
তেঁতুলিয়ার ২৮ বছর বয়সী দিনমজুর আব্দুর রশিদের জীবন যেন এক দুঃস্বপ্নের গল্প। পঞ্চগড়ের এই দিনমজুর গর্ভবতী স্ত্রীকে হাসপাতালে নেওয়ার পথে পুলিশের গুলিতে আহত হন। তার জীবন এবং পরিবারের ভবিষ্যৎ তছনছ হয়ে যায়। অর্থাভাবে চিকিৎসা করানোর কোনো উপায় ছিল না। এমন অবস্থায় তার স্ত্রী তিন দিনের নবজাতক কন্যাকে ২৫ হাজার টাকায় বিক্রি করে স্বামীর চিকিৎসা করানোর চেষ্টা করেন। এই মর্মান্তিক ঘটনা স্থানীয় প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করলে অবশেষে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়।
আব্দুর রশিদের বাড়ি পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ার ভজনপুরের মালিগছ গ্রামে। প্রায় ১০ বছর আগে তার মা মারা যান, এরপর সৎ মায়ের সাথে পারিবারিক বিরোধের কারণে বাড়ি ছাড়েন রশিদ। তিনি দিনাজপুরের রাজবাড়ী এলাকায় স্ত্রী ও সন্তান নিয়ে ভাড়া বাড়িতে বাস করছিলেন এবং ট্রাক্টর শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন।
গত ৪ আগস্ট, ২০২৪, দিনাজপুরে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন চলাকালে গর্ভবতী স্ত্রীকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার সময় পুলিশের গুলিতে আহত হন আব্দুর রশিদ। তার স্ত্রীকে হাসপাতালে ভর্তি করার সময় রশিদ নিজে গুরুতর আহত অবস্থায় পড়ে যান। স্থানীয়দের সহায়তায় প্রাথমিক চিকিৎসা করিয়ে বেঁচে ফিরলেও তার শারীরিক অবস্থার ক্রমশ অবনতি হতে থাকে। আব্দুর রশিদের পরিবার অত্যন্ত দরিদ্র, ফলে চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হচ্ছিল না। একই সময়ে তার স্ত্রী রোকেয়া বেগম ৯ আগস্ট কন্যা সন্তানের জন্ম দেন। তবে নবজাতকের জন্মের আনন্দ রশিদের পরিবারের কাছে বিষাদের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। স্বামীর জীবন বাঁচানোর জন্য তার স্ত্রী রংপুরের এক দম্পতির কাছে ২৫ হাজার টাকায় শিশুটিকে বিক্রি করতে বাধ্য হন।
এই টাকা দিয়ে আব্দুর রশিদের চিকিৎসা শুরু হলেও জন্মসনদ বা জাতীয় পরিচয়পত্র না থাকার কারণে সরকারি বা বেসরকারি কোনো সহায়তা পাওয়া যাচ্ছিল না। ফলে, রশিদের চিকিৎসাও আটকে যায়। এই মর্মান্তিক ঘটনা প্রকাশ্যে এলে পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফজলে রাব্বির দৃষ্টি আকর্ষণ হয়। তিনি দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করে আব্দুর রশিদের নাগরিকত্ব প্রদানের প্রক্রিয়া শুরু করেন। ইউএনও ফজলে রাব্বি নিজে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদে গিয়ে রশিদের পরিচয় নিশ্চিত করার জন্য তার পরিবার এবং স্থানীয় ব্যক্তিদের সাথে কথা বলেন। দাপ্তরিক জটিলতা নিরসন করে আব্দুর রশিদকে বাংলাদেশি নাগরিকত্ব প্রদান করেন।
ইউএনও ফজলে রাব্বি রাতে আব্দুর রশিদকে তেঁতুলিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করান এবং তার চিকিৎসার যাবতীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। শারীরিক অবস্থা বিবেচনায় আরও উন্নত চিকিৎসার প্রয়োজন হলে তার ব্যয়ভারও তিনি বহন করবেন বলে প্রতিশ্রুতি দেন। নাগরিকত্বের প্রমাণ না থাকায় আব্দুর রশিদের পরিবার কোনোরকম সরকারি বা বেসরকারি সহায়তা পাচ্ছিল না। তার স্ত্রী বাধ্য হয়ে তাদের সন্তানকে বিক্রি করেছিলেন। তবে ইউএনও ফজলে রাব্বির তৎপরতায় সেই সন্তানটি ফেরত আসে এবং রশিদের চিকিৎসার প্রক্রিয়া এগিয়ে চলে।
আব্দুর রশিদের বক্তব্যে তার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ পায়,এই বিপদে স্যার আমাকে সাহায্য করেছেন, আমি ভাষায় প্রকাশ করতে পারব না। আব্দুর রশিদ একজন দরিদ্র দিনমজুর প্রশাসনের সহায়তায় সব কিছু পুনরুদ্ধার করার ঘটনা মানবতার একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে এমনটাই বলছেন স্থানীয় বাসিন্দা হিমেল গিরি। তিনি বলেন ইউএনও ফজলে রাব্বির এই মানবিক উদ্যোগ বাংলাদেশের প্রশাসনিক ব্যবস্থার একটি অনন্য উদাহরণ।
-আল মাহমুদ দোলন-

আরও পড়ুন
বগুড়া মহাস্থান মাজারের ১৫ দানবাক্সে মিলল সাড়ে ৩৪ লাখ টাকা, গণনায় লেগেছে প্রায় দুই দিন
ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় গাঁজাসহ মাদক কারবারি গ্রেফতার
নওগাঁয় সরকারি কর্মকর্তা পরিচয়ে প্রতারণা করায় যুবক আটক