
ঘড়ির কাটায় তখন রাত সাড়ে ১০টা। আইচাপাড়া খনার বাড়ীর কামালের ঘরে বসে ছিলেন ইউপি সদস্য মাকসুদ আলম রনি। হটাৎ কালো বোরখা পরিহিত কয়েকজন যুবক সেখানে আসে। তুলে নিয়ে যায় মাকসুদ আলমকে। এর কিছু সময় পরে গুরুতর জখম অবস্থায় সড়ক থেকে তাকে উদ্ধার করে এলাকাবাসী। সেদিন রাতেই চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান তিনি। তবে হত্যাকান্ডের প্রায় তিনমাস পেরিয়ে গেলেও হয়নি মামলা। উদঘাটন হয়নি খুনের রহস্য। জীবন নিয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যরা। নিতে পারছেনা আইনী পদক্ষেপ।
গত ৫ই আগষ্ট রাতে নোয়াখালীর সোনাইমুড়ী উপজেলার আমিশাপাড়া ইউনিয়নের আইচাপাড়া গ্রামে এই হত্যাকান্ড ঘটে। দুই শিশু সন্তান নিয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন খুন হওয়া ইউপি মেম্বারের স্ত্রী। আর মৃত্যুর আতঙ্কে এলাকা ছাড়া নিহতের ছোটভাই। বড় ছেলে খুন হওয়া ও ছোট ছেলে পলাতক থাকায় মানবেতর জীবনযাপন করছেন বিধবা বৃদ্ধা মা।
জানা যায়, নিহত মাকসুদ আলম রনি আইচাপাড়া পাটোয়ারী বাড়ির মৃত আবু তাহেরের ছেলে। ২০২২ সালের নির্বাচনে আমিশাপাড়া ইউনিয়নের ৯নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য নির্বাচিত হন। জীবিকার মাধ্যম হিসেবে এলাকায় করতেন মাটির ব্যবসা।
খোনার বাড়ীর কামালের ঘর থেকে ইউপি সদস্য মাকসুদ আলম রনিতে তুলে নেওয়ার সময়ে প্রতক্ষদর্শী ছিলেন প্রতিবেশী সেমনা বেগম। ঘটনার বর্ণনা দিয়ে প্রতিবেদককে বলেন, ছয়জন বোরখা পরিহিত যুবক সেদিন রনি মেম্বারকে নিয়ে যেতে আসে। সকলেই কালো বোরখা ও নেকাব পরা ছিলো। ঘরের ভেতরে প্রবেশ করে দুইজন আর চারজন বাইরে দাড়িয়ে ছিলো। তাদের কাছে অনুনয়-বিনয় করে কোন লাভ হয়নি। তারা মেম্বারকে তাদের সাথে নিয়ে চলে যায়। বাড়ির সবাই এত ভয় পেয়েছিলো যে কেউ কোন শব্দ করতে পারেনি।
নিহতের চাচা আবুল বাশারের সাথে কথা হলে জানা যায়, আমিশাপাড় আমিন বাজারের দক্ষিণ পাশের নতুন বাড়িতে থাকেন তিনি। ঘটনার রাতে ১১টার সময় সিএনজিতে করে এলাকার সিদ্দিক নামের এক ব্যক্তি তার ভাতিজা রনিকে রক্তাক্ত অবস্থায় নিয়ে আসে। এসময় তার মাথায় চারটি কোপ ও ডানপাশের কান থেকে চোয়াল পর্যন্ত ধারালো অস্ত্রেও আঘাত ছিলো। পরে তাকে চন্দ্রগঞ্জ এর ন্যাশনাল হাসপাতালে নেওয়া হলে সেখানেই মারা যায়।
রনিকে উদ্ধারকারী প্রতিবেশী সিদ্দিক বলেন, ঘটনার রাতে নিহতের ছোটভাই রাকিব তাকে মুঠোফোনে জানায়- কয়েকজন ব্যক্তি রনিকে তুলে নিয়ে গেছে। রনিকে খুঁজতে সাহ-আলম, কামাল ও আব্দুর রহমান সহ কয়েকজন বের হই। বটগ্রাম বলাইদের বাড়ির সামনের অন্ধকার রাস্তায় গিয়ে রক্তাক্ত অবস্থায় রনিকে পড়ে থাকতে দেখি। পরে উদ্ধার করে তার চাচার বাড়িতে নিয়ে যাই।
নিহতের ছোটভাই ইসমাইল হোসেন রাকিব (২৪) প্রাণের ভয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। মুঠোফোনে তিনি প্রতিবেদককে জানান, ঘটনার রাতে তিনি এলাকার বাইরে ছিলেন। রাত সাড়ে দশটার কিছু সময় পূর্বে প্রতিবেশী জাবেদ তাকে মোবাইল করে জানতে চায়- “রনি মেম্বার ও সে এখন কোথায় আছে।” এর কিছু সময় পরে কামালের ছেলে শাওন তাকে একটি ভিন্ন নাম্বার থেকে মোবাইল করে জানায়- আমিন বাজার ফাতেহা ফার্মেসীর ফাঁসি বাড়ি আরাফাত ও বটগ্রাম আদালি বাড়ীর মোহন ও জাবেদ সহ কয়েকজন লোক বড় ভাই রনিকে তুলে নিয়ে গেছে। পরে তিনি মুঠোফোনে বিষয়টি এলাকার সিদ্দিক ও আব্দুর রহমানকে জানান। বর্তমানে রাকিব এলাকায় ফিরতে ভয় পাচ্ছেন। প্রতিনিয়ত তাকে বিভিন্ন অনলাইন নাম্বার থেকে ফোন দিয়ে হুমকি দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া জাবেদ তাকে ফোন দিয়ে বিভিন্ন ভাবে ঠিকানা জানার চেষ্টা করছে বলেও যুক্ত করেন তিনি।
শাওনের কাছে ঘটনার রাতে রাকিবকে ফোন দেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বিষয়টি অস্বীকার করেন। ওই রাতে তিনি কুমিল্লা ছিলেন এবং এই ঘটনার কিছুই জানেনা বলে জানান। হত্যাকান্ডের বিষয়ে প্রশ্ন করলেও এড়িয়ে যান তিনি।
এদিকে গ্রামে থাকা নিহতের বৃদ্ধ মা অমানবিক কষ্টে জীবন যাপন করছেন। তাকেও বিভিন্ন সময়ে মোবাইলে হুমকি দেওয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেছেন। তিনি সরকারের কাছে সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে নিজের ছেলের হত্যার বিচারের দাবি জানিয়েছেন।

আরও পড়ুন
বগুড়া মহাস্থান মাজারের ১৫ দানবাক্সে মিলল সাড়ে ৩৪ লাখ টাকা, গণনায় লেগেছে প্রায় দুই দিন
ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় গাঁজাসহ মাদক কারবারি গ্রেফতার
নওগাঁয় সরকারি কর্মকর্তা পরিচয়ে প্রতারণা করায় যুবক আটক