হোম » সারাদেশ » প্রত্যন্ত গ্রামে মোগল স্থাপত্যের ছোঁয়ায় নির্মিত ‘হিন্দা শাহী মসজিদ’

প্রত্যন্ত গ্রামে মোগল স্থাপত্যের ছোঁয়ায় নির্মিত ‘হিন্দা শাহী মসজিদ’

তারিকুল ইসলাম তালুকদার,কালাই( জয়পুরহাট) প্রতিনিধিঃ ইতিহাস ও স্থাপত্যের এক অনন্য মিলনস্থল জয়পুরহাট জেলার ক্ষেতলাল উপজেলার হিন্দা শাহী পাঁচ গম্বুজ মসজিদ।ধর্মীয় ও স্থাপত্যশৈলীর অপূর্ব সংমিশ্রণে নির্মিত এই মসজিদ আজও সময়ের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।মোগল স্থাপত্যের ছোঁয়া আর নৈসর্গিক সৌন্দর্যে সমৃদ্ধ  এই মসজিদ শুধু মুসল্লিদের নামাজ আদায়ের স্থান নয়,এটি একটি ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক নিদর্শনও বটে।
জেলা সদর থেকে ১৫ কিলোমিটার এবং উপজেলা সদর থেকে মাত্র ৬ কিলোমিটার দক্ষিণে বড়াইল ইউনিয়নের হিন্দা কসবা গ্রামের তিন মাথা বাজারে অবস্থিত এই মসজিদ দূর- দূরান্তের দর্শনার্থীদের আকৃষ্ট করে।এর স্থাপত্যশৈলী, কারুকাজ এবং নির্মাণকৌশল মুগ্ধ করে ধর্মপ্রাণ মুসল্লি ও সৌন্দর্যপিপাসু পর্যটকদের।পর্যটকরা জেলা শহর থেকে সিএনজি চালিত যানবাহন বা ব্যাটারী চালিত অটোরিকশা নিয়ে ৬০/৭০ টাকা ভাড়া দিয়ে সহজেই পিচঢালা রাস্তা দিয়ে স্থাপত্যশৈলীর সংমিশ্রণে নির্মিত হিন্দা শাহী মসজিদ পরিদর্শনে যেতে পারেন।জেলার বাহিরের কিংবা বিদেশি পর্যটকরা জেলা শহরের আবাসিক হোটেলে হাজার বারশো টাকা ভাড়া দিয়ে রাত্রি যাপনের সুবিধাও সহজেই পেতে পারেন।
মসজিদটির সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো এর চমৎকার কারুকাজ ও গঠনশৈলী।মোগল আমলের অধিকাংশ স্থাপনার মতো পোড়ামাটির কারুকাজের পরিবর্তে এখানে ব্যবহৃত হয়েছে রঙিন কাচ,চিনামাটির টুকরা ও মোজাইকের সমন্বয়ে তৈরি সুদৃশ্য অলংকরণ।যখন সূর্যের আলো মসজিদের গায়ে পড়ে,তখন তা এক স্বর্গীয় সৌন্দর্যে উদ্ভাসিত হয়।
পাঁচটি গম্বুজ বিশিষ্ট এই মসজিদের নির্মাণশৈলী ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের প্রতীক হিসেবে গৃহীত হয়েছে।প্রধান গম্বুজটি মাঝখানে স্থাপিত,আর চারটি ছোট গম্বুজ চার পাশে অবস্থান করছে। বিস্ময়কর বিষয় হলো,পুরো মসজিদটি নির্মাণে কোনো রড ব্যবহার করা হয়নি,যা আজকের আধুনিক প্রকৌশলীদেরও বিস্মিত করে।
মসজিদের ভেতরে প্রবেশ করলে নজরে আসবে অপরূপ নকশা ও ক্যালিগ্রাফি। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলো প্রধান গম্বুজের অভ্যন্তরে পবিত্র আয়াতুল কুরসী সুদৃশ্যভাবে খচিত রয়েছে, যা মুসল্লিদের মনে এক অনন্য ধর্মীয় অনুভূতি জাগ্রত করে। মসজিদের অভ্যন্তরের দৈর্ঘ্য ৪৯.৫০ ফুট এবং প্রস্থ ২২.৫০ ফুট। উত্তর পাশে ৪০ ফুট উচ্চতার একটি মিনার রয়েছে,যার শীর্ষে মাইকের মাধ্যমে আযানের ধ্বনি চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে।
মসজিদটির ইতিহাস জানতে গিয়ে জানা যায়, এটি প্রতিষ্ঠিত হয় পীর কাশিমপুরের চিশতিয়া তরিকার অন্যতম ব্যক্তিত্ব হযরত খাজা শাহ মাওলানা আব্দুর গফুর চিশতীর (রহ.) নির্দেশে। তাঁর অন্যতম খলিফা আব্দুল খালেক চিশতি এলাকাবাসীর সহায়তায় বাংলা ১৩৬৫ সন (১৯৫৮ খ্রিস্টাব্দে) এই মসজিদের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন।
প্রবীণ বাসিন্দা, ৮৮ বছর বয়সী শিক্ষক ছাবের হোসেন ফকির স্মৃতিচারণ করে বলেন,ছোটবেলা এই মসজিদ নির্মাণের কাজে বাবার সাথে এসে সহযোগিতা করেছি।এই বৃদ্ধ বয়সে এসেও এখানে নামাজ পড়ে হৃদয়ে তৃপ্তি নেয়। মসজিদ সংলগ্ন স্থানে হযরত শাহ সুলতান বখতির চারজন শিষ্যের মাজার রয়েছে,যেখানে প্রতি বৃহস্পতিবার হালকায়ে জিকির অনুষ্ঠিত হয়।দূর-দূরান্ত থেকে ধর্মপ্রাণ মুসল্লিরা এখানে সমবেত হন,কুরআন তেলাওয়াত ও জিকির-আসকারে মগ্ন হন।
রাজশাহী বিভাগের বিভিন্ন জেলা থেকে আগত দর্শনার্থীদের মধ্যে অন্যতম সিরাজগঞ্জের আমিনুর রহমান। তিনি বলেন,হিন্দা শাহী মসজিদের স্থাপত্যের কারুকার্যের গুনকথা শুনে অনেক দূর থেকে এসেছি।এখানে জুমার নামাজ আদায় করে এক অভূতপূর্ব প্রশান্তি অনুভব করেছি।নামাজ শেষে মহান আল্লাহর কাছে সবার জন্য দোয়া করেছি।”
মসজিদের খতিব মাওলানা আব্দুস সালাম বলেন,মোগল স্থাপত্যের ছোঁয়ায় অনন্য নিদর্শন হিন্দা শাহী মসজিদ কেবল মুসলমানদের নামাজ আদায়ের স্থান নয়,এটি একটি ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক প্রতীকও বটে। সুদৃশ্য নির্মাণশৈলী, কারুকাজ এবং ধর্মীয় আবহ এটিকে বিশেষভাবে অনন্য করে তুলেছে। যদি সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে যথাযথ সংরক্ষণ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয় তবে এটি ভবিষ্যতেও এক অনন্য স্থাপত্য নিদর্শন হিসেবে টিকে থাকবে,যা যুগযুগ ধরে ইসলামী সংস্কৃতি ও সৌন্দর্যের ধারক হয়ে থাকবে।
শেয়ার করুন আপনার পছন্দের সোশ্যাল মিডিয়ায়
error: Content is protected !!