
আওয়াজ ডেস্ক রিপোর্ট
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটে গত দুই মাসে এক ভয়াবহ প্রবণতা ধরা পড়েছে। বারবার আসছেন নারীরা—তাদের সবারই এক হাতে দগদগে পোড়া ক্ষত। প্রথমে মনে হচ্ছিল গরম কিছুতে ছ্যাঁকা খেয়েছেন। কিন্তু অনুসন্ধানে বেরিয়ে এলো চাঞ্চল্যকর তথ্য—এই পোড়া আসলে রাসায়নিক বিক্রিয়ার ফল, আর এর পেছনে রয়েছে কথিত ‘তান্ত্রিক বাবা’র প্রতারণার ফাঁদ।
প্রতারণার কৌশল:
তদন্তে জানা যায়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে অসংখ্য পেজ ও গ্রুপ চালিয়ে দীর্ঘদিন ধরে তান্ত্রিক পরিচয়ে প্রতারণা চালিয়ে আসছিল একদল সংঘবদ্ধ চক্র। সেখানে ছোট ছোট ভিডিও বিজ্ঞাপন দিয়ে দাবি করা হয়—“স্বামী-স্ত্রীর মনোমালিন্য? প্রেম-প্রণয়ে অশান্তি? সংসারে সমস্যা?—আছে আধ্যাত্মিক সমাধান।” বিজ্ঞাপনের সঙ্গে দেওয়া হয় মোবাইল নম্বর। সেই নম্বরে ফোন করলে প্রতারণার ফাঁদে জড়িয়ে পড়েন অসংখ্য নারী।
কীভাবে ফাঁদে ফেলা হয়:
ফেসবুক বিজ্ঞাপন দেখে ফোন করা ভুক্তভোগীদের প্রথমে বলা হয় বাজার থেকে ‘চিনি’ ও ‘পটাশ’ কিনতে। পরে তান্ত্রিক বাবার নির্দেশে মুঠোয় এগুলো একসঙ্গে ধরে রাখতে বলা হয়। আসলে এই ‘পটাশ’ হলো পটাশিয়াম পারম্যাঙ্গানেট। চিনির সঙ্গে এটি মিশলে রাসায়নিক বিক্রিয়ায় প্রচণ্ড তাপ সৃষ্টি হয়। কয়েক মিনিটের মধ্যেই হাত পুড়ে ভয়াবহ ক্ষত সৃষ্টি হয়।
ভুক্তভোগীরা জানান, যখন হাত জ্বলে যায়, তখন তান্ত্রিক বাবা হুমকি দেন—“হাত ছাড়লে বিপদ আরও বড় হবে।” এরপর টাকা দাবি করা হয়। টাকা না দিলে শারীরিক ক্ষতি, আর দিলে রক্ষা পাওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়। অনেককে আবার ব্ল্যাকমেইল করা হয়—‘উচ্চতর সাধনা’র অজুহাতে নগ্ন ছবি বা ভিডিও পাঠাতে বাধ্য করা হয়। পরে সেগুলো ফাঁসের ভয় দেখিয়ে আদায় করা হয় লাখ লাখ টাকা।
শিকার নারীরা:
মে থেকে জুলাই পর্যন্ত অন্তত ৩০ জন নারী এই ধরনের পোড়ার শিকার হয়ে বার্ন ইউনিটে ভর্তি হয়েছেন। তাদের প্রায় সবাই মধ্যবয়সী গৃহবধূ বা অবিবাহিত তরুণী। অনেকেই সংসারের কলহ বা প্রেমিককে বশে আনার আশায় এই পথে গিয়েছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত হাতের সঙ্গে পুড়েছে তাদের ভাগ্যও—স্বামী ফেরেনি, প্রেমও ভেঙেছে, উল্টো খুইয়েছেন টাকা, সম্মান, আর শরীরের অঙ্গ।
একজন ভুক্তভোগী জানান, “আমাকে বলা হয়েছিল, চিনি আর পটাশ হাতে ধরে রাখতে। হাত জ্বলে গেলেও বলল, টাকা পাঠাতে হবে, না হলে আরও ক্ষতি হবে। আমার কাছে টাকা না থাকায় ফোন কেটে দিই। হাত খুলে দেখি, হাত শেষ হয়ে গেছে।”
চিকিৎসক ও বিশেষজ্ঞদের মত:
ঢাবির রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. ইকবাল রউফ মামুন বলেন, “পটাশিয়াম পারম্যাঙ্গানেট চিনির সঙ্গে বিক্রিয়া করে অ্যাসিডিক পদার্থে রূপ নেয় এবং প্রচুর তাপ উৎপন্ন হয়। ফলে চামড়া অ্যাসিডে পোড়ার মতো ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এটি কোনো আধ্যাত্মিক শক্তি নয়, স্রেফ প্রতারণা।”
বার্ন ইউনিটের চিকিৎসকরা সতর্ক করে বলেন, “এসব পোড়া ক্ষত ভয়াবহ। সময়মতো চিকিৎসা না করালে পঙ্গুত্ব বরণ করতে হতে পারে।”
পুলিশের তদন্ত ও গ্রেপ্তার:
সিআইডির সাইবার ইন্টেলিজেন্স অ্যান্ড রিস্ক ম্যানেজমেন্ট উইং সম্প্রতি এ ঘটনায় জড়িত আব্দুস সবুর নামে এক প্রতারককে গ্রেপ্তার করেছে। তার কাছ থেকে ভুক্তভোগী নারীদের অসংখ্য স্পর্শকাতর ছবি-ভিডিও উদ্ধার হয়েছে। তদন্তে বেরিয়ে এসেছে, এক নারী তার ফাঁদে পড়ে ১৪ লাখ টাকা পর্যন্ত খুইয়েছেন।
সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার মো. জাহিদুল ইসলাম জাহিদ বলেন, “ভুক্তভোগীরা লোকলজ্জার ভয়ে অভিযোগ করতে চান না। এ কারণে প্রতারকদের আইনের আওতায় আনা কঠিন হয়ে পড়ে। তবে আমরা চেষ্টা চালাচ্ছি এ ধরনের সাইবার প্রতারণা চক্রকে চিহ্নিত ও দমন করার।”

আরও পড়ুন
“অসংক্রামক রোগের ঝুঁকি কমাতে তামাকপণ্যের উপর কর বৃদ্ধির প্রস্তাব চিকিৎসকদের”
বনানী উন্নয়ন পরিকল্পনা নিয়ে মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত
বনানীতে বহুতল ভবনে আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ করছে ফায়ার সার্ভিস