয়ে দেন। যা একজন নারীর সভ্রমহানীর সামিল। তারপর আমাকে তাড়াশ হাসপালে নিয়ে যান। আমাকে জরুরি বিভাগে বসিয়ে রেখে ডাক্তারদের সামনে শুয়োরের বাচ্চা বলে গালি ও হুমকি দিতে থাকেন।
একপর্যায়ে আমার স্ত্রীর মাধ্যমে প্রস্তাব দেন ‘ভাবি আপনে ভাইকে বলেন যা হওয়ার হয়েছে, ভাই যদি এসব নিয়ে বাড়াবাড়ি না করে তাহলে ভাইকে ছেড়ে দেব। আমি তার প্রস্তাবে অস্বীকৃতি জানাই।’ দায়িত্বরত চিকিৎসক আমার স্বাস্থ্য পরিক্ষার জন্য সিরাজগঞ্জ সদর হাসপাতালে স্থানান্তর করেন। যথারীতি আমাকে আবারো থানায় নিয়ে মুন্সীর কক্ষে বসিয়ে রাখেন। আমি বলি ভাই আমাকে হাজত খানায় দেন, রাত শেষের দিকে আমি একটু ঘুমাবো। আর দয়া করে আমাকে একটু পানি খেতে দিন। আমি চার ঘন্টা ধরে পানি পানি করছি। পরে মুন্সীর কক্ষের জানালা দিয়ে দুই বতল পানি দেন পুলিশ সদস্য।
মুন্সীর কক্ষে আমাকে বসিয়ে রেখে যাওয়ার সময় পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) মো. নাজমুল কাদের বলে যান, সিরাজগঞ্জ সদর হাসপাতাল থেকে তোর স্বাস্থ্য পরিক্ষার রিপোর্ট হাতে পেতে প্রায় এক মাস সময় লেগে যাবে। তুই কারাগাড়ে থাকবি। রিপোর্ট যাই আসুক, এই এক মাসে তোর নামে চাঁদাবাজি, আওয়ামীলীগের দোষরসহ পাঁচ থেকে ছয়টা মামলা লাগিয়ে দেব। তোর প্রাইভেটকার অবৈধ হিসেবে জব্দ করা হবে।
যাতে শতভাগ নিশ্চিত হওয়া যায়, অবৈধ পুকুর খননকারীদের থেকে ঘুষ নেওয়ার অভিযোগে উল্লাপাড়া সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) অমৃত সূত্রধর ও তাড়াশ থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) মো. নাজমুল কাদেরের বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশ করায় তাড়াশ থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) মো. নাজমুল কাদের আমাকে ফাঁসাতে চেয়েছিলেন। শেষে তিনি আমার বন্ধু এস এম তারিককে বলেন ‘আপনারা হাসপাতালে গিয়ে আমাকে কল দেন, আমি ডাক্তারকে বলে দিচ্ছি মদ খাওয়ার মতো কোন ঘটনা ঘটেনি। আপনার ঐ রেজিষ্টার সরিয়ে ফেলেন। ’ এ কথাগুলো তিনি হাসপাতালের জরুরি বিভাগে দায়িত্বরত কাজলি খাতুনকে বলে দেন। এদিকে পুলিশি নির্যাতনের যন্ত্রণায় আমি ব্যথায় কাতরাতে থাকি। পরে তাড়াশ হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসাসেবা গ্রহণ করি। বিশেষ করে ডাকাতির মামলা না নেওয়ায় অভিযোগ দিতে বাধ্য হই।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে গোলাম মোস্তফার স্ত্রী ফারজানা পারভিন বলেন, অবৈধ পুকুর খননকারীদের থেকে ঘুষ নেওয়ার অভিযোগে উল্লাপাড়া সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) অমৃত সূত্রধর ও তাড়াশ থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) মো. নাজমুল কাদেরের বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশ করেন আমার স্বামী। এ কারণে তাড়াশ থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) মো. নাজমুল কাদের ব্যক্তিগত আক্রোশে আমার স্বামীকে থানায় আক্রমনকারী হিসেবে ফাঁসানোর চেষ্টা করেন ও মারধর করেন। আমাকে প্রাইভেটকার থেকে টেনে হেঁচরে নামান এবং ধাক্কা দেন। যা একজন নারীর সমভ্রমহানীর সামিল।
অপরদিকে নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, ঈদের দিন রাতেই তাড়াশ-রানীহাট আঞ্চলিক সড়কের বেড়খালি নামক স্থানে তিনটি ডাকাতির ঘটনা সংগঠিত হয়। গত দেড় মাসে একই স্থানে আট থেকে ১০টি ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে।
তাড়াশ ভি এস এ উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. সাইদুর রহমান বলেন, বেরখালি এলাকার একই স্থানে আমিও ডাকাত দলের কবলে পড়েছিলাম। আমার আগে একটি ট্রাক ও একটি মাইক্রোবাস থেকে ডাকাতি হচ্ছিল আমার চোখের সামনে।
তাড়াশের মাসুদ নামে আরেকজন মাইক্রোবাস চালক বলেন, আমার গাড়ি থেকে ডাকাতদল ৬০ থেকে ৭০ হাজার টাকা নেয়। মোবাইল ও আঙটি নেয়। একই সাথে তিনটি মাছের গাড়িতে ডাকাতি করেন রাত পৌঁনে নয়টার দিকে। তাড়াশ সোনালী ব্যাংকের সিনিয় অফিসার মো. মোস্তাক আহমেদ বলেন, বেরখালি এলাকায় আমিও ডাকাতের কবলে পড়েছিলাম।
তাড়াশ থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) মো. নাজমুল কাদের সকল অভিযোগ অশ্বীকার করেন। তবে অভিযোগকারী গোলাম মোস্তফাকে থানা নিয়ে আটক করার পর হাসপাতালে নিয়ে ডোপ ষ্টেট করার কথা শ্বীকার করেন। পরে স্থায়ীয় হাসপাতালে ডোপ ষ্টেটের ব্যবস্থা না থাকায় পুনরায় নিয়ে এসে একটি মুচলেকা মাধ্যমে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়।
এরআগে, তাড়াশে অবৈধ পুকুর খননকারীদের থেকে ঘুষ নেওয়ার অভিযোগে উল্লাপাড়া সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) অমৃত সূত্রধর ও তাড়াশ থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) মো. নাজমুল কাদেরের বিরুদ্ধে দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকার অনলাইনসহ স্থানীয় একাধিক পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশ হয়।

আরও পড়ুন
বাঘা পৌরসভার প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে ঠিকাদারের কাছ থেকে ৪ লাখ টাকা ঘুষ দাবির অভিযোগ
নওগাঁয় সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ও আহত পরিবারে আর্থিক সহযোগিতা প্রদান
দশ মাসের আত্মগোপনের অবসান: র্যাবের অভিযানে ধরা মমিনুল হত্যা মামলার আসামি